E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১১৯তম, দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

  E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১১৯তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com


গোপন কথা

নীলোৎপল জানা

-----------------------------------

এখন আর রাগা মাথা করি না সময় অসময়ে

একা একা পথ চলি, যার সঙ্গে বহুদিনের চেনা

তাকেও দেখলে তেমন আনন্দ পাই না আজ।

একদিন না চাইতেই অনেক কথা বলেছি বলে

আজ যে বলছি না তা ঠিক নয়।

তবে বলে কি হবে ?

যতবার মিথ্যা বলব না বলে সত্যকে আঁকড়ে ধরেছি

ততবারই আঘাত আর আঘাত পেয়েছি।

যাকে গোপনে আমার গোপন কথাটি বলেছি

সে বা তারা ততবারই আলগা করেছে তলোয়ারের মতো

হৃদয় খান খান হয়েছে অস্ত্র চিহ্নে, তবুও......

আবার ভুল করে বলেছি গোপন কথা।

এখনো বুঝে উঠতে পারিনি কে আপন আর কে পর,

আমার প্রিয়জনকে এ কথা সে কথা বলে বোঝাতে চেয়েছি

আমি নির্দোষ কিন্তু একটি ভয় মাঝে মাঝে হৃদয়ে চিনচিন করে

ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ হয় কখন....

সকালে সূর্যের কাছে নতুন শক্তি নিয়ে আবার পথ চলি

দু'মুঠো ভাতের সংগ্রহে, কোনো কথা না বলে!

__________

 কবিতায় দার্শনিক চেতনা

----------------------------------------------------------------------

  কবিতা “গোপন কথা” মূলত মানুষের অন্তর্গত সত্য, আস্থা এবং অস্তিত্বগত একাকিত্বের অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে। পাশ্চাত্য দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখলে এটি একদিকে অস্তিত্ববাদ, অন্যদিকে নৈতিক সংশয় ও মানব সম্পর্কের ভঙ্গুরতার কবিতামাত্র।

 

   এই কবিতার বক্তা প্রথমেই জানিয়ে দেন যে তিনি আর আগের মতো আবেগপ্রবণ নন। রাগা মাথা না করা, একা একা পথ চলা, বহুদিনের চেনা মানুষকেও দেখে আনন্দ না পাওয়া—এই লক্ষণগুলো আলবেয়ার কামুর “অ্যাবসার্ড মানুষ”-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। কামু বলেছিলেন, মানুষ যখন বুঝতে পারে পৃথিবী তার প্রত্যাশার জবাব দেয় না, তখন এক ধরনের নীরব বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। কবিতার বক্তাও সেই বিচ্ছিন্নতাকে স্বীকার করেছেন, কিন্তু পালিয়ে যাননি। তিনি পথ চলছেন, যদিও আনন্দহীন।

 

   “একদিন না চাইতেই অনেক কথা বলেছি বলে / আজ যে বলছি না তা ঠিক নয়”—এই অংশটি পাশ্চাত্য নৈতিক দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে। সত্য বলা কি সর্বদা নৈতিক কর্তব্য? ইমানুয়েল কান্ট সত্যকে সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু কবিতার বক্তার অভিজ্ঞতা কান্টীয় নীতিবাদের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে। যতবার তিনি সত্যকে আঁকড়ে ধরেছেন, ততবারই আঘাত পেয়েছেন। এখানে সত্য আর কল্যাণ একসঙ্গে চলে না। ফলে সত্যের নৈতিক মাহাত্ম্য প্রশ্নের মুখে পড়ে।

 

   গোপন কথা বলার অভিজ্ঞতা কবিতার কেন্দ্রীয় দার্শনিক সংকট। গোপন কথা মানে আত্মপ্রকাশ, আত্মসমর্পণ। পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদী দার্শনিক সার্ত্র বলেছিলেন, অন্যের দৃষ্টিতে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে, কিন্তু সেই দৃষ্টিই আবার মানুষকে আঘাত করে। কবিতায় গোপন কথা যাদের বলা হয়েছে, তারাই “তলোয়ারের মতো” হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে। এখানে সম্পর্ক আর বিশ্বাস অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তবু বক্তা আবার গোপন কথা বলেন। এটি মানুষের অনিবার্য দুর্বলতা, একই সঙ্গে তার মানবিকতা।

 

   “এখনো বুঝে উঠতে পারিনি কে আপন আর কে পর”—এই সংশয় পাশ্চাত্য স্কেপটিসিজমের স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ অন্যকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারে না। সম্পর্ক সর্বদা অনিশ্চিত। প্রিয়জনকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা আসলে এক ধরনের আত্মরক্ষার প্রয়াস, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। কারণ অস্তিত্ববাদে মানুষ শেষ পর্যন্ত একাই দায় বহন করে।

 

কবিতার শেষাংশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভয় আছে, কিন্তু তা স্থায়ী নয়। ঘুম আসে, আবার সকালে সূর্যের কাছে নতুন শক্তি নিয়ে পথ চলা শুরু হয়। এখানে নিহিত আছে নিটশের “অ্যাফার্মেশন অব লাইফ”—জীবন যন্ত্রণাময় হলেও তাকে অস্বীকার নয়, গ্রহণ করতে হয়। দু’মুঠো ভাতের সংগ্রহে নীরবে পথ চলা এক ধরনের অস্তিত্বগত নৈতিকতা। কথা না বলেও জীবন চলতে পারে, এই উপলব্ধি কবিতাকে গভীর দার্শনিক স্তরে নিয়ে যায়।

 

সব মিলিয়ে “গোপন কথা” পাশ্চাত্য দর্শনের আলোয় এক আধুনিক মানুষের আত্মসংঘর্ষের দলিল। এখানে সত্য, বিশ্বাস, ভয় ও জীবনযাপনের কঠিন বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আছে। কবিতাটি প্রশ্ন তোলে, কিন্তু উত্তর চাপিয়ে দেয় না—আর এই প্রশ্নবোধই একে দার্শনিক কবিতায় উন্নীত করে।

---------------------------------------------- 

মহিষাদল



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ