E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১১৮তম চতুর্থ সংখ্যা ২০২৬ ।। কবি কৃষ্ণাংশু মাকুড়ের গুচ্ছকবিতা

 E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১১৮তম চতুর্থ সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com

কৃষ্ণাংশু মাকুড়ের গুচ্ছকবিতা

হৃদপকেট

 

এলে বলে, ক'টা কথা বলি তবে

শোনাবার সময় কি আর হবে, এরপর?

এইমাত্র ওরা সব মুছে দিয়ে যাবে ইহকাল

 

কিছু পেলে, ছড়ানো ছেটানো খাটে,

বালিশের আগাপাশতলা?

হৃদপকেটের বাঁ-দিকে হাত রেখে দ্যাখো

থরে থরে হিম জমা আছে হাড়ের ভিতর

ছোঁয়া পেলে ঘুমন্ত পিউপারা প্রজাপতি হবে

যাওয়ার আগে বলবার বড় প্রয়োজন

আর তো কয়েকটা ক্ষণ - বল হরি, হরিবোল!

২.

ভাত

 

যেদিন দু'একটা তরকারি বেশি হয়

আমি বউ-এর দিকে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকাই

 

আমাদের ঢলঢলে ডাল আর

তেঁতুলের টক ঘুরে ফিরে আসে

তরকারিতে মাছ থাকে না

নুন আর কাঁচা লঙ্কা হলে একথালা ভাত আরামসে...

বউটার অপুষ্টি, ডাক্তার বলেছে,

পেটভরে ভালো- মন্দ খেতে

খাইতো একবেলা ভরপেট রেশনের ভাত

শাক-পাতা, গেঁড়ি - গুগলি তুলে আনে বউ

গরু ছাগলের মতো কাঁচা নয়, সেদ্ধ করে

মন্দ খাই না...

 বোধহয়, বউটা এবার বেঁচে যাবে নেহাত!

৩.

নিঃস্ব

 

বুকের সন্ন্যাস নিয়ে চলে যেতে চাই

অনিকেত অমূল্য কানন

যেটুকু মায়া অবসন্ন রাত্রি শেষে

খসে পড়ুক শিশিরের মতো

আমাকে নিঃস্ব করে দাও

খুলে নিও

অভিলাষ, প্রেম হৃদয়ের নীল সুতো

আমার নাড়িতে যায় জড়িয়ে

অহেতুক রক্ত জল ঘাম

আস্ত এক জীবনের মতো...

মোহনবাঁশি

 

মোহময় সুর ওঠে হেমন্তের মাংসল বুকে

ছিদ্র জুড়ে হাহাকার দহনবেলার

ওষ্ঠস্পর্শে শিহরণ  জাদুকরী রমণ...

 

বাঁশিটার কী যেন নাম

 

মোহনবাঁশি !

বেঅকুব

 

চলে যাওয়া এক অভ্যাস

তার ভেতর ঢুকে পড়ে

অপ্রীতিকর শোক দুঃখ বেদনা

 

একখণ্ড জীবনের কপালে

বলিরেখা দেখতে দেখতে

প্রতিরাতে ষোড়শী চাঁদ ওঠে

 

ফুল্ল চিতার পাশে দাঁড়িয়ে

অসম্ভব হাসে

বড্ড বেঅকুব ছিলে হে !

 

==============================

কৃষ্ণাংশু মাকুড়ের গুচ্ছকবিতার আলোচনা



     কৃষ্ণাংশু মাকুড়ের গুচ্ছকবিতা হৃদপকেট সমকালীন বাংলা কবিতার এক গভীর সংবেদনশীল দলিল, যেখানে ব্যক্তিগত অভাব, প্রেম, শরীর, দারিদ্র্য অস্তিত্বগত শূন্যতা মিলেমিশে এক অনুচ্চ অথচ তীক্ষ্ণ ভাষা নির্মাণ করেছে। পাঁচটি কবিতাই আলাদা আলাদা অনুভবের স্তর তৈরি করলেও, অন্তঃস্রোতে এরা একে অপরের সঙ্গে যুক্তএকটি জীবনের ভাঙাচোরা মানচিত্রের মতো।

     

প্রথম কবিতা হৃদপকেট- কবি সময়ের অনিশ্চয়তা মুছে যাওয়ার আতঙ্ককে হৃদয়ের ভৌত রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।হৃদপকেটের বাঁ-দিকে হাত রেখে দ্যাখো”—এই আহ্বান পাঠককে সরাসরি শরীরের ভেতরের জমাট শীতলতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এখানেঘুমন্ত পিউপারাভবিষ্যতের সম্ভাবনা, যা স্পর্শ পেলে প্রজাপতি হতে পারেঅর্থাৎ ভালোবাসা বা উচ্চারণই মুক্তির একমাত্র পথ। শেষ পঙ্‌ক্তিরবল হরি, হরিবোল!” একদিকে মৃত্যুচেতনা, অন্যদিকে জীবনের শেষ আশ্রয় হিসেবে নামস্মরণের ইঙ্গিত বহন করে।

     

দ্বিতীয় কবিতা ভাত এই গুচ্ছের সবচেয়ে মাটির কাছাকাছি কবিতা। দারিদ্র্য এখানে কেবল সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং ভালোবাসার ভাষা। দুএকটা তরকারি বেশি হলে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকা এক নীরব কৃতজ্ঞতা অপরাধবোধের দৃশ্য। অপুষ্টি, রেশন, শাক-পাতা, গেঁড়ি-গুগলিএই শব্দগুলো কবিতাকে গ্রামবাংলার বাস্তব জীবনে স্থাপন করে। শেষ পঙ্‌ক্তিরবোধহয়, বউটা এবার বেঁচে যাবে নেহাত!”—এই আশঙ্কামিশ্রিত আশাবাদ কবিতাটিকে গভীর মানবিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

      

তৃতীয় কবিতা নিঃস্ব আত্মবিসর্জনের কবিতা। এখানে কবি চায় সমস্ত মায়া, অভিলাষ, প্রেম খুলে নেওয়া হোক।বুকের সন্ন্যাসঅনিকেত অমূল্য কানন”—এই দ্বৈতচিত্র সংসারত্যাগ মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। রক্ত, জল, ঘামজীবনের জৈবিক চক্র এখানে ক্লান্ত অর্থহীন বলে প্রতীয়মান। নিঃস্বতা এখানে দারিদ্র্য নয়, বরং সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করার ইচ্ছা।

     

 “মোহনবাঁশি কবিতাটি সংক্ষিপ্ত অথচ সুরেলা। হেমন্তের শরীরী উপস্থিতি, বাঁশির ছিদ্রজুড়ে হাহাকারসব মিলিয়ে এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আবহ।মোহনবাঁশিনামটি কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়, এক মোহময় আহ্বানযা শরীর প্রকৃতিকে এক সূত্রে বাঁধে।


      শেষ কবিতা বেঅকুব- জীবনকে দেখা হয়েছে এক নিষ্ঠুর অভ্যাস হিসেবে। শোকের মধ্যে থেকেওফুল্ল চিতার পাশে দাঁড়িয়ে / অসম্ভব হাসে”—এই চিত্র ভয়ংকর রকমের দ্ব্যর্থক। এখানে হাসি আত্মরক্ষার কৌশল, না কি চরম বৈরাগ্যতা স্পষ্ট নয়।বড্ড বেঅকুব ছিলে হে!”—এই সম্বোধন যেন নিজের প্রতিই, নিজের বেঁচে থাকার প্রতি।

সমগ্র গুচ্ছকবিতায় কৃষ্ণাংশু মাকুড় ভাষার বাহুল্য এড়িয়ে সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ ইমেজ-নির্ভর কবিতাভাষা নির্মাণ করেছেন। দারিদ্র্য, প্রেম মৃত্যুচেতনা এখানে করুণার বস্তু নয়বরং জীবনের অনিবার্য সত্য। এই কবিতাগুলি পাঠকের হৃদপকেটেও ধীরে ধীরে হিম জমিয়ে দেয়যা ছোঁয়া পেলে ভাবনার প্রজাপতি হয়ে উঠতে পারে।

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ