অন্যভাবনা, অন্যভাষা // E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২২তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

অন্যভাবনা, অন্যভাষা

E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২২তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com

-----------------------------------

অদীপ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

বুঝে নিতে হবে

শেষ রাতে নক্ষত্রের সিগন্যাল পেয়ে ভোর অন্ধকার ক্যানভাসে শ্বেতবর্ণ আগুন ধরালো

উষ্ণতার স্বাদ পেয়ে তরুণ কাকের দল ডেরা ছেড়ে উড়ে গেলো জাগানিয়া গানে

যে গানে লুকিয়ে ছিল ব্যস্ততার ছবি

ঘুমচোখে সেই ছবি দেখেই ট্রামের ঘণ্টা বাজলো মহাত্মা গান্ধী রোডে

যান-জটিলতা মাখা এ রাস্তার তুলনায় বাপুজীর রাস্তা ছিল সরলরৈখিক

দিনের প্রথম ঘণ্টা যতখানি রোমান্টিক জাতির নায়ক ঠিক তেমনটি নয়

নক্ষত্রের সিগন্যাল না পেলে তরুণ কাকেরা আজও আঁতুড়ে কাটাত রাত দিন

আসলে ঝুমুর নাচে নাচটাই কতটা প্রধান সেই প্রশ্ন উঠে এলে

এ লৌকিক নাচ লুপ্ত কথা হয়ে ঢুকে যেত ঘুমের গুহায়

একঘেয়ে ছায়াপথে হাঁটা দেখে নক্ষত্রেরা এরকমই সিগন্যাল দেয়

যা কিনা সন্ধ্যাভাষায় আগাগোড়া ঢাকা

 

শেষের শুরু

আকাশ জলের বুকে সারাক্ষণই নিজেকে ভাঙছে

অজস্র আলোকবর্ষ দূর থেকে আরেকটা আকাশ তা দেখে যাচ্ছে

এই দুই আকাশের ঠিক মাঝখান দিয়ে স্বপ্নে ভরা জাহাজগুলোর চলাচল

অচেনা আলোয় মাখা বন্দরের দিকে

ডুবোজাহাজের ঢঙে আমরাও নিজেদের লুকিয়ে লুকিয়ে সেই পথে

দিক হারানোর ভয়ে একেবারে চুপ হয়ে সেই পথ নজরে রেখেছি

আচমকা একদিন জাহাজটা শূন্য হয়ে যাবে

রোদ ঢেউ হয়ে ভেঙে দেবে বিছানায় শুয়ে থাকা অসংখ্য ঘুম

সমস্ত শূন্যতাগুলো কুড়োতে কুড়োতে তারা চলে যাবে পশ্চিমের পথে

তখন থেকেই শুরু আমাদের মহানিদ্রাকাল

 

আলোকিত ঘুমঘর ৬

চাঁদ থেকে মাটিবুকে ঝরে পড়ছে অজস্র চাঁদ

একটা আঘাত থেকে বেরিয়ে আসছে কোটি কোটি মারণাস্ত্র

বুদ্ধের প্রশান্ত মুখে ঘোর অমাবস্যা

অর্থাৎ নিশ্চিত হচ্ছে যুদ্ধ

এক এক করে সব আলোময় উপাদান ঢুকে যাচ্ছে কৃষ্ণবর্ণ অনন্ত গহ্বরে

হলুদ কুসুমকথা ফ্যাকাসে সবুজ স্বপ্ন হয়ে মাঠে পড়ে একা

মোড়ে মোড়ে খুব জোর রক্ত-অস্ত্র-অর্থদান শিবিরের হৈ চৈ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সঞ্চয় প্রকল্প

জনতন্ত্রে গণহিত সহজেই চোখে পড়ে মুগ্ধ করে --- তাই তার নানামুখী গতি

ঘটনাটা আসলে যে যুদ্ধ গণবুদ্ধি আঁচ করতে পারেনি

আর এ সুযোগ পেয়ে মুরুব্বিরা ছেড়ে দিয়েছে অশ্বমেধের ঘোড়া

গোবেচারা পাব্লিকের ঠিক মাঝখান দিয়ে ঘোড়াটা ছুটছে

ক্রাচে ভর দিয়ে ঢেউ কোনোক্রমে তীরভূমি ছুঁয়ে ফিরে যাচ্ছে নিজভূমে

আকাশে যে মেঘ উঠেছিল তার ছায়া পেয়ে অনেকেই রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছে

অথচ পেছনে কারা ধারালো অস্ত্রের ঘুম পাড়াতে চাইছে তাদের চোখেই পড়ছে না

ওরা এভাবেই থাকে প্রাচীন চক্রান্ত হয়ে দৈনিক ছায়ায়

এক থেকে ভেঙে ভেঙে দশদিকে দশমহাবিদ্যা

 

উদ্বাস্তু

বুকপকেটে অজস্র ছায়ামূর্তি নিয়ে ওরা বর্ডার পেরোচ্ছে

শুকনো কাগজগুলো এত শক্তিধর আগে জানাই ছিল না

আজন্ম অচেনা দেশ তবু সেখানেই যেতে হবে

হ্যাঁচকা টানের চোটে শিকড়ই ছেঁড়েনি    ছিঁড়েছে হৃদয়

সুদে ও আসলে ঠিক এর দাম বুঝে নেবে কালপুরুষেরা

এপারে দুধের শিশু     ওপারে চোখের জলে ঝাপসা মায়ের চোখ

মাঝখানে অভিমানী হাওয়ার বিষণ্ণ গাঢ় চলাচলে ঝড়ের ইশারা

হয়তো একটু পরে এপারের ঝড় যাবে

বর্ডার পেরিয়ে  ভিসা-টিসা ছাড়াই ওপারে

তবু শিশু অথবা তার মা......

 

আমাদের নেগেটিভ

ভাঙা-চোরা রূপকথা জোড়াতালি দিয়ে ঘোরে দশদিকে

পুব থেকে পশ্চিমের দেশে যেতে গিয়ে সেই রূপকথাগুলো ক্রমশ কর্পূর

এরই মধ্যে দক্ষিণের হাওয়া উত্তরের সঙ্গে যুদ্ধে নামে

যদিও এসব যুদ্ধ চিরকালই অসম্পূর্ণ থাকে

সেইসব ফাঁক দিয়ে সশস্ত্র জঙ্গিরা ঢুকে পড়ে শান্তিনিকেতনে

অজস্র সতর্কবার্তা ফেসবুকে ভিড় করে আসে

কেউ লেখে কেউ পড়ে কেউ কেউ অন্যকে শোনায়

তারপর সব ভুলে যে যার ডেরায় ফিরে বিছানায় ঢোকে

বালিশের তুলোগুলো মেঘ হয়ে আষাঢ় নামায়

প্রতিদিন এ জাতীয় অসংখ্য ভূমিকায় একই মঞ্চে অভিনয় চলে

আয়নায় যাকে দেখে সে-ও যেন নাটকেরই লোক

প্রতিবিম্বে ঘুষি মেরে নিজের আসল মূর্তি খোঁজে

ফলত অঙ্কের শেষে দেখা যায় নিজেরই রক্ত মাখা হাতে

ছিন্নভিন্ন রকমারি রঙের পোশাক

--------------0------------------------------

১টি কবিতার আলোচন….‘উদ্বাস্তু’

    অধ্যাপক ,কবি অদীপ ঘোষের ‘উদ্বাস্তু’ কবিতাটি এক গভীর ঐতিহাসিক ও মানবিক ট্র্যাজেডির অন্তর্লিখন। এখানে উদ্বাস্তু কেবল ভূগোল বদলানো মানুষ নয়; সে স্মৃতি, শিকড় ও পরিচয়ের ছিন্নভিন্ন সত্তা। “বুকপকেটে অজস্র ছায়ামূর্তি” — এই চিত্রকল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্মৃতির সেই অদৃশ্য ভার, যা বহন করে মানুষ সীমান্ত পেরোয়। “শুকনো কাগজগুলো এত শক্তিধর আগে জানাই ছিল না”— এখানে রাষ্ট্রের নথি, কাগজ, ভিসা, পরিচয়পত্র এক নির্মম নিয়তির প্রতীক। মানুষের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করছে কাগজ; অথচ হৃদয়ের ভাঙন অমাপযোগ্য।

    এই উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতার অনুরণন আমরা পাশ্চাত্য কবিতায় বহুবার শুনেছি। বিশেষত T. S. Eliot-এর ‘The Waste Land’-এ যেমন যুদ্ধোত্তর ইউরোপের ভাঙা সভ্যতার মধ্যে মানুষের শিকড়হীনতা ও অস্তিত্বসঙ্কট ফুটে ওঠে, তেমনি অদীপ ঘোষের কবিতায় শিকড় ছেঁড়ার বেদনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সভ্যতারও। Eliot লিখেছিলেন, “I will show you fear in a handful of dust”— ধূলিকণায় ভয়ের দর্শন; অদীপ ঘোষ দেখান “শুকনো কাগজে” নিয়তির প্রভুত্ব। দুই কবিতাতেই আধুনিকতার নির্মমতা মানবিক সত্তাকে আঘাত করে।

    আবার “হ্যাঁচকা টানের চোটে শিকড়ই ছেঁড়েনি, ছিঁড়েছে হৃদয়”— এই উচ্চারণে যে অন্তর্লীন আর্তি, তা স্মরণ করিয়ে দেয় W. H. Auden-এর ‘Refugee Blues’। সেখানে শরণার্থীদের বলা হয়— “We cannot go there now, my dear, we cannot go there now।” রাষ্ট্রের দরজা বন্ধ; মানুষ অচেনা ভূমিতে অচেনাই থেকে যায়। অদীপ ঘোষের কবিতায়ও “আজন্ম অচেনা দেশ তবু সেখানেই যেতে হবে”— এই বাধ্যতামূলক যাত্রা Auden-এর সেই অসহায়তারই বাংলা প্রতিধ্বনি। তবে ঘোষের ভাষা অধিক সংক্ষিপ্ত, অধিক চিত্রকল্পনির্ভর; যেন কয়েকটি রেখাতেই আঁকা এক বিশাল ট্র্যাজেডি।

    “এপারে দুধের শিশু, ওপারে চোখের জলে ঝাপসা মায়ের চোখ”— এই চিত্রকল্প মাতৃত্ব ও শিশুর বিচ্ছেদের সর্বজনীন বেদনাকে স্পর্শ করে। এখানে সীমান্ত কেবল রাজনৈতিক নয়, আবেগেরও। এই প্রসঙ্গে Pablo Neruda-র কবিতার মানবিক আবেদন মনে পড়ে, বিশেষত স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে লেখা কবিতাগুলিতে যেখানে মাতৃত্ব, রক্ত, ও দেশহারা মানুষের আর্তি একাকার। Neruda যেমন ব্যক্তিগত বেদনার ভিতর দিয়ে সমষ্টিগত ইতিহাসের সাক্ষ্য দেন, অদীপ ঘোষও তেমনি ব্যক্তিমানুষের দৃশ্যপটে জাতিগত বিপর্যয়ের কথা বলেন।

    কবিতার শেষাংশে “হয়তো একটু পরে এপারের ঝড় যাবে / বর্ডার পেরিয়ে ভিসা-টিসা ছাড়াই ওপারে”— এখানে প্রকৃতি রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে। ঝড়ের কোনও পাসপোর্ট নেই; প্রকৃতি নির্বিচারে দুই দেশেই প্রবাহিত। এই ধারণা আমাদের মনে করায় Seamus Heaney-এর কবিতাকে, যেখানে আয়ারল্যান্ডের বিভক্ত ভূগোলের মাঝেও মাটি, বাতাস, বৃষ্টির একাত্মতা মানুষের কৃত্রিম বিভাজনকে অতিক্রম করে। ঘোষের কবিতাতেও ঝড় যেন সীমান্ত-রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে।

    সব মিলিয়ে, ‘উদ্বাস্তু’ একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর আবেগঘন কবিতা। এর ভাষা মিতব্যয়ী, কিন্তু ইঙ্গিত ব্যাপক। পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদী ও যুদ্ধোত্তর কবিতার সঙ্গে এর অন্তঃসলিলা সম্পর্ক লক্ষণীয়— শিকড়হীনতা, রাষ্ট্রের নির্মমতা, মানবিক বেদনা ও প্রকৃতির নিরপেক্ষতা। অদীপ ঘোষ এখানে কেবল এক সময়ের উদ্বাস্তু-অভিজ্ঞতা লেখেননি; তিনি লিখেছেন মানুষের চিরন্তন নির্বাসনের কাহিনি, যেখানে হৃদয়ই শেষ আশ্রয়, আর সীমান্ত কেবল ক্ষণস্থায়ী আঁকিবুঁকি।

---------------------0---------------------0------------------------


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ