E-দুইপাতা পত্রিকা
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
১১৯তম তৃতীয় সংখ্যা ২০২৬
duiipatalokpathpatrika78@gmail.com

গৌতম রায়ের পাঁচটি কবিতা
জাগ্রত দেশে
টানটান অভিমুখ হলেও
বৃষ্টি ভারে মেহুলি হও বারবার।
আমাকেও বৃষ্টি দাও–
বিনয় বিনীত শুশ্রূষায় মুছে যাক
ফাইব্রয়েড।
আমার আইসবার্গ প্রতীক্ষা–
মোতি ঝর্না পাতে
কখন মেরু সাগর হবে?
কবে হবে মাছেদের আশ্রয়?
প্রতীক্ষা হাঁটে প্যাঙ্গুইন চালে,
এখানে সূর্যের আগুন খেয়ে
উভয়ত পতনশীল জাগ্রত দেশে
বাড়ে জলস্তর ।
২.
আবার মেহুলি ওড়ে
তাকে কী হারিয়ে যেতে দেওয়া যায়
সেতো কৃত্তিকা
হৃদয়ে তার গোপন গুহা
অহরহ আলো আসে
আলো।
সহসা সাটার ক্লিক করে যায়
আয়নার ভেতর আয়না পড়ি
আয়নায় আঁকি চন্দ্রিমা।
বৃষ্টি কী থেমে যায়?
আবার মেহুলি ওড়ে ঈশান কোণে
গোবর্ধন পরিক্রমায় দেহভার
আবার বৃষ্টি নামায়
অভিরাম
অবিরাম।
৩.
আবেশে আবেশে
রক্ত গোলাপ রঙের সালোয়ার–
কারসার টেনে টেনে রান সেলাইয়ে
ফিতে কাটি,
গোলাপি হয় গোলাপ বাগিচা।
লালটিপ পরিক্রমণে ফোটে দিন রাত্তির।
হাঁটছি হাঁটছি ইতিহাস মাথায়।
আবেশে আবেশে সারা বিশ্ব হয়
জাকির হোসেন গোলাপ উদ্যান।
৪.
শিরোনামের আগে
বেরিয়ে এলে দক্ষিণ চিলির মার্বেল
কেভস থেকে
তোমাকে গড়েছে হাজার আলোড়ন।
তোমার বিষ্ময়ে যত নৈবেদ্য নিবেদন
তোমাকেই দেখি
ইতিহাস ভেঙে ভেঙে সৃজন করি ঈশ্বরী,
একটা স্থাপত্যের শিরোনামের আগে
দীর্ঘ মাটির শঙ্খনাদ শুনে জেগে
উঠি সহস্রবার।
৫.
পরিযায়ী গান
চোখ পাতি কান পাতি
পাতি হৃদয়,
এসব সাঁতারু কথারা সুরতালে ডানা
পেলে
পরিযায়ী বালিহাঁস সরগম উড়ান হয়।
এ গ্রহে আমরা কী কেউ কখনও বেঁধেছি
শাশ্বত আশ্রয়?
জানালার দৃষ্টিতে শুধু আকাশ ইজেল
খোদাই করেছি অনুকূল প্রতিকূল– আমাদের
লিপ্তপদ সাঁতার সময়।
ঋতুর অতিথি হয়ে গেয়েছি অন্তরের
উজ্জীবিত গান।
সাদা কলম ছাড়াই একে তুমি
নাম রাখো পরিযায়ী গান,
জলস্থল অন্তরীক্ষের গান
পৃথিবীত্বের চত্বর গান।
------+--+---+--
নিচে গৌতম রায়ের দুটি কবিতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো—
গৌতম রায়ের এই দুইটি কবিতা সমকালীন মানুষের অন্তর্গত সংকট, প্রতীক্ষা, স্মৃতি ও পুনর্জাগরণের এক গভীর রূপক নির্মাণ করে। কবিতাগুলিতে প্রকৃতি, দেহ, সময় ও চেতনা—এই চারটি স্তর একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে একটি বহুমাত্রিক অর্থবহ জগৎ সৃষ্টি করেছে।
প্রথম কবিতায় “বৃষ্টি” একটি মুখ্য প্রতীক। বৃষ্টি এখানে কেবল প্রকৃতির ঘটনা নয়, বরং তা শুদ্ধি, আরোগ্য ও করুণার প্রতীক। “আমাকেও বৃষ্টি দাও— / বিনয় বিনীত শুশ্রূষায় মুছে যাক ফাইব্রয়েড”—এই পংক্তিতে দেহগত যন্ত্রণা ও মানসিক ক্লান্তি একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। ফাইব্রয়েড এখানে নারীর দেহযন্ত্রণার পাশাপাশি সমাজে জমে থাকা নীরব ব্যথারও ইঙ্গিত বহন করে। কবি যেন বৃষ্টির মাধ্যমে এক মুক্তি, এক স্নিগ্ধ আরোগ্য কামনা করছেন।
“আইসবার্গ প্রতীক্ষা”, “মেরু সাগর”, “প্যাঙ্গুইন চালে প্রতীক্ষা”—এইসব চিত্রকল্পে হিমায়িত সময় ও দীর্ঘ অপেক্ষার অনুভূতি ফুটে ওঠে। জলস্তর বৃদ্ধির উল্লেখ বর্তমান বিশ্বের পরিবেশগত সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে, আবার একই সঙ্গে তা আবেগ ও যন্ত্রণার অতিপ্রবাহকেও বোঝায়। “উভয়ত পতনশীল জাগ্রত দেশ” বলতে কবি একদিকে ভৌগোলিক বাস্তবতা, অন্যদিকে মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেও ইশারা করেছেন।
দ্বিতীয় কবিতায় “মেহুলি” একটি পুনরাবৃত্ত প্রতীক। মেহুলি কখনো স্মৃতি, কখনো প্রেম, কখনো কল্পনার রূপে আবির্ভূত হয়। “সে তো কৃত্তিকা”—এই পংক্তিতে তাকে নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা হারিয়ে গিয়েও আলো দেয়। হৃদয়ের “গোপন গুহা”য় অহরহ আলো আসার অর্থ হলো—অবচেতনে সে এখনো জীবিত।
“সাটার ক্লিক”, “আয়নার ভেতর আয়না”—এই আধুনিক চিত্রকল্প স্মৃতি ধারণ ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। আয়নায় চন্দ্রিমা আঁকার মধ্য দিয়ে কবি বাস্তবের ভেতর কল্পনার অনুপ্রবেশ ঘটান। শেষদিকে বৃষ্টি আবার ফিরে আসে—“অভিরাম / অবিরাম”—যা জীবনের পুনরাবৃত্তি, বেদনা ও আশার ধারাবাহিকতাকেই নির্দেশ করে।
সার্বিকভাবে, এই দুটি কবিতা ব্যক্তি ও সময়ের সম্পর্ক, দেহ ও প্রকৃতির সংলাপ, এবং হারিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার চক্রাকার অভিজ্ঞতাকে গভীর প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। কবিতাদ্বয় পাঠককে শুধু অনুভব নয়, ভাবতেও বাধ্য করে—এটাই এর প্রধান সার্থকতা।
=====================
গৌতম রায়
১১এ/১/১১ সেপকো টাউনশিপ,
দুর্গাপুর- ৭১৩২০৫
পশ্চিম বর্ধমান, পঃবঃ
0 মন্তব্যসমূহ