সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
মহিষাদল, পূর্ব মেদিনীপুর
মেল id: lokpathduiipatapatrika78@ gmail.com
====================================
বর্ণমালা অক্ষরে
প্রাণজি বসাক
একটা কাঁচা কাঁচা
গন্ধ ছড়িয়ে আছে বর্ণমালা অক্ষরে
অত্যধিক আবেগ ঘন হয়ে ওঠে আড্ডা নামক খাঁচায়
পড়া হল কত কথা পাহাড় তুলে আনে
বিব্রত হনুমান
বৃষ্টির শব্দে জানালা বন্ধ শুরু হয় মহিলা কন্ঠে গান
পুরুষেরা চোখ মুদে পা নাড়ায় সে যে কী
আত্মমগ্নবাবু
ভেজা বাতাস এল
চাঙ্গা হল আয়তক্ষেত্র মধুর ব্যঞ্জনে
হাত কচলাবার আয়োজন বা অজুহাত বা সুযোগ নেই
একটা কাঁচা কাঁচা গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে বর্ণমালা
অক্ষরে
উপরে উঠে যাবার সিঁড়ি তাকিয়ে আছে সর্বংসহা পাত্রে
অপূর্ব সুন্দর বিন্যাসে মায়া কায়া ছায়া টইটুম্বুর আবেগ
একটা কথা বলব বলে
রবীন বসু
একটা কথা বলব বলে বসে আছি হাজার দিন
একটা কথা বলব বলে রৌদ্রতেজে পুড়ছে ত্বক
একটা কথা বলব বলে ভিজছি আমি বর্ষাদিন
শীতের রাতে ঠাণ্ডাবুকে কাঁপছি দেখ ঠক ঠক!
তোমার কথা শুনব বলে অপেক্ষাতে বসে আছি
আমার কানে তুলো গোঁজা, অন্যকিছু ঢুকছে না
দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে হতাশ মনে বাসায় আসি
বিনিদ্র রাত কেটে গেল তোমার কথা শুনলুম না।
দিনের সূর্য আবার ওঠে শুরু আমার অপেক্ষা যে
কোথা যেন ঝরনা ঝরে গুপ্ত আশার ঝলকানিতে।
একটা কথা বলব বলে ‘ভালোবাসি তোমায় আমি’
হদ্দ হয়ে বসে আছি জীবন আমার নয়তো দামি!
সংকেত
পবিত্রকুমার ভক্তা
বর্ষদ্বার প্রান্তে
অভ্রভেদী আলোর অনুজ্জ্বল উচ্চারণ।
সময়ের পলিমাটিতে
অনির্বচনীয় নীল নকশা।
কিশলয়—
মৃত্তিকার গোপন স্বরলিপি ভেঙে
উন্মোচন করে সবুজ প্রতিসংকেত,
নিঃশব্দ উচ্ছ্বাসের অনুলিখন।
জীর্ণতার অবশেষে
জেগে ওঠে—
দুঃসাহসী অন্বেষণের দিকে
এক অব্যক্ত গমন।
নববর্ষে— সকল আশা
শুধু সম্ভাবনার
অপ্রকাশিত অনুবৃত্তি।
আজ হঠাৎ আষাঢ়
শিখা মল্লিক
আজ হঠাৎ আষাঢ়।
শরীর অবশ মনে হয়
রোদকে খোঁচা দেওয়ার পরিণাম যেন।
না বাবা, রোদ-ই
চাই।
হরিণের মতো দৌড়তে না পারলে
ব্যাধি-বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়বে দেহে।
অসময়ে চলে গেলে জ্যোৎস্না উপভোগ ---
তারা গোনা বাদ থেকে যাবে।
আবার মায়ায় মিশে ডাকবে তারা
আমি কি না এসে পারব বলো ?
না না আর আসা নয় !
এত বৈরী - বন্ধু - শীত হাসি কেড়ে নেয়
ঘুম পাড়াতে চায় কুয়াশায় রেখে।
গণেশ লজ
অমিত কাশ্যপ
সিদ্ধিদাতা গণেশ ঠাকুর আর
লক্ষ্মীমা উজ্জ্বল হয়ে রিসেপশনের মাথায়
রোজই থাকেন, ফুল-মালায় শোভিত হয়ে
ধূপের গন্ধে সকালটাই অন্য হয়ে
ওঠে
কাস্টমার লক্ষ্মী, হাতজোড় করে স্মাইলিতে রিসেপশনিস্ট
হাতে হাতে গোলাপ, চাবির রিং, ক্যাডবেরি,
শুভেচ্ছা বিনিময়
এখানে রোজই নববর্ষ, রোজই হালখাতা
প্রান্তিক শহর আজ আধুনিকতায়
মোড়া
রিয়ালিটি ছুঁয়ে নেমে আসে সন্ধে, ফুরফুরে
নতুন বছরের মিষ্টিমুখ আর
বিকিকিনি
দোকানে, গৃহকোণে, নতুন
পোশাকের গন্ধ
আহা বছর, পূর্ণ হয়ে এসো, শুভকামনায় এসো
অলীক দর্শন
সুমিতা মুখোপাধ্যায়
নীলাকাশ কখনো সে পায় ধূসরতা!
সবুজ গাছের পাতা বাসন্তী হাওয়ায়
পর্ণমোচনের আগে হলুদ দেখায়।
সুগন্ধী বকুল দ্বিপ্রহরে স্নানরতা
স্নান-অন্তে কেশপাশে ফুল কর্ণিকার,
বেসর বাহারী তিল বাক্যহীন যার,
আধূত অধর, দেহ
কাঁপে বারবার
স্মৃতি, শুধু
স্মৃতি আজ শান্ত বিধবার!
বর্ণ, বিত্ত,
রূপ, গন্ধ কেবলি আপাত,
ভাগীরথী-ঘোলা জল সমুদ্রে সুনীল!
সেই জল বাষ্প হয়ে, কী আশ্চর্য, আহা!
হিমালয়ে সেই বারি সুশুভ্র তুষার!
আহা কী অলীক দর্শন, আর নিরর্থ নিখিল,
জানি, তবু
মনে হয়, কই, জানি না তো...
সুখের ঘুড়ি
প্রভাত ভট্টাচার্য
পুষ্পতোরণ, ফুলবাগিচা
অট্টালিকা নয়নশোভন
উপচে পড়া সুখের নদী
চলছে ভালোই ইচ্ছেজীবন
আর কিছু কি পাওয়ার আছে ?
হয়তো আছে, কেউ
জানে না
চাপা আছে নদীর নীচে
হীরকদ্যুতি ভুলিয়ে দেয়।
হয়তো সবই ক্ষণিকতরে
ছায়ার সাথে সমুখসমর
অলিন্দেতে পড়লে গিয়ে
মেঘের খেলা ঐ দেখা যায়
আসল খুশি, ছায়াবিহীন
উড়তে থাকে সুখের ঘুড়ি।
স্বপ্নের
ভেতর অন্যতর তারা
শান্তনু
প্রধান
স্বপ্নের
ভিতর হরিতকী গাছের মতো
আরেক
স্বপ্নের গোপন স্তর—
যেখানে
কোনো শব্দ নেই,
তবু
ছড়িয়ে পড়ে এক অনির্বচনীয় কম্পন।
এই
অভিজ্ঞান বুঝি না বলেই
ঘুমভাঙা
ভোরে দেখি—
পাতার
শিরায় শিরায় জমে থাকা
অদৃশ্য এক
আলোকরস,
যেন কোনো
নিঃশব্দ সত্তা
নিজেকেই
ভেঙে আবার গড়ে তোলে।
ডিয়ারি
পার্কে ঘুরে বেড়ানো হরিণেরা—
তারা যেন
চেতনার দীর্ঘ রেখা, তাদের চোখের গভীরে
ছুটে
বেড়ায় অচেনা জ্যোৎস্নার সংকেত।
তাদের
ছুঁতে গেলেই মনে হয় আমি হারিয়ে যাচ্ছি সন্ধ্যানদীর জলে।
সেই
হারিয়ে যাওয়ার লবণস্বাদ
বাতাসে
ভেঙে দেয় অনুভূতির স্থিরতা
ডানার
ভেতরে ঢুকে পড়ে অস্থিরতার ক্ষুদ্র বীজ—
তবে কি
আবার জন্ম নেবে সংযম
নাকি খুলে
যাবে কোনো অদেখা উড়ান?
ফুলের
ফাঁকে জন্ম নেয় যে আলো,
তা যেন
বিস্মৃত স্মৃতির ভাঙা প্রতিধ্বনি।
সেখানেই
জেগে ওঠে বিভূত অন্ধকার,
আর সেই
অদেখা আলোর বিস্তার নেমে আসে ধীরে—
জ্যৈষ্ঠের
দুপুরে,
একটি নীরব ফোঁটার ওপর।
তুমিও কি
তাই ,
আমার জল-ফড়িং নাকি
স্বপ্নের
ভেতর আর একটি স্বপ্নের অন্যতর তারা?
সুবর্ণরেখা
পলাশ পাল
অভিমানের কৌটোয় রেখেছিলাম একমুঠো তৃষ্ণার জল
ছুঁয়ে দেখেছ তুমি নির্বিঘ্ন রাস্তায় পড়ে থাকা
তৃষ্ণার্ত কবিতা?
তার চোখের জলে আমি উদার অপরাহ্নকে দেখি
ছুঁয়ে দেখেছ তুমি এক বিন্দু জলে ভেজা
অসমাপ্ত বিরহ?
ভেবে দেখেছ?
আমার হাতের তালুতে আজ সুবর্ণরেখা হেসে ওঠে...
ফসিল
হাসি বসু
নদীর ধারে সেই আদুরে বাড়ির সব ঘরে
জলে ভেজা ভালবাসার গন্ধ ছিল
উঠোনে জুঁইয়ের গন্ধ, রান্নাঘরে ভাতের সোঁদা গন্ধ
কলতলায় শ্যাওলা ধরা মাটির গন্ধ –
ছিল ছাদের হিমেল হাওয়ায় মনকেমনের গন্ধ
ধ্রুবতারার সত্যি গন্ধ উঁকি দিত রোজ রাতে
সব গন্ধরা পথ ভুলে ফসিল হয়ে গেছে
একে একে, পাললিক
শিলার নিচে
আদুরে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে–
এখন চারিদিকে শুধুই পোড়া বারুদগন্ধ…
ঠিকানা
অনিন্দিতা
সেন
পুরনো
ঠিকানায় থাকি এখন
নাম না
জানা গল্প যখন
সময়ের
স্রোত বয়ে যায়
নদীর জলেরই
মতন
ভালবাসবে
বলে ফনা তোলা ইচ্ছেগুলো
রঙীন
চিরকুটে ভরেছে রঙ
মেখেছে
তুলির টান
নীলচে
রেলিঙ ঘেঁষে মেঘ সরে যায়
নক্ষত্র
ছোঁয়া জোৎস্নার বিষন্ন নখ
অহেতুক
জেগে থাকার
নিঃসঙ্গ
যাপন!
জীবন যে-রকম
সুমন দিন্ডা
বাড়ি বানানোর ইচ্ছেয় জড়ো করা ইমারতি,
চর্মকার মিস্ত্রীর দারুণ ব্যবস্থাপনা,
দেওয়াল সেলাই করে মেঝে,
জানালা জুড়ে জুড়ে ছাদ,
দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সঞ্চয়।
অগোছালো খাতায় খোলা নাকছাবি,
বিস্মৃতি, বিভ্রম,
বন্ধ দেরাজে পরিচয়।
যতিচিহ্ন ঠিক আছে,
শব্দ নিখোঁজ বলে
পায়রার বিষ্ঠায় ভরে আছে
স্মৃতির পাতা।
পেছনের দিকে এগিয়ে
একটা সিট খুঁজলে হয় না?
কলম
মতিলাল দাস
কলম নীরব, তবু
সে সবচেয়ে জোরে কথা বলে।
কালির স্রোতে ভেসে যায় মানুষের অনুভব, ইতিহাস, আর
রক্ত।
কখনো প্রেমের ঘোষণা, কখনো বিদ্রোহের শপথ।
একটি শব্দেই সে পারে ভাঙতে সাম্রাজ্য,
আবার একটি দাগেই গড়তে পারে শান্তি।
শিশুর হাতে সে কাঁপে প্রথম অক্ষরে,
বৃদ্ধ কবির হাতে কাঁপে শেষ চিঠির সময়।
কলম জানে না ধর্ম, জানে না সীমানা,
সে কেবল সত্যের দিশারী, আলোয় ভরা যাত্রী।
তবু কতবার সে বিক্রি হয়েছে মিথ্যার বাজারে,
কালির বদলে রক্ত ঝরেছে তার শরীরে।
তবু সে থামে না, লেখে নিরন্তর মানুষের কাহিনি।
কারণ কলম জানে শব্দই একমাত্র অমরতা।
তারায় ভরা আকাশ
নীলাঞ্জনা হাজরা
সেদিন তারা ভরা আকাশে
তোমাকে দেখলাম।
চাঁদের আলো অনুপস্থিত
ঐ আমার জীবনের অন্য দিক
তুমি তারা হয়ে ফুটে ছিলে
আরও বেশি করে আলাপ হল
আজানের সুরে ভেসে
তোমার কাছে পৌঁছেছিল সেইকথা
যেটা চরম সত্য
তোমার আমার দূরত্ব
বাকিসব ভাল আছে
বাকিসব ভাল থাক।
গোধূলির শেষে সন্ধ্যে কাল
তারায় ভরা আকাশ আজ।
আজ চৈত্র মাস
সন্দীপকুমার মান্না
কিছুক্ষণ আগে মুষলধারে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি
বছর শেষ চৈত্রের দাপাদাপি এটা স্বাভাবিক
পর্ণমোচীর শাখাপ্রশাখায় নতুন পাতা ফুল
গুমোট গরমে নাজেহাল অবস্থা ধরণীর।
মাঠময় সবুজ বোরো প্রসবাবস্থায় গোনে প্রহর
বিকেলের বাসন্তী গন্ধ নিয়ে যায় স্মৃতির পটে
শিরীষ খিরিশ হিজলে সূর্য নামে রাঙা হয়ে
ভোরে কোকিলের কামকেলি মর্মে লাগে।
খোলা জানালা দিয়ে আসে স্নিগ্ধ দখিনাবাতাস
পানাফুলের সৌন্দর্য্যে ফিরে পাই প্রেমিকাকে
উড়ু উড়ু মনে দেখি নদী জলে নারীর স্নান
বাবুই 'র
নভনীলে করি নতুনের আহ্বান।
বছরের শেষ মাস বাঁধা পড়ি বসন্তের আলিঙ্গনে
মঙ্গল শঙ্খে বিদায় বললেই কি অতীত হওয়া
চৈত্র তোমাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখা কথা বলা
নববর্ষের নান্দীমুখ তোমার চোখের বৃষ্টি।
এস চৈত্র প্রাণভরে আদর করি অবিরত তাপদাহে
হাসফাস গরমে নাজেহাল মা মাটি প্রকৃতি রূপ
তুমি আছ সেই ফাগুন আগুনে ঋতুরাজে
পলাশ শিমুলে কৃষ্ণচূড়ার মর্ত্য যৌবনে।
শেকড় জল
কবিতা সামন্ত
চিলেকোঠা থেকে মা
একে একে নামিয়ে নিয়ে আসছে পিতল কাঁসা
নতুন বছরে সবাই খাবে ওতে,
ওগুলো ওখানেই থাকে সারাবছর।
এখনো মা তুলসীগাছে
ঝারি দেয়...
এখনো কাঁসার ঘটি করে পুরানো
অশ্বত্থ গাছে জল দিয়ে যায়।
এসব কদ্দিন আর
দেখতে পাব জানিনা!
তবে এটুকু জানি
বৈশাখ মানেই শেকড়ে জল দেওয়া।
রানী রঙের গালিচা
পুষ্প সাঁতরা
পূব আকাশে ফুটছে নতুন আলো
নির্ভরতায় আকাশ পানে চায়
সুরেলা শব্দে উড়ে উড়ে যায় পাখি
সব শব্দ নদী হয়ে বয়ে যায়।
রূপক উপমা অলংকারে সাজে বেশ
আকাশে তারা মিটিমিটি জ্বলে
স্বর্ণ চাঁপা উজ্জ্বল আভায় হাসে
জমা স্বপ্ন আশার কথা বলে।
বাতাস আঁচলে ভরে শূন্য আঁকছে
আকাশ আঁকে পূর্ণ করে
মাঠে রানী রঙের গালিচা পাতা
সাদা সাদা বক উড়ে চলে।
নতুন কাব্য
মঙ্গলপ্রসাদ
মাইতি
চোখের
তারার ছবি তুমি হৃদবাগানের ফুল
সকালবেলার
সূর্যকিরণ অথৈ নদীর কূল।
রঙিন বোশেখ
কৃষ্ণচূড়া স্নিগ্ধ বটের ছায়া
বর্ষাক্ষণের
বৃষ্টি তুমি কাজল মেঘের মায়া।
শরত্কালের
শিউলি সুবাস কাশফুলেরই হাসি
নীল আকাশে
ভেসে চলা সাদা মেঘের রাশি।
হেমন্তেরই
ধানের শিষে সোনারোদের গান
নবান্নেরই
খুশির মাদল উদ্বেলিত প্রাণ।
কুয়াশার
চাদর ছেঁড়া শীতের মিঠে রোদ
শত শত
ভুলের মাঝেও আমার শুভবোধ।
বসন্তেরই
মিঠে বাতাস কচি সবুজ পাতা
মনের ঘরের
স্বপ্ন আকর নতুন কাব্য গাথা।
ছেড়ে আসা পথ
এলা বসু
মাঝেমধ্যেই আমি চেনা মানুষের আদল খুঁজে পাই
আরেকটা মানুষে
একটা চেনা ভীষণ চেনা চোখ
হ্যাঁ ঠিক! সেই চোখ! কিন্তু
আরো আরো গভীরে গিয়ে বুঝি
এ সে নয় শুধু চোখটা...
ততক্ষনে লোকটিও আমাকে ছেড়ে
এগিয়ে গেছে
আবার আরেকদিন এরকম...
কখনো চোখ, কখনো
হাসি, কখনো
দাঁড়াবার ধরণ, চলার ভঙ্গি
শুধু মানুষ নয়!
এই রাস্তা, তার
পাশের সরু গলি,
পাশ দিয়ে টুং টাং সাইকেল
হলুদ অবোধ বিকেল
আগেও দেখেছি এমন!
এর গা ঘেঁষে কোথায় গিয়ে সন্ধ্যা নামলো?
কে যেন ছিল এত আপন ?
কোন পথ বাহু মেলে অপেক্ষায় আজও?
ঋতুছন্দা
মহুয়া ব্যানার্জী
শুধু তোমাকেই জেনে এসেছি তাই
গতজন্মের সব বিরহ গ্ৰীষ্মকালীন।
শুধু তোমাকেই ভালোবাসব বলে
এই জন্মের অভিমানেরা হিমবাহ গলা
জল!
শুধু তোমার চোখের ভেতর ডুব দিতে
গিয়ে
জন্মান্তর ভুলেছি এক পলকেই।
শুধু তোমার জন্যই প্রবল যুদ্ধ,
বেহিসেবী রাগ ক্ষোভ…
শুধু তুমি চাও তাই শ্রাবণ ভাঙে
মেঘের বুকে, ভেতর ঘরে ঝড়ের ডাক।
শুধু তোমাকে চেয়েছি একরোখা
জেদে,
ব্যারিকেড ভাঙা মিছিলের পথে!
শুধু তোমার খোলা চুলে পথ হারাব
বলেই
অগোছালো বারান্দায় ফোটে
ক্যাকটাস ফুল।
ভাবনা
সুশান্ত সেন
অস্তিত্ব যেন এক মধুর মধুর ছেলেখেলা
যে খেলায় জিতে যাওয়া জিততে চাওয়া সম্পূর্ণ অধরা।
মৃত্যুকে জয় করা যায় না কখনো
বিপরীত চাপ গুলি নিয়ত ভাস্কর
চারিপাশে দাঁড়াইয়া থাকে।
প্রয়োজন কোনো এক সমুদ্রের তীরে একা একা বসে থেকে জ্বালায় আগুন।
দগ্ধ হতে হতে অঙ্গারের আগে ঠিক কি রূপটি
নেয় চেতনার গভীরে গোপন শঙ্খ'টি কে বলে দেবে !
এস এস নিরুপম শুদ্ধ করে দিয়ে যাও জীবন আমার।
রাজপ
গৌতম তালুকদার
একটা দেশী কুকুর একটি শালিখ
সারাদিন রাজপথের গলিপথে
নেচে নেচে,ঘেউ
ঘেউ করে বেড়ায়।
সময় বিতায় নিজেরা খোলা আকাশের নীচে
কখনো অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে না,
মানুষ আর দু'চাকা থেকে সর্তক থাকে।
তিন তলার অন্যান্য বৌদি অপচয়ের উচ্ছিষ্ট
ছুড়ে ফেলে পরিবেশ দূষণ করতে,ভাবে না।
তাতে ওদের কিছুটা ক্ষুদা নিবারণ হলেও
ইট পাথরে তৈরি উঁচু উঁচু বাড়ির ভিতরের
মন গুলো কখনোই বুঝতে পারে না
ওঁরা-ই দূষণের কারণ ।
রাজপথ কারো বাপের নয়
একথা ঠিক হলেও উভয় দিকেই প্রজজ্য
তবু জ্ঞান পাপীরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।
ভয়
অণিমা গুছাইত
ঘন কুয়াশার মত আসতে আসতে সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে অজানা কোনো ভয়।
ডায়াবেটিস রোগের মত নিঃশব্দে খেয়ে চলেছে মন, মস্তিষ্ক, চিন্তাভাবনা।
ঝেড়ে ফেলতে চাইছি কিছুতেই পারছি না
ঘিরে ধরেছে আগু পিছু।
সংকুচিত হতে হতে তলিয়ে যাচ্ছি
তলিয়ে যাচ্ছে ভূত ভবিষ্যৎ
তবু ও ভয়কে ভয় পেতে ছাড়ছি না।
মা
নবনীতা সরকার
যতখানি অন্ধকার পারি দিয়ে উপহার দাও
এক পৃথিবী হাসি অথবা আলোর ভোর ,
ততখানি নিজেকে পুড়িয়ে তোমার দু চোখে
উথলে পড়ে ফেনিল আনন্দ
দুধের দাম মেটানোর অছিলায়
সোনার হার গড়িয়ে দেয় যে সন্ততি
তার কাছে জমানো আছে আগামীর চড়া সুদ ,
আমাদের বরং নিত্যকার সংসার ভেসে যাক একাদশীর আলোয় ...
তুমি এসে গুটিগুটি পায়ে পিঠে হাত রেখে
চুলে বিলি কেটে বলো"ভাত দেই "?
তারপর কাটে একযুগ ...মায়েরা রোজ আসে
রোজ ভাগফল,ভাগশেষের
হিসেব নিকেশ
তবু ভরে না পেট ,নেভে না সর্বগ্রাসী আগুন
মায়েদের শুকনো ঠোঁটে লেগে থাকে ভেজা হাসি।
ভালোবাসা আর
সুমিতা ঘোষ
বলি শোনো,
যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া তো রাষ্ট্রের কর্তব্য,
তুমি বরং এলোমেলো ভালোবাসা শেখো।
অত শত নিয়ম মেনে কি লাভ!
যদি দিনশেষে সব খালি খালিই লাগে।
শান দেওয়ার জন্য কত অস্ত্র ছড়ানো এদিকে ওদিকে-
ওরা কেবল মানবতাই কাটতে পারে এককোপে।
তুমি ভালোবাসতে শেখো।
আর-
সকলকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাও আঙুলের ডগায়।
জানো না!
ভালোবাসার মতো ছোঁয়াচে আর কিচ্ছুটি নেই।
ভেজা ভেজা
তপন মুখার্জি
একা একা ভিজছিল কাক ইলেকট্রিকের তারে বসে।
একা একা ভিজছিল ধবলী গাই খুঁটোয় বাঁধা পড়ে।
একা একা ভিজছিলে তুমি ছাদে দাঁড়িয়ে।
তারপর বৃষ্টি গড়াল সকাল থেকে রাতে।
তখন আর কাক নেই,ধবলী নেই, নেই তুমিও।
শুধু রাত একা একা ভিজে অহংকারের হুংকার ছুঁড়ছিল মেঘের আড়াল
থেকে।
দীর্ঘ এক দেবদারু গাছ পাতা নাড়িয়ে তারিফ করছিল তার।
আমার শরীরের মহাসমুদ্রে তখন সুনামির জল ছোঁড়াছুড়ি।
চাহিদা বড় দায়
প্রদীপ কুমার দে
চাঁদ কি জানে অমাবস্যার গল্প?
আলোর নেশায় মগ্ন যখন
চাঁদনি রাতেও কলঙ্কিনী সে
পূর্ণিমার শেষ অমানিশায়!
সুন্দরী মেয়েটা সংসার চেয়ে পেয়েও ছিল
তারপর দিনবদলে সাজানো সংসার ভেঙে
সে হতে চেয়েছিল শুধুই এক বাজারি অপ্সরা
অহংকারীর কাছে বার্ধক্যের খবর ছিল অজানা!
নীতিকথা আদৰ্শ উদারতায়
বুলি লেখা থাকে কবিতার পাতায়
উপদেশ পাওয়া যায় বড় ছোট গল্পে
চাহিদা বাড়ে যদি, থামে না সে অল্পে!
না বলা কথা
তীর্থঙ্কর সুমিত
শেষ পর্যন্ত যে কথাটা বলার ছিল
সেটা বলা হলো না
শেষ অঙ্কে আটকে গেল সময়
উদাস বাউল একাকী নিজেকে...
এখন কালোকে আরও কালো করার লড়াই
সময়ের নীলে বক বসে, মাছ খায়, উড়ে
যায়
পরে থাকে ছেঁড়া নেট
নগ্নপুকুর দাঁড়িয়ে দেখে, হাওয়ায় জল ও চলায় আবার
স্থির
শুধু অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞতা
ফিরে আসে না বক...
আলোর পথযাত্রী
পার্থ প্রতিম চ্যাটার্জী
এগিয়ে চলেছে পথ নীরবতার অরণ্যে
কর্মফলের বোঝা বয়ে নিয়ে
নিরন্তর পথ চলতে চলতে
বক্ষপিঞ্জর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে অবিরাম।
প্রারব্ধ ভোগের চক্রবাল
জীবনী শক্তিকে শুষে নিচ্ছে
অস্তগামী সূর্য কে সাক্ষী করে।
সব আলো নিভে গিয়ে
নিকশ কালো আঁধারে ডুবে যায় রাত্রি।
তবুও জ্বলতে থাকে আলো
নক্ষত্রের মিটমিট করা আলো।
সেই আলোর থেকে নির্গত শক্তি
জ্বালিয়ে রাখে জীবনদীপ,
আকাশ বাতাস সংসার সিপাইকে
সাক্ষী করে গেঁথে চলে জীবনের সালোকসংশ্লেষ।
চৈত্র শেষের ঝড়
সুধাংশুরঞ্জন সাহা
বাতাসে ভাসছে স্বজন হারানো কান্না...
এবার বসন্ত কি মন্থর!
মানুষের চরিত্র কি সমুদ্রকে দিয়েছে কাঠিন্য?
আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বিতীয় হুগলি সেতুর গায়ে জড়াজড়ি করে বাড়ছে।
মানুষের জীবনে যতই লুকনো থাক পাটিগণিত,
শেষট্রেন ছাড়তে আর বিশেষ দেরি নেই।
তবু, সমঝোতার
পচা গন্ধ সর্বত্র।
সেই সংকেত পড়ে নেয়া জরুরি আজ।
এবার চৈত্র শেষের ঝড়ে সব তছনছ হোক।
অনন্যা ঘোষ
পৃথ্বীরাজ কামিলা
তুমি যে অনন্যা -
"তোমার প্রাণেতে বহিছে প্রেমের বন্যা "।
নারীর প্রকৃত প্রেম নয়ন অশ্রু জলেতে গাঁথা স্বর্গের স্বপ্নে সাজানো এক প্রেম
চিহ্ন ।
গোলাপ যতই সুন্দর, তবু তার নেই গন্ধ -
আমার কাব্যে আছে শুধু প্রেম ছন্দ।
আমায় তুমি ঝরে যাওয়া বাসি ফুলের মতো ফেলে দিও না ।।
তুমি যে রজকিনী -
জ্যোৎস্নার রুপোলি আলোয় তোমার ফুলের খোঁপায় তুমি যে মায়াবিনী ।
এসেছো যেন স্বর্গের পরী , ময়াময় রসের রূপ ধরি ।
আমি কেমন করে চাইবো তারে -
তারি ঝরে যাওয়া মধুময়ী ফুলের গন্ধ ,
তারি নুপুরে লেগে থাকা নিঃশব্দ প্রেম ছন্দ
তারি আঁচলে লেগে থাকা প্রেমময়ী স্পর্শ।
মধু বিনা কেমন চলে যায় আপন দিবস রজনী -
তুমি যে আপন ভালোবাসায় বাগানে ফুটে থাকা কামিনী
মধু বিনা নিঃশ্ব এ জীবন তুমি যে একাকিনী
ঝরে যাওয়া বাসি ফুলে নেইতো তোমার মধুযামিনী
তুমি বিনা করুণ অসহায় নিঃশ্ব এ জীবন , হে সুপ্রিয়বাদিনী ।।
তুমিও মরবে একদিন -
তবু তুমি মোর প্রাণেতে তোমার হৃদয় দিলে না
আর আমার মতো প্রেম তুমি মাটি খুঁড়েও কোথাও পাবে না ।
কত জনমের পর মধুর ফুল ফোটাবো বলে এসেছি
অপেক্ষার আশায় তোমায় আমি ভালোবেসেছি।
তুমি তারে ফেলে দিয়েছো শুকনো ফুলের মতো
ঠেলে দিয়েছো তারে তুমি বিরহের জ্বলন্ত চিতার অগ্নিকুন্ডের মতো ,
পরজনমে তোমার এই পাপ
ছাড়বে না তো তোমারে।
মহাপ্রস্থান
কমল ঘড়া
কত চুপকথা
জমে জমে পাহাড় সমান নীরবতা
রাস্তায় নেমে তুমুল বিক্ষোভে এবার
আমাকে আটক করে ফেরিঘাটে
তুমি এলে অসময়ে
কি এক অলৌকিক ঘন্টা বাজালে
সমবেত চুপকথারা অমনি
জলে ঝাঁপ দিয়ে গ্রহণ করে স্বেচ্ছামৃত্যু
অগাধ হালকা আমি,
পাখি-ডানা মেলে উড়ে যাই ওপারে।
আমার পুড়ে
যাবার কথা কাউকে জানাতে পারি না
তাপস রায়
তোমার
পৃথিবী থেকে আমার পৃথিবীর দূরত্ব মাপি। ধরো
তোমার
রাস্তা ও আমার রাস্তা যেভাবে অন্য হয়েছে
যেভাবে
ঘুমনোর পর তোমার ঘুম ভাঙতে থাকে …
আমাকে অবাক
হয়ে দেখতে হয় হাই তোলা, জানালায় দাঁড়ানো
তোমার খোলা
চুলে হাওয়ার কসরৎ রোজ ডেকে নিয়ে যায়
পুরনো
ফেরিঘাটে,
সারেঙ-এর ঈর্ষা তাকানো
মনে করে
সূর্য নিভিয়ে ফেলি রোজ
পরীক্ষা
পাশের পড়াশুনো করে যেতে হলো সমস্ত জীবন
তুমি আর
শাড়ি পড়ছ না। শহরের হলুদ ক্যাব যেভাবে নিরুদ্দেশ
নদীর ওপারে
থাকা সম্মোহন সেভাবেই বুঝি উবে যায় হাওয়া থেকে
বিক্রেতারা
আমাকে ঠকায়, তারা একবার বাঁশি বিক্রি করে একবার সুর
গলদ্ঘর্ম
আমি টবে টবে ফুলের কেয়ারি করি, মালী
জোনাকিমণ্ডিত
রাত্রির কথা আর কাউকেই বলতে শুনি না, পোড়ে ত্রিফলা আলোক
ফি বছর
আমাকে ভিকট্রিস্টান্ডের পাশে ছুঁক ছুঁক করতে দেখে বাংলা ভাষার মায়াবী দাহ্যতা
চেতনা
সুব্রত
মাইতি (মহিষাদল)
আমি সিংহীর
মুখ থেকেও
ছিনিয়ে
নিতে পারি নরম কবুতর কে
আকাশের
চাঁদোয়া টেনে এনে
মুছে দিতে
পারি তার ক্ষত
ওই দাগ
লাগা আকাশ
আগামী
রক্তিম প্রভাতের জন্ম দেবে
বস্তুত ওই
সিংহী আমার সহেলী নয়
ওই পায়রাও
নয় দ্বিতীয় প্রেমিকা
তবুও তাদের
দ্বন্দ্বের মাঝে
আমার ছেঁড়া
-খোঁড়া লাশ পড়ে থাকে
আমি সিঁহীর
শ্বা-দন্তের সামনে
এখন নিজেকে
উৎসর্গ করি
পায়রাকে
ফিরিয়ে দিই
পিকাসোর
ক্যানভাসে
আমার
দরিদ্র চেতনা ভেসে যায়
প্রেমহীন
তর্পনের জলে
ঋতু সঙ্কেত
বিকাশ চন্দ
অকাল দীর্ঘশ্বাস জানে পাথর
সঙ্গীত
বিন্দু ছুঁয়ে তখন ক্যানভাসে
মূর্তি অনুশীলন
অপসৃত সকল উজ্জ্বল শরীর অন্য
আলোর ঘরে
ছেঁড়া ছেঁড়া শরীরে বিছিন্ন
বছরের সুখ স্বপ্ন যত
মলিন জীবন বিধ্বস্ত পাখিদের
ডানার মতো
অজস্র ছেঁড়া পালক ঢেকে দেয়
সকল হৃদয় কেঁপে ওঠে নিরন্তর
নতুন পরিসরে
নিসর্গ সঙ্গীত মেলাচ্ছে জীবনের
খাজনার হিসেব
আড়ালেই ঢেকে আছে পুনশ্চ কথকতা
নশ্বর শরীর ও জরিপ করে অতল
অনুভব
সকল ব্যর্থতার ভেতরে স্বর্গীয়
উৎসব
তবুও অস্পষ্ট কিলক লিপিকা আরেক
দিনের ভোরে
হৃদয়ের শ্বেত লোহিত কণিকায় পাতন
পরশ
তরল আলোর স্রোতে ভাসে বঞ্চিত
মুখ
টেনে আনে বাসযোগ্য হৃদয়ের আর এক
ঋতু সংকেত
অপেক্ষায়
নন্দিতা পতি ভট্টাচার্য
প্রকৃতির প্রতিটি ডাকের অপেক্ষায় থাকি ,
প্রতিটি নিবিড় ডাকের অপেক্ষায় থাকে
প্রতিটি হৃদয় ।
সকাল- দুপুর- সন্ধ্যায় হলদি নদীর তীরে
বসে থাকি,
জল ধোয়া প্রতিমার মতো নিঃসঙ্গতা
সর্বাঙ্গে নিয়ে। ভাঙ্গনে নদীর পাড়ের গাছের মতো -
অনিশ্চয়তা নিয়ে বসে থাকি।
স্মৃতির স্মরণি বেয়ে হলুদ পাতার ছোপ
হৃদয়ে জলছবি আঁকে। গাছের মাথা থেকে-
রোদ ঝাঁটিয়ে সন্ধ্যা নামে।
দেখি রামধনু রং নিয়ে আবির মেখেছে
অস্তরাগ। তারপর যাকে পাই ,সে
বৃষ্টির মতো ঝরে অঝোর ধারায়। নির্ভরতার পাথর কুড়িয়ে, প্রত্যাশিত
পথে
হেঁটে যাই বহুদূর।দেখি সব দুঃখ মুছে গিয়ে
-
ভুবন ভরে আছে হাজারো চাঁদের জ্যোৎস্নায়।
ধূপসন্ধ্যা.....
মায়া মাহাতো
এখন রেলপাড়ার মাঠ কংক্রিট প্লাষ্টারে
ছাতিম, ধুতুরা,
ভাট, পুটুস আর ফোটেনা।
গোবিন্দপুরের ঠিকানায় ডাক আসেনা
পুরোনো খামের শব্দরা খিলখিল, টস্ টস্
কখনো নীল নীল আলোয় ঘুঙুরের মত
বেজে ওঠে ।
কারো মুখ না ভেবেই বেঁচে থাকা যায় বেশ
কার রুদ্ররোষে ভেঙে যাই নিজের ভিতর
ভেঙে যাই অবিরল!
কার প্রতি ফেরাব জীবন কোন অভিলাষে?
প্রিয়জন, প্রিয়মুখ
ধূপসন্ধ্যার মতো ঘনীভূত
হয়ে আসে।
কে তুমি বাতিওয়ালা আকাশপ্রদীপ জ্বেলে দাও
আগামী প্রজন্ম তোমাদের জন্য
এই আলোটুকু রেখে যেতে চাই
মুমূর্ষু অন্ধকার পথে।
একটি মৌমাছির মৃত্যু
শক্তিপদ পাঠক
শোকসভাতে এখন শোকের চেয়ে আলো বেশি,
তাই রাতের আঁধারে গাছেরা শিকড় মেলে
মাটির
গভীরে বিলাপ ছড়ায়।
কলকব্জা লাগানো জড় সভ্যতার যুগে
জীবনের
কানাকড়িও দাম নেই।
সবুজ বিপ্লবের বিজয় গৌরবে
কীটনাশক স্প্রে করা হলুদ সর্ষেফুল
নেশায় মাতাল হয়ে মৌমাছিকে কাছে ডাকে,
মধুর লোভ দেখিয়ে ফুসলিয়ে চুমু খায়।
পরাগমিলনের আনন্দে শিহরিত গর্ভমুন্ডে
একদিকে
প্রাণ আসে,
অন্যদিকে বিষ মেশানো মধুর চক্করে
মৌমাছির
প্রাণ যায়।
আর আমরা লাভের কড়ি গুনে গেঁথে নিয়ে
আলো
মেখে শোকসভা করি।
অভিযোগ
রাহুল প্রামাণিক
আমাকে ভালোবাসো
না যদি তবে মনে যুদ্ধ রেখেছো কেন
পঞ্জিভূত অভিমান
তোমায় নিমজ্জিত করছে । আপাদমস্তক ছেনে
আমার স্তরিত
অনুভূতি তোমায় দিলাম
অস্বস্থি বিছিয়ে
গেছে ভাঁজের ক্ষয়াটে ভাস্কর্যে
তুমি আমায় চাও
না, দূরাভাষের
নাম্বার অবহেলায় নিশ্চিহ্ন করলে
তবে, গোপন খাতায়
সযত্নে রাখলে কেন ?
প্রশ্বাসের
বাতাসের মতো তোমায় আগলে রেখেছিলাম
ডাল- ভাত যাপন
করার সখটুকু সহ্য হল না;
সময়ের দহনে আমি
পুড়ে স্বচ্ছ হতে চেয়েছি
হয়তো সেই
ধাঁধাঁনো তীব্রতাকে ভুল
বুঝলে ।
আমি মাটিকে চিনি
মেঘ অতিশয়
পরিচিত,
কর্ষণ হাতে ফসল
ফলাতে ভালোবাসা লাগে। আমি সোনা ফলাবো
আয়োজন সুসজ্জিত
শৃঙ্খলে উপস্থিত
ভ্যার্চুয়াল
প্রোফাইল দেখো না, সত্যগুলো সেখানে মুমূর্ষপ্রায়
মিথ্যা আমার কাছে অসহনীয়। ইচ্ছার কাছে বন্ধক সবটুকু
তোমার ভরসা
খুঁজেছি
জেহাদ রয়েছে
স্থাণুবৎ,
ফিরে এসো
দিগভ্রান্ত নৌকা । কম্পাস অপেক্ষা করছে আদিগন্ত
নাবিক হয়ে থাকব
আমি চিরন্তন...
যুদ্ধ শেষের পড়ে দেখেছি
উলুখাগড়া বন
সুচরিতা চক্রবর্তী
কামানের গর্জন থেমে গেছে
অনেকদিন,
বারুদের গন্ধ মাটির নিচে চাপা
পড়ে গেছে।
গ্রামের শেষ মাথায় যেখানে
একসময় ধানের ক্ষেত ছিল,
এখন সেখানে উলুখাগড়ার ঝোপ—মাথা
নিচু করে দাঁড়িয়ে,
যুদ্ধ দেখেছে, রেখেছে সকল সাক্ষ। একজন বাতাসের সাথে
কথা বলে,
সেই শব্দে কান পাতলে শোনা যায়
হারানো পায়ের আওয়াজ,
তুমি বলো, শুধুই হাওয়ার খেলা।
আমি সেই বনের ধারে দাঁড়াই।
উলুখাগড়ার ডগায় এখনো জমে আছে
সকালের শিশির,
রক্তের লবণাক্ত স্বাদ নেই-- অথচ
শীতল সন্দিগ্ধ চোখ ।
যুদ্ধ নিয়ে গেছে, প্রাণ ফেলে গেছে ঘাস।
উলুখাগড়া বীর নয়, কবি
নয়; সে শুধু মাটিকে আঁকড়ে থাকে,
জখমের গর্তগুলো ঢেকে দেয় সময়ের
শিকড়ে।
যুদ্ধ ও পেটের ক্ষুধা
বীথিকা পড়ুয়া মহাপাত্র
যুদ্ধ আমাদের ভাতে,পাতে ও জ্বালানির আগুনে,
আয়েশ-আতিশয্যে ছন্দ লন্ডভন্ড,
জীবনের সেতার বাঁধা যায় না।
দুয়োরানীর দৈন্যদশা! পাতা ঝরে
যায় বনে,
আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য!
তেলের দেশে যুদ্ধের আগুন,
এদেশে চুল্লিতে আগুন জ্বলে না।
কোদাল,করাত নিয়ে যুদ্ধ চলে,
অনুতাপের হাঁটু মুড়ে নয়,দম্ভে!
শহরে ক্ষমতায়নে উৎসবের
বাড়াবাড়ি,
সর্বভুকের অসীম ক্ষুধা
নিবৃত্তির দাবানলে
পুড়তে থাকে পৃথ্বী! অকাল
বৃষ্টি ও বন্যা,
তবু যুদ্ধ থামে না!
এবার ঠিক গণেশ ওল্টাবে!
অর্ণব সামন্ত
পূরবীর হৃদয়ে ভৈরবী বেজে উঠলেও
সে আর ভৈরবী হতে চায় না
বরঞ্চ দুর্গাটুনটুনি হয়ে ঘুরে বেড়াতে চায়
সামনের ব্যালকনিতে বা ফুলবনে
মন চাইলেও শরীর পারে না
আলোর বেগের চেয়েও বেশি ছোটে ইচ্ছা
ষোড়শী হয়ে বাসর জাগতে চায় রজনীগন্ধায়
অথচ পার্থিব ভাঁজ অপার্থিব হতে দেয় না
নৈসর্গিক সুখে বাসলেও
সামাজিক অসুখের মাধ্যাকর্ষণ তাকে টেনে নামায়
দুর্গাটুনটুনি তাই এডালে ওডালে ঘোরে
আড়ালে আবডালে সুর তোলে
আগুন জাগিয়ে রেখে মরুস্বর্গে হারায় !
কলমে
অগ্নিবীনা
তপন তরফদার
কলমের কালি
দিয়ে যে বালিকা এঁকেছিল
কাজলা দিঘী
ধান খেত গিরীশৃঙ্গ থেকে নীল সমুদ্র,
তার
জন্মভূমি প্রিয় মাতৃভূমি হৃদয়ের গান সহ
মায়ের
একান্ন সতীপিঠ।
আজ ওর
দেহের কালচে লাল রক্তধারা ফিনকি দিয়ে
চুঁইয়ে
চুঁইয়ে এঁকে ফেলেছে এক মানচিত্র যা স্বদেশের
যন্ত্রণার
রক্ত আলপথে সহ ফ্লাইওভারের রাজপথে
কুসুম
বালিকার শরীরে প্রোথিত লুম্পেনের কামনার ত্রিশূল
ছুরি দিয়ে
স্তনে এঁকেছে উল্কি ফালাফালা করেছে যোনি
মেয়েটির
প্রতি অঙ্গে প্রতিরোধের দৃপ্ত রুধির করুণ ইতিহাস।
দামিনী, ওই
কলজে লেপটানো ভয়ংকর বারুদ
ক্রোধ
তোমার চোখে অবিকল করাল কালীর মতো
এবার রঞ্জক
ঘরে দাবানল জ্বালাও অগ্নিবীনার কলমে।।
ফুলদানি
খেয়া সরকার
শরীরের নিজস্ব ভ্রান্তি নিয়ে
গান আর মায়ার পাশে
এই বসে থাকা
চোখের মণিতে সন্ধ্যারতির ছবি
ক্রমশ নিবিড়
পুরানের আখ্যানে নবজন্মের ঘোর
আগুনের গল্প শোনায়
বীরভোগ্যা বসুন্ধরা হিংসায় লাল
ড্রয়িংরুমে বুদ্ধমূর্তির পাশে ফুলদানি
খালি পড়ে থাকে
অপেক্ষা
ঝুমা সরকার
বিশ্ব যেন ত্রাসের কবলে
আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ ছিনিয়ে নিচ্ছে প্রাণ
মৃত্যুর পদধ্বনি গ্রাস করছে জীবন স্পন্দন
পৃথিবীর সবটুকু আলো ওরা ছিনিয়ে নিতে চায়।
স্বজন হারানোর বিষাদ ঘরে ঘরে
মৃত্যু-আতঙ্কে বাকরুদ্ধ ওরা
কারও ঘরে ফেরা হল না,
কেউ বা বদ্ধঘরেই......
যুদ্ধে কেউ যেতে না
দু-পক্ষকে হারিয়ে দিয়ে জিতে যায় সন্ত্রাস,ধ্বংস।
পড়ে থাকে ধ্বংসাবশেষ, রক্ত,মাংস
বাতাসে বারুদের গন্ধ...
এর শেষ কোথায়!
সবকিছু ফুরিয়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে
বোধোদয় হোক জীবনের, মানবতার
যুদ্ধকে হারিয়ে খুশি জিতে যাক
বিশ্বাসের কাছে অপেক্ষা যেন হেরে না-যায় ।
শেষ চিহ্ন
মৌমিতা জানা
স্বর্গ কি এর থেকেও বেশি সুন্দর !
পলাশ গাছের তলায় বিছিয়ে পড়ে আছে চুর্ণ বিচুর্ণ
মানুষের ঘোর লাগা চোখের রঙ,
তারি পাশে গায়ের কাপড় আলগা করে বসে আছে
বয়সী বিকেল মুখ,
তায় লেপে আছে ঘন অভাব শান্তি।
জীবনের ব্যর্থ গলিপথ হাঁটতে হাঁটতে সে
এক গাল নিখাদ হাসি হেসে দেয় সমস্ত দুঃখ অদৃশ্য রেখে,
সে টুকুই স্বর্গ-
আর তার চার ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কান্না,
অদ্ভুত সুন্দর কান্না, মানুষের কান্না-
দুঃখ বিগলিত নদীর দুপাশে মানুষেরা বসে আছে
অঙকুরিত দুটি পাতার মত উলঙ্গ আনন্দ মেখে।
কারা যেন এগিয়ে আসছে,
কেড়ে নিতে পারে স্বর্গীয় বসন্ত
মুছে দিতে পারে শোক,
পৃথিবীর থেকে মানুষের শেষ চিহ্ন
দুঃখ টুকুও-
রাস্তা
মালা ঘোষ মিত্র
একটা জীবন-----
কেমন ধোঁয়াশায় মিশে যাচ্ছে,
কতদিন জানালা দিয়ে দেখি
সাইকেলে চলে যাও----
চিনতে পারলেও তাকিয়ে দেখ না-----
নদীর মোহনায় বালি চকচকে----
সমীকরণের ধারায় সবই
জ্যামিতিকভাবে মিলতে হবে
অনুভূতির অবহেলায় বেখেয়ালি ঢেউ
অলিন্দে সাজানো থাকে গভীরতা,
লাল মোরামের রাস্তায়
হেঁটে যায় হাতে হাত রেখে।
বাতাসে থাকে রঙের খেলা
জমা জলে আলোর বিচ্ছুরণ-----
কুহক সৌন্দর্যে অনাবিল আনন্দ।।
আলো
মানসী সাহু
প্রাচীন রোগে আক্রান্ত মধ্যবিত্ত জ্যামিতি
যেখানে শূন্যতা অপরাধ হীন
দেবতা ও শাসক একে অপরের প্রতিবিম্ব।
তুমি যতই বিনয়ী হবে
আলোর বৃত্ত কমতে কমতে শূন্য
আলো পথ দেখালেও
সেই আলোতেই মানুষ অন্ধ হয়।
অস্তিত্ব
অনিন্দিতা সেন
একটা স্বপ্নের জন্য একটা ইচ্ছের জন্য একটা
টানের জন্য,
আজন্মের যাবতীয় অর্জন,কিছু
নিখাদ মায়া নিয়ে দিন রাত মু
হূর্ত মাড়িয়ে চলেছি। ছুটছি আমাকে তোমাকে, আমাদের
ফেলে।
অথচ রোজ,আলগা মুঠো শূন্য
বুক।অপ্রত্যাশিত!
পথ কখনও নিজের হয়না। যে যায় তার...
ঘরের কেউ না কেউ মালিক থাকে, আকাশ
সবার ছাদ।
নিত্য দোলাচলে আমরা একা হতে হতে স্বপ্নের
খুব কাছে বসে
ব্যথার পাহাড় গড়ছি, নিঃশব্দে
প্রাণহীন নিস্তব্ধতা
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
চোখের কোণ থেকে বৃষ্টি নামে
কথা নেই
কোন অভিমান নেই
কোন অভিযোগ নেই-
যেন নীরব
বিদায়
একদিন প্রাণ ছিল
আজ ভীষণ নিস্তব্ধ
শুধু দৃষ্টি মেলি
কিছু বলে উঠতে পারি না
অচেনা হাওয়া উড়ে এসে
চোখের ভেজা পাতা স্পর্শ করে
জাগিয়ে দেয় ভাঙা পাতার মতো
কিছু স্মৃতি ও নীরব চিৎকার
আর তাকিয়ে থাকি
শূন্য আকাশের ভেতর...
বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতা উৎসব
নিবিড় ঘুম চুম্বনে জেগে উঠছে
রাতের চর্যাপদ...
কংসাবতীর আদর জলে
ছলাৎ ছলাৎ সুখ
অজস্র কবিতা মুখে ভীড় করে আছে
অন্তর বাসের
ইতিকথা...
নকশা আঁকা চাদরে সাজানো
হুইস্কি স্তন আর...
পদ্ম যোনির জল ক্রিড়ার গল্পে
চাঁদ খুলে দিচ্ছে বিন্দাস আরামঘর...
লাল নীল সবুজ রঙিন উচ্চারণে
আজ সারা রাত কবিতা উৎসব...
মায়াবী
স্মৃতি দাস
হেমন্তের প্রারম্ভে এক সুন্দর স্বর্ণালী শুভক্ষণে,
দেখা হলো আজ তোমার সনে,
আজ তুমি সেজেছো নীলমণি নয়, সোহাগি শাপলা নয় __
আজ তুমি মায়াবী হলুদ মনি ,
লাগছে ভারী বেশ, কি মিষ্টি হাসিমুখে, আলতো হাত খোঁপায় বেলীফুলের গোড়, আর সাথে মায়াবী
চাহনি ।
মিলনের আকাশেতে, আজ আমরা উড়িয়েছি দুজনা ভালোবাসার
আঁচল
চরণে আজও বুঝি তোমার সর্ষে
বেছানো, কে পরাবে তোমায়
শেকল?
স্মৃতির মাঝে বেঁচে থাক, আমাদের এই মিষ্টি সোহাগের চর্যাপদ ....
বেহিসেবী
বিধানেন্দু পুরকাইত
যাকে ভালবাসব ভেবেছিলাম
সে ভালবাসতে পারেনি
যাকে পারিজাত দেবার ছিল
সে সময়ে আসতে পারেনি।
কথায় কথারা দোলে লক্ষ তারার ভীড়ে
মন হারা শাখামৃগ নিশ্চুপ খেয়ালে
কে হারায় কার বুকে রাতের পেঁচাটির ন্যায়
ভালবেসে কে কখন কাকে যে হারায়।
হাল ভাষা
অশোক অধিকারী
হালখাতা আমসর মঙ্গল ঘট স্থাপনা সব হল-
এবার ভোট দাও
তোমার আর আমার পরিচয় টিকিয়ে রাখতে।
আমি অনেকদিন বাংলা বলার উপবাসে আছি-
আব্ ঘিঁটতে পারিনি ওদের ভয়ে
সরীসৃপের মতো লুকিয়ে ওরা
শুনছে; আমার
পয়লা বৈশাখ বড়ো একলা।
আমার ভাষার কোনো অনুবাদক নেই
আমি আর আমার মা বৈশাখের আস্ত হালখাতা।
আমার বিপন্নতার বিরুদ্ধে তোমার ভোট
বেনাবুদা ঘাস অথবা কলা মোচার মতো সন্ধ্যা
গোবিন্দ বারিক
আশ্রয় ও ব্শ্যতার মাঝে কোনো দরজা নেই
আকাশ নেই , নেই নৈর্ব্যক্তিক কোনো জিজ্ঞাসা
অভ্যাসবশত মিসাইলের হানায় দগ্ধ শিশুদের গণকবর
পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য, ব্শ্যতার নেশায়
ধ্বংসাবশেষের সাইরেন।
কেউ জ্বলে,কেউ গর্জায় , আবার
কেউ শীতল
কেউ হায়না, কেউ ধূর্ত শৃগাল,কেউ
বা পাকাল
খুন হয় মানবিক অনুভূতি।
মধ্যযুগীয় কায়দায় ন্যাশানলিজমের পতন অনিবার্য
নিরপেক্ষতার জ্যোৎস্নায় যেন " যুদ্ধ চাই"
জোনাকির দাপাদাপি।
কোনো পথই সহজ নয়,
সব পথই হরমুজ প্রণালীর মতো দমবন্ধ আশঙ্কার
হুঙ্কার
চারদিকে ভয় আর লাট খাওয়া ঘুড়ির মতো
যুদ্ধবিমানের ঘাত-প্রতিঘাত, বর্বরতার
কুশিলব
আমি তো দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ।
বেনাবুদা ঘাস অথবা শুকনো কলা মোচার মতো
সন্ধ্যা নামলে কবিতা একলা জ্যোৎস্না হয়।
তবে কি মানুষের হাড়গোড় কি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য
একদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে ধ্বংসাবশেষ
তবুও একদিন মিসাইল বয়ে নিয়ে যাবে কবিতার ডালি
কবিতার জন্য হয়তো বন্ধ হবে লড়াইয়ের ময়দান।
স্মৃতি-সত্তা
অর্পিতা দাস
বিকেলের জাফরানী রোদে
সবেদা রং-এর ডানা মেলে চিল
আনমনে জানলার শিক ধরে -
দূরে কোথাও বেহালায় ছড়ে
ধ্বনিত হচ্ছে বৃন্দাবনী সারং
বকুলের গন্ধে বিহ্বল বাতাস
নিয়ে যায় কোন অতীতের দ্বারে।
নববর্ষ
জয়শ্রী সরকার
ভোরের আজান শুরু, পাখিদের কলরবে অন্ধকার ভেদ করে
নতুন সূর্যোদয়; পাতাঝরা ন্যাড়া গাছে সবুজের সমারোহ।
মাঠে মাঠে অনন্ত গালিচা, মৌবনে মায়াবী মহুয়ার দল
নেচে নেচে হেসে যায় গেয়ে যায় প্রাণ খুলে
মেঠো সুরে সাঁওতালি সুখী পরিবার, নববর্ষ এলো বুঝি!
'আনন্দধারা
বহিসে ভুবনে.....!'
সময়ের শূন্যোদ্যান পেরিয়ে শিলান্যাস হতে চলেছে
আরো একটা নতুন বছরের! কত প্রস্তুতি, ঢাকঢোল মিডিয়ার আলোড়ন
প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, কথামৃত আর হিতোপদেশ। তবু, কোথাও যেন
একটা
ফাঁক থেকে গেছে ক্ষুধা আর উদ্বৃত্তের মেলবন্ধনে;
তাই, নতুন
বছরের শুভলগ্নে সমুদ্র সবুজ ধ্যানে প্রার্থনা করি,
আর কোনো জনযুদ্ধ নয়, মনযুদ্ধ নয়, নয় কোনো রক্তপাত!
আস্ত একটা মানবিক পৃথিবী দেখতে চাইে চলমান জীবন্ত মর্গে।
প্রত্যয়ী কন্ঠে নিঃসীম আকুতি ধ্বনিত হোক,
'নব
আনন্দে জাগো জাগো......!'
অনুকবিতা
অরুণাভ বীর
১
চাওয়া-পাওয়ার
অস্থিরতায় থাকে টুকরো টুকরো অচেনা একমুঠো
অবিশ্বাস---
সেই অলীক ছন্দের
বানভাসিতে সাজঘরের ধূলোয় থাকে শেষ মিথ্যার নিঃশ্বাস...
২
ভিজে ভিজে চোখ
দেখে ঘুমে ঢাকা সব আকাশের তারা-রা ---
একা একা থাকা সাদা-কালো শব্দের বাতাসে আমি হলাম দিশাহারা...
৩
ঠিকানা ভুলে
যাওয়া কবিতার আঁচলের আড়ালে আমি---
তাই হারিয়ে
যাওয়া স্মৃতির আকর নিঃশব্দের রণভূমি...
৪
শূণ্যতা বিরাজ
করে আজি অস্তিত্বের শশ্মানের শুষ্ক মননে---
নীরবতায় ডুবে আছি আমি ভালো না লাগার কাঠামো হীন দহনে.
জোনাকি
রূপক চট্টোপাধ্যায়
শরীরে রাত ধরলে স্নেহলতা জোনাকি হয়ে যায়।
শুধু রাত গুলিই তার কাছে
রঙিন বেলুনের মতো নেচে নেচে কাছে আসো।
গাঢ় গন্ধের বুনো ফুল ফোটে শরীরে চৌহদ্দি জুড়ে
লক্ষ্মী পেঁচার ডাকে চাঁদ ঠেকে
দেউলিয়া মেঘের কার্নিশে।
সার দিন একটি ঘরের ভেতর বিষন্ন নদীর মতো একাকিনী, পড়ে থাকে স্নেহলতা দুলে। রাত হলে
তখন সুস্পষ্ট হয় জোনাকির আলো। সে তখন হলুদ জোনাকির মতো নেচে বেড়ায় রূপের চাতালে!
আলোর তৃষ্ণায় যে পুরুষটি
দিনমজুরি শেষে ঘরে ফিরবে
তুষার ক্ষত, শরীরের ক্লান্তি নিয়ে
তার জন্য ডানার আড়ালে সব আগুন লুকিয়ে রাখতে হয় যে!
বিরক্তি
অমিত গোলুই
দাসনগর আর হাওড়া স্টেশনের মাঝে
টিকিয়াপাড়া কারশেডে দুটো ট্রেন
পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে বহুক্ষণ।
একটার মুখ হাওড়ার দিকে
আর একটার দাসনগরের দিকে।
দুটো ট্রেনের যাত্রীদের
গন্তব্য আলাদা আলাদা হলেও
প্রত্যেকের মুখে বিরক্তির রঙ
এক।
সময়
রথীন পার্থ মণ্ডল
এপাড়ে আমি
ওপাড়ে তুমি
মাঝখানে শুধু বয়ে যায়
সময় নামের নদী
যার হাত ধরে ফিরতে চাইলেও
ফেরার অপেক্ষায় থেকে যাই এখনও।।
মিশে যাই পৃথিবীর আত্মায়
চায়না খাতুন
অস্থির সময়ে নীল রক্তের রেখা
বিষাদ বিছানো চৈত্র দুপুরে আমি
আর আমার উদাসী রোদ্দুর
ফাঁকা বারান্দায় পড়ে থাকা
মিয়ানো মুড়ি ঠোঁটে শালিক
ওর স্বরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন!
সময় সুতোর বিকেলে ছায়া ফেলে
মেঘ
চিত্রিত আঁচলে একা চৈত্রাআকাশ
ঝোড়ো হাওয়ার বিজয় রথে দম্ভ
অহম চোয়ানো ঘামের সমাধি
স্বস্তির মাতন লাগে গাছে গাছে
ঝরে পড়ে টুপটাপ বৃষ্টি
কানে আসে সবুজের গান
মিশে যাই পৃথিবীর আত্মায়।
আশা রাখি না
মনীষা কর বাগচী
ভেবো না কষ্টে আছি। আসলে কষ্টের দেওয়ালে
খুশির প্রলেপ চড়িয়ে দিব্যি বেঁচে থাকতে শিখে গেছি এখন।
গদ্যময় এই জীবন এমনই চলছে অনন্ত কাল!
সদ্য প্রস্ফুটিত স্থলপদ্মের দিব্যি, সাদাতেই
সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস করে ফেলেছি।
গোলাপী হওয়ার আশা রাখি না আর।
কৃষ্ণাংশু মাকুড়ের লেখা কবিতা
ঈশ্বর দর্শন
কাল রাতে ঈশ্বর এসেছিলেন
কোন রাজ পোশাক ছিল না তার গায়ে
মাথায় ছিল না রাজকীয় উষ্ণীষ
কোন জ্যোতিও ঠিকরে পড়েনি চতুষ্পার্শ্বে
ঈশ্বর এমন হয়, বিশ্বাস হয় নি !
তিনি তার ঝোলা থেকে লোভ উপুড় করে ছড়িয়ে ফেললেন
খুলে ফেললেন
অস্মিতার সাজ
ঘষে ঘষে মোহ তুললেন বাসী ময়লার মতো
কাম সর্বস্ব কৌপিন ভাসালেন কালিন্দীর জলে...
এমন শুভ্র পবিত্র রূপ দেখে দুটি নয়ন নেচে উঠল
তিনি আমার দিকে করতল প্রসারিত করতেই
আমার দিগম্বর শরীর বায়বীয় হয়ে ভেসে উঠল
তন্দ্রামুক্ত শরীর ছেড়ে উদাসীন জাগি, অবলীলায়
লুব্ধ কুকুরের মতো সারা গায়ে লেপ্টে নিই
আকাশ ভাঙা সংসার...
দুই পাখি
শংকরপ্রসাদ গুড়িয়া
একই গাছে থাকে দুই পাখি,
একটি নিচে, আর একটি উঁচু ডালে ।
নিচের পাখি চঞ্চল মনে
সুখ-দুঃখের ফল খায় রোজ।
উপরের পাখি শান্ত নীরব,
কেবল দেখে স্থির দৃষ্টিতে।
ক্লান্ত হয়ে একদিন নিচের পাখি
তাকায় আলো ভরা সেই দিকে।
আশা জাগে, বিশ্বাস বাড়ে,
ধীরে ধীরে ওঠে উপরে।
ভালোবাসায় কাছে এসে
চিনে নেয় নিজের সত্য রূপ।
শেষে মিলে যায় দুই পাখি—
একই সত্তা, এক আলো।
পারাপার
সুনীতা ব্যানার্জী
মাকে কে কবে দুঃখের নদীতে ঠেলে দিয়েছে
জানি না
জ্ঞান হওয়ায় পর থেকে চোয়াল পযর্ন্ত ডুবে ।
এদিক ওদিক হওয়ার উপায় নেই,
কোথায় কোন গর্ত...
বড়ো হতে হতে ভাবছি এবার অন্তত জল নামবে
আমরা উঠব ডাঙায় ।
কোথায় ?
যতো বড়ো হচ্ছি নদীতে বেনে জল ঢুকছে ।
আসেপাশে অসংখ্য পরিচিত অপরিচিতজন নিরর্থক
ব্যস্ততায় ভান ।
তার মধ্যে একজন বাউন্ডুলে বাউল
গানের মধ্যে সংকেত ছড়িয়ে গেলেন !
ভবের সংসার,হাবুডুবু খেতে খেতে শিখে নিতে হবে
সাঁতার...
তারপর আপনি পারাপার ।
মন খারাপের আখ্যান
রীতা দেব বেরা
মনের অলিন্দ বেয়ে যদি ছুটে আসত এক চিলতে রোদ
বলতাম রোদ তুই নিয়ে যা না , আমার মন খারাপের বাতাসগুলো
হটাৎ যদি হতে পারতাম কোন মাছরাঙা বা ফিনিক্স
এক লহমায় বস্ করে তোকে বানতাম . ....
আর যদি পারতাম তোর হৃদয় ছুঁয়ে মন খারাপের কথা বলতে
তুইও বলতিস , অনেক হয়েছে বাপু ছাড় তো
এ সব তার চেয়ে বানাই চল পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট কুঁড়ে
স্বপ্ন যদি সার্থক হতো কষ্টগুলো সব থাকতো দূরে
মরুভূমিতে মিছেই খনন । কষ্ট করেও জল না মেলে
মিথ্য আস্বাস মিথ্যে প্রতিশ্রুতিগুলো ছুঁড়ে ফেলি বরং সাগর অনিলে ।
কৌশল
শান্তিব্রত বারিক
নির্জন সন্ধ্যায় আমাকে ছেড়ে গেলে
সামান্য আলোর নেশায়,
গলিপথে তখন ঘুমিয়েছে কোলাহল।
কালো চাদরে ঢেকেছে গ্ৰাম
আশ্বিনের দেওয়ালে আশ্চর্য কুয়াশা,
বিরহজ্বর মাপছে দেহাতি কপাল।
সাহসী আঙুলে ধাতু বদল করলে
ছায়া রেখে উড়ে যায় ক্ষত ,
সেই ডানার আলস্য রপ্ত করি --
বাতাসে দুঃখ পুঁতবো বলে.....
ভাস্কর্য দহন
শ্যামল রক্ষিত
১
কেবল দর্শনটি নেচেকুঁদে বেড়ায়
পয়ারের হাত ধরে ছালবাকলের
রাষ্ট্রে সারাদিন বৃষ্টি পড়ে
চর্বিতচর্বন হিংসার রাজত্বে
গৃহযুদ্ধ শুরু হয়
প্রাণসংশয়ের নামাবলি গায়ে
জরায়ুতে আটকে পড়ে
শেষপ্রহরের পাণ্ডুলিপি
র্যাঁবো চিৎকার করে: দেয়ালে পিঠ
ঠেকিয়ে চারমিনারে শেষ টান দেয় নিরপেক্ষ ভাস্কর্য ।
২
খ্রিষ্ট্র যুগ পেরিয়ে
স্বেচ্ছামৃত্যুর দিন গ্রন্থাগারের আগুন লাগে
তারপর একটা অগ্নিযুগ লেখা হয়
ক্ষমতাহস্তান্তরের ভাষায়
ব্যর্থতার ছাঁকনি হাতে
রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলির শেষ পাতায় লিখে ফেলে
আত্মপ্রত্যয়ের সূর্যাস্ত
আবিস্কারককে বলি: কলমকে সোজা
করে মৃত্যুর জ্যামিতিগুলো সাংবিধানিক করো
অশ্রুকে কাছায় বেঁধে যারা
গণশত্রু চিহ্নিত করার খেলায় নেমেছে
জেনো, তাদের চেয়ে বড়ো কোনো মৌলবাদী এ
বিশ্বে নেই ।
তোমার সঙ্গে
ননীগোপাল জানা
মাঝে গত মাত্র সাড়ে একটি দিন
তাও দিনটি ছিল
বিদ্যুৎবিহীন।
দুরাভাষের দুর্বল শরীরও একটি কারণ
মনে হয় কাব্য কথা হয়নি তোমার সাথে
মনে হয় দেখা ও
হয়নি ,
হয়েছিল যুগান্তর
আগে।
সময়ের দূরত্ব ক্রমশ চাঁদে
তোমার জন্য এমন
বৃহৎ ক্ষুধা
লাগেনি ইদানিং আগে।
তোমার সঙ্গে কেন এমন হয় !
কোনো আছে কি ধার বাকি?
আসলে চার বর্ণের
নেশায় আমি বুঁদ
চার লক্ষ ঋণ দিয়েছি ফাঁকি !
না হলে শুধু
তোমার জন্য কেনই
এত মগ্ন আমার
নগ্ন উঁকি ঝুঁকি?
ফাঁদ
সরজিৎ মণ্ডল
আবার ট্রেনে, আবার কবিতা
বিষয় ছড়ানো, মন পালানো
ছন্দ মন্দ গন্ধ সবই ধন্ধ,
উদ্দেশ্যের পথে চরম গতিতে
হারিয়ে যাওয়াকে খুঁজে ধরা জি.পি.এস-এ চোখ
বউয়ের জি.পে-তে সম্পর্কের অনুশীলন
দায়িত্বের টানাপোড়েন আর
বাঁচার গুরুদায়িত্ব, মরে না মারা
অন্ধ কবি প্রকৃতি দেখে না
শুধু কর্তব্য মাথায় রেখে রানার রানার
ধরিত্রীর পসরা ব্যর্থ
ধাতার প্ল্যানে জব্দ মানুষ
সরণ শূন্য ফাঁদে ধরা, নাকি
হারতে হারতে হারিয়ে যাবে!
জ্বর
নিরঞ্জন জানা
...তবু বলবো, তবু বলবো—আমার এখন জ্বর আসুক,
তোমার নরম হাত কপাল ছুঁয়ে স্পর্শ করে থাকুক
বসন্ত ফোটার অপেক্ষায়।
তোমার চিবুক চুঁইয়ে চুঁইয়ে টুপটুপ করে ঝরে পড়ুক ঘাম
আমার কপালের জলপট্টিতে।
চিবুক চিবুকের আরো কাছে নেমে এসে জিজ্ঞাসা করুক ঠোঁট,
‘কী,
কেমন আছো, কেমন লাগছে তোমার এখন?’
ঠোঁট ডুবে যাক আদরে চাতকের তৃষ্ণা নিয়ে
আমাদের কথারা হারিয়ে যাক আমাদের ফাগুন দৃষ্টিতে।
এক অদৃশ্য দরজার ওপারে
রেজাউল করীম।
পুরোনো বছরটা আজ
একটা ভাঙা ঘড়ির মতো জানালায় ঝুলে—
তার কাঁটা থেমে গেছে তোমার শেষ দীর্ঘশ্বাসে।
নতুন বছর আসে,
পায়ে পায়ে, যেন বৃষ্টির ভেতর দিয়ে হেঁটে আসা কোনো ডাকপিয়ন,
হাতে অচেনা খামের ভেতর ভাঁজ করা রোদ।
তুমি কি খুলে দেখবে?
নাকি রেখে দেবে—
অতীতের আলমারিতে, ধুলোর সঙ্গে?
দেখো, ক্যালেন্ডারের পাতা আজ
পাখির ডানার মতো কাঁপছে—
উড়ে যেতে চায় তোমার অনিশ্চিত আকাশে।
এই বছর,
সময়কে নদী ভাবো—
নিজেকে শুধু এক টুকরো নৌকা।
ইতিহাসের কালো পাতা
নীলোৎপল জানাতোমাকে আমার ভালো লাগে না মানেই যুদ্ধ নয়
তোমাকে আমার হিংসা করে মানেই যুদ্ধ নয়...
যুদ্ধ মানে ভাঙা জানালায় ঝুলে থাকা শৈশব,
বইয়ের পাতায় জমে থাকা বীভৎস সকাল
যে মাঠে ধান উঠত, সেখানে ধোঁয়ার ঘ্রাণ,
যে নদী গান গাইত, সেখানে কাঁপে আতঙ্ক।
বন্দুকের শব্দে পাখিরা পথ ভুলে যায়,
মায়ের ডাকে কেঁপে ওঠে নিঃসঙ্গ নীল আকাশ।
কার লাভ এই আগুনে, কার জয় এই ছাইয়ে?
একটি শিশুর অশ্রু কি কোনো জাতীয় পতাকার চেয়ে ছোট?
মানুষ মানুষকে হারায়,
শুধু ইতিহাস বাড়ায় নিজের কালো পৃষ্ঠা।
আমি চাই না আর কোনো বিজয়ের মিছিল,
চাই শুধু হাত ধরাধরি করে বাঁচার স্বরবর্ণ।
0 মন্তব্যসমূহ