E-দুইপাতা পত্রিকা
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
১১৯তম চতুর্থ সংখ্যা ২০২৬
duiipatalokpathpatrika78@gmail.com
শান্তনু ভট্টাচার্য এর ৩টি কবিতা
কবির যাত্রা
১.
একটা মাঝবয়সি ছায়া হেঁটে চলেছে
সারা শরীর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে মৃত জল
কাঁধের ঝোলায় খাবার নয়, কবিতার পান্ডুলিপি নয়
রয়েছে- কিছু শুকনোপাতা আর আগুন।
সে এগিয়ে চলেছে
সবাই জিজ্ঞেস করছে- ‘কোথায় যাচ্ছ কবি?’
সে ঘাড় না ঘুরিয়ে উত্তরে বলে-
‘নতুন দেশকে ডাকতে যাচ্ছি’
সেই থেকে নতুন দেশের জন্য
সীমান্তের দিকে মুখ করে বসে আছে সবাই।
বহু বছর পর সেই মাঝবয়সী ছায়া-
বৃদ্ধ হয়ে ফিরে আসলে সকলেই ছুটে গেল তার কাছে
দেখলো তার ঝুলিতে কোনো নতুন দেশ নেই
শুধু চোখ দুটোয় ফুটে আছে ব্রম্ভকমল।
২.
নিজের বাড়ির দরজা
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি
দীর্ঘক্ষণ...
প্রতিদিন
নিজের বাড়ির দরজার সামনে
কেউ এসে খুলবে হাসিমুখে
তার আলোয়
আমি দেখব সামনের পথ।
এলোমেলো হাওয়া; ধুলোর ঘূর্ণিঝড়
ঝরাপাতা এই সমস্ত কাটিয়ে
বাঁচিয়ে
আমি ফিরে যেতে চাই।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
বহুক্ষণ
প্রতিদিন
অপেক্ষা করি
নিজের বাড়ির দরজার সামনে
একদিন কেউ এসে দরজা খুলবে….
৩.
এই সময়ের শোক
খন্ড খন্ড বৃষ্টি
ঝরে পড়ছে দাউ দাউ চিতার ওপর
চিতা? নাকি ফেলে আসা সংগ্রাম
ক্রমশ মিশে যাচ্ছো আগুনে আগুনে
ছাইয়ে ছাইয়ে জমে রয়েছে
ফেলে আসা সুখ দুঃখ অপমানের লিথোগ্রাফ
আকাশের সাথে মিলেমিশে ভালোবাসা
জল নিয়ে ঝরে পড়ছে তোমার উপর
এখন উল্টো সময়।ঘড়ির কাটা উল্টোদিকে ঘোরে।
ত্রিভুজের ভেতর বসে কেউ বা কারা
বর্গক্ষেত্রের স্বপ্ন দেখে...
তবুও আগামীর পাতায় পাতায় রয়ে যায়
চোখের জল আর সংগ্রামের দিনলিপি
মুছে দিতে চাইলেও ফুটে ওঠে বারবার...
শান্তনু ভট্টাচার্য এর ৩টি কবিতার সংক্ষিপ্ত আলোচনা
আধুনিক বিদেশী কবিতায় মৃত্যুচেতনা কেবল জৈবিক অবসানের অনুষঙ্গ নয়; বরং তা অস্তিত্ববাদী সংকট, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও মানবচেতনার ভাঙনের প্রতীক হিসেবে উপস্থিত। টি. এস. এলিয়ট, রিলকে, পল সেলান, সিলভিয়া প্লাথ প্রমুখ কবিদের কবিতায় মৃত্যু ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে উত্তীর্ণ হয়ে এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণের রূপ ধারণ করে। এই মৃত্যুচেতনার অনুষঙ্গেই শান্তনু ভট্টাচার্যের কবিতাগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর কবিতায় মৃত্যু আধুনিক মানুষের ব্যর্থ স্বপ্ন, বিচ্ছিন্নতা ও সংগ্রামের ইতিহাসকে বহন করে।
প্রথম কবিতা “কবির যাত্রা”-য় যে “মাঝবয়সি ছায়া”র উপস্থিতি, তা আধুনিক বিদেশী কবিতার ‘ডিহিউম্যানাইজড সাবজেক্ট’-এর সঙ্গে তুলনীয়। এই কবি ‘নতুন দেশ’ খুঁজতে বেরোলেও ফিরে আসে শূন্য হাতে। বিদেশী আধুনিক কবিতায় যেমন বিপ্লব, মুক্তি বা ইউটোপিয়ার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে (টি. এস. এলিয়টের The Waste Land), এখানেও তেমনই ব্যর্থ যাত্রার শেষে কেবল অন্তর্গত আলোকপ্রাপ্তির প্রতীক “ব্রহ্মকমল” ফুটে ওঠে। মৃত্যু এখানে স্বপ্নের অবসান এবং চেতনার উত্তরণের দ্বৈত প্রতীক।
দ্বিতীয় কবিতা “নিজের বাড়ির দরজা” অস্তিত্ববাদী অপেক্ষার কবিতা। এই প্রতীক্ষা কাফকার রচনায় বর্ণিত ‘অপ্রাপ্ত প্রবেশাধিকার’-এর স্মারক। দরজা এখানে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সীমারেখা। কবি যে আশ্রয়ের প্রত্যাশা করে, তা আদতে জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—যা বিদেশী কবিতায় মৃত্যুকে পরম বিশ্রামের রূপ দেয়। এই প্রতীক্ষা এক প্রকার নীরব মৃত্যুচেতনা, যেখানে জীবন নিজেই বোঝা হয়ে ওঠে।
তৃতীয় কবিতা “এই সময়ের শোক” সরাসরি সমষ্টিগত মৃত্যুচেতনার কবিতা। চিতা, আগুন, ছাই—এই চিত্রকল্প পল সেলানের হলোকাস্ট-পরবর্তী কবিতার মতোই ব্যক্তিগত শোককে ইতিহাসের সহিংস বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে। এখানে চিতা শুধু মৃত মানুষের নয়, বরং “ফেলে আসা সংগ্রাম”-এর। সময় উল্টো ঘোরে—এ অস্তিত্ববাদী বিশৃঙ্খলা, যা আধুনিক বিদেশী কবিতার সময়-চেতনার বিপর্যয়কে স্মরণ করায়।
সার্বিকভাবে বলা যায়,
শান্তনু ভট্টাচার্যের কবিতায় মৃত্যুচেতনা বিদেশী আধুনিক কবিদের ধারার সঙ্গে গভীরভাবে
সংযুক্ত। মৃত্যু এখানে সমাপ্তি নয়, বরং ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্মৃতির পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি।
ব্যক্তি-যন্ত্রণা থেকে সমষ্টিগত বেদনায় উত্তরণের এই প্রবণতাই তাঁর কবিতাকে বিশ্বকবিতার
অস্তিত্ববাদী ধারায় স্থাপন করে।
0 মন্তব্যসমূহ