দুইপাতা পত্রিকা ১২৬তম সংখ্যা রথযাত্রা- ২০২৬

 

দুইপাতা  পত্রিকা 

১২৬তম সংখ্যা রথযাত্রা- ২০২৬

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা



মহিষাদলের কাঠের রথ ২২২ বছর

রথ মানে আলো

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

 

সিধু নামের ছেলেটা জানে রথ কাকে বলে

রথের মেলায় তার অনেকগুলো চরকি বিক্রি হয়।

ওরা বলে, ফিরফিরি, রঙিন কাগজের খেলনা

হাওয়ায় জোরে ঘোরে, বন্ধু গজু সঙ্গ ছাড়ে না।


দুটো দিন সে মায়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দেয়

আর দ্যাখে মায়ের মুখে অদ্ভুত খুশির আলপনা।


ওর বাবা ছোটোমায়ের সঙ্গে সেইবাড়ি হেঁটে যায়

দেখতে চায় না তবু দেখে ফ্যালে দুটো মানুষ, অকৃতজ্ঞ

আর দ্যাখে মাকে, চোখের কোণে আলোর বিষাদ।


দু-দিন ভিড়ে সে এ-গলি ও-গলিতে চরকি ঘোরায়, বেচে

দুটো দিন লুচি-আলুর দম, বোঁদে আর কাটাপোনার ঝোল


বোঝে রথ মানে আলো, অনেক রকম আলো।

 

স্মৃতির ভেলায় রথের মেলা

জয়শ্রী সরকার


রথযাত্রা নামটা শুনেই পৌঁছে তো যাই ছোট্টবেলায়

বাবার কাছে বায়না ধরি, যাও না নিয়ে রথের মেলায়।

সেই সে দিনের সুখগুলো সব লেপটে থাকে মনের মাঝে

চাইলেও কী ভুলতে পারি? প্রশ্ন করি সকাল-সাঁঝে!


ছুটি পেতাম একটি দিনের ঠিক দুপুরে পৌঁছে যেতাম                                  

জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা মনের সুখে হামলে খেতাম।

নাগোরদোলায় আমার সাথে চড়তে হতো বাবাকেও

নাছোড়বান্দা আমি নাকি, ছাড়ছি না তো ধমকালেও!


বায়না করার আগেই বাবা কিনে দিত পালকি-পুতুল

সাজবো বলে সঙ্গে দিত গলার হার আর কানের দুল।

বাবার হাতটা ধরে ধরেই আহ্লাদেতে কাটতো বেলা

মনের সুখে মজা লোটা --- এই না হলে রথের মেলা!


হঠাৎ দেখি মেঘের ঘটা --- বৃষ্টি নামে মুষলধারে

জল-কাদা আর ভীড়ের ঠেলায় দাঁড়াই গিয়ে শেডের ধারে।

ভাবতে গেলেই মন ছুটে যায় সেই সে দিনের রথের মেলায়

হাতড়ে বেড়াই আজকে শুধুই মধুর স্মৃতির এই অবেলায়!

 


রথযাত্রা

শিখা মল্লিক

রথযাত্রায় দু'পয়সার তেলেভাজা আর নেই !

ছোটবেলা মনে পড়ে !

ছোটবেলা লুকিয়ে রেখেছে মনে

কুড়োনো বাতাসা......…

লালফিতে নীলফিতে খেলনা গাড়ি 

মাঝে মাঝে মেলে ধরি

মিশে যাই রামধনু রঙে।


 রথযাত্রা ও জগন্নাথদেব  

পুষ্প সাঁতরা


        'রথযাত্রা লোকারণ্য মহাধূমধাম

     ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম

               রথ ভাবে আমি দেব

                 পথ ভাবে আমি

     মূর্তি ভাবে আমি দেব হাসে অন্তর্যামী।

এই রথ এবং অন্তর্যামী কে? শাস্ত্রে বলা বলা

হয়েছে-'রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে'।প্রাচীন যুগ থেকে রথ ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে 

আছে।স্কন্দপুরাণ,কঠোউপনিষদ,হরিবংশ সবেতেই

রথের উল্লেখ আছে।মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ রথের সারথি,অর্জুন ধনুর্ধর যোদ্ধা।বৈদিক

যুগেও রাজামহারাজরা ভ্রমন বা শুভকাজে রথেই চড়ে যেতেন।নতুন নতুন যানবাহন

আবিষ্কারের ফলে রথের ব্যবহার উঠে গেছে

একমাত্র রথযাত্রার দিন শ্রীশ্রী জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রাও সুদর্শন কে নিয়ে মহাসমারোহে রথ টানা হয়।ধর্মের অঙ্গীভূত

হয়ে বিশেষ মাত্রা পেয়ে থাকে রথ।রথযাত্রায়

সর্ববর্ণের ,সবধর্মের মানুষ একত্রিত হয়ে রথ

টানে।উপনিষদেও উল্লেখ আছে,- তাঁর হাত নেই তবু সমস্ত ই গ্রহন করেন  ধারন করেন,পা নেই তবু তিনি 

দূরগামী,সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সর্বদ্রষ্টা ,কান নেই, তবু সব কিছু শোনেন,সমস্ত জানেন, আমরা ষড়

রিপুতে আচ্ছন্ন বলে তাঁকে ঠুঁটো বলে দেখি।

কিন্ত রিপুকে বশীভূত করেন তিনি 'কৃষ্ণস্তু

ভগবান স্বয়ং'।কঠোউপনিষদে এ দেহকে

রথ বলা হয়েছে,মন হল লাগাম তাই এই বাস্তব জগতে মনের লাগাম টেনে রাখতে হয়

জগন্নাথের রথ হচ্ছে আদর্শ মানব সমাজ।

যার চারটি চাকার অর্থ ঐক্য, স্বাধীনতা,জ্ঞান,ও শক্তি।জগন্নাথ হচ্ছেন ব্রহ্ম স্থিতিশক্তি ,সুভদ্রা ব্রহ্মের লীলাময়ী শক্তি 

বা ক্রিয়াশীল শক্তি আর বলরাম জীব

জগৎ,এই তিনের সমন্বয়ে চলেছে জগন্নাথের রথ বা বিশ্ব চরাচর।

কৃষ্ণ প্রেমে পাগল চৈতন্য দেব পুরীতে এসেছেন শুধু জগন্নাথ দেবকে দর্শন করবেন প্রেম রসে সিক্ত হয়ে নৃত্য 

করছেন।

এ দৃশ্য দেখে অগনিত ভক্ত আবেগে ভাসলেন।ভগবান জগন্নাথ ভোজন রসিক।

ছাপান্ন ভোগ পরিবেশন করা হয় প্রতিদিন।

ইনি সাজতেও খুব ভাল বাসেন।ঋতু এবং তিথি অনুযায়ী বিভিন্ন বেশ হয়,বৈশাখে হয়

চন্দন বেশ স্নান যাত্রার পর গনেশ বেশ।শ্রীজগন্নাথদেবের বেশকারের দায়িত্বে আছেন শৃঙ্গারী সেবকরা। তিনি যে 

লীলাময়

রথারূঢ় প্রভু জগন্নাথ কে দর্শন এবং রজ্জু টেনে বলুন'প্রভু কলুষ নাশ করো!


টুপুই

অমিত কাশ‍্যপ


পাঁপড় ভাজার গন্ধে টুপুইয়ের মন

সে আকাশ দেখছে আর হাত নাড়াচ্ছে

মেঘ সরিয়ে সরিয়ে বিকেল খুঁজছে

সন্ধে নামলেই, জয় জগন্নাথ


আজ রথযাত্রা

চৌধুরী বাড়ির রথ বেরবে মোহনপুরে

সাজ সাজ, মেলা বসেছে গ্রামের শেষ মাথায়

কি না আসবে, আনন্দহাট খুলে থাকবে রোজ


রথযাত্রা আর পাঁপড় ভাজা, কেমন যেন বন্ধুত্ব

গুটি গুটি সন্ধ্যা নামছে শহর ছুঁই ছুঁই মোহনপুরে

ধূপধুনো আর ফুল লতাপাতা, আলোর সাজে

জয় জগন্নাথ স্বামীজীর জয়


কেন প্রিয় রথের মেলা?

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

 রথের মেলা অত্যাশ্চর্য এক মিলনমেলা। যা আমাদেরকে একসূত্রে গ্রথিত হবার সুযোগ করে দেয়, অনাবিল এক আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে দেবার মাহেন্দ্রক্ষণ রচনা করে, মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করার শক্তি যোগায়। দেবতা হয়েও জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রা আজ আমাদের কাছে এত আপনার তা ওই রথের মেলার জন্যই। প্রশ্ন জাগতে পারেই এই রথযাত্রা বা রথের মেলা আমাদের কাছে কেন এত প্রিয়? আসলে ‘রথ’ হল এক চালিকাশক্তি। মানবজীবনের অন্যতম ধর্ম হল চলমানতা। সেই চলমানতার শাশ্বত রূপটি আমরা খুঁজে পাই রথের মেলার মধ্যে। সে পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রাই হোক, কিংবা আমাদের মাহেশের রথের মেলাই হোক। ‘চলনে আস্থা রাখো’ এটাই রথের মেলার মূলকথা।

 

রথযাত্রা

গৌতম রায়


সারা ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে চলে তার সন্ধান।

রথতো জ্যোতিষ্কের বিভা,

তাকে করি খনন, রশি ধরে টানি রথ।

হে গতিশীল জ্যোতি,

দৃশ্যমান করে তোলো পৃথিবী, পৃথিবান্তর।

শিক্ষানবিশী আমি

আমাকে বোঝাই এ মহাবিশ্বে আমার অবস্থান।

তুলে নিই তীর, তুলে নিই রজ্জু

একা নই, আমার পাশে এক পৃথিবী মানুষ।

টানি শঙ্খচূড়, টানি বাসুকী,

টানি স্বর্ণচূড়।

চিন্ময়ে গড়ায় চাকা,

চিরকাল এ যাত্রা অনন্তের।

চিরকাল চলে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে তার সন্ধান।


চাকা

শ্রীমহাদেব


রথের চাকা গড়িয়ে চলেছে

সেই অনন্ত কাল ধরে—

কাঠের চাকার শব্দে মিশে আছে

সভ্যতার কান্না, প্রার্থনা আর পরাজয়।


ঈশ্বর চলেছেন সঙ্গে মানুষ,

উন্মাদের মতো জনস্রোত

বয়ে চলেছে বৃষ্টির মহোৎসবে;

কেউ মুক্তি চায়, কেউ অলৌকিকতা,

কেউ শুধু নিজের পাপ ধুয়ে ফেলতে চায়

এক টুকরো পবিত্র দড়ি ছুঁয়ে।


এই আনন্দ, এই উল্লাস,

জীবনের নানান লেনদেন,

জটিল প্রবাহ, সব ধুয়ে মুছে যায়—

শুধু থেকে যায় কিছু অনুচ্চারিত ক্ষুধা,

কিছু অদেখা আর্তনাদ।


রথের চাকার পাশেই

এক ন্যাংটো অভুক্ত শিশু

দুই হাত তুলে খাবার চায়।

তার চোখে কোনো ধর্ম নেই,

কোনো মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নেই—

আছে শুধু এক মুঠো ভাতের মহাকাব্য।


দেখছে না কেউ—

না উল্লসিত মানুষ,

না রথের চূড়ায় বসা দেবতা!


জয় জগন্নাথ

ইলোরা বিশ্বাস


আমার ছিলো ফিকে সে রঙ ওপর আকাশ নীল

সেই ছায়াতে হতাম আমি নীলাম্বরীর বিল

সূর্য যখন অস্ত যেতো লাল নীল রঙ মেখে

আমি হতাম রক্ত নদী দুধার এঁকেবেঁকে

আবার যখন জ্যোৎস্না রাতে আকাশ ভরা আলো

তারারা সব জাল ফেলে যে আমায় জরালো

খালবিল আর মহাসমুদ্রের উথাল পাতাল জল

কে আর কাকে বেঁধে রাখে উদ্দাম উচ্ছল

ঢেউয়ের মাথায় পানসি তরী নাচল মাতাল পারা

ছেড়ে আসা ছলাৎ ধ্বণি হালকে ভালোবাসা

নুড়িরা সব এধার ওধার ছুটোছুটি করে

শ্যাওলা মেখে চুপিসারে অস্তরাগ ধরে

বলে হারিয়ে যা গিয়েছিলো আবার খুঁজে পাই

আলিঙ্গনে মিশে এবার মোহনায় আটকাই

এমনই এক যাত্রা মাঝি রথের মতো চলে

এক নৌকায় তিন সারথি জয় জগন্নাথ বলে।


আমি আছি

কৃপাণ মৈত্র


ঘর উঠোন বারান্দা সদর দরজা সব

পরিষ্কার করে রাখা ছিল

বাগানকে পোষ মানিয়ে সব ঋতুর ফুল

সাজিয়ে রাখার নির্দেশ ছিল

অনুগত বাধ্যতায় সদলবলে ঘাস জমেছিল

পায়ে চলা রাস্তায়

জমানো ফুলের গন্ধমদির দখিনা বাতাসের

অপেক্ষা, কখন আসবেন তিনি!

দিন যায় রাত্রি অবসান প্রতিক্ষার।

ভোরের পাখির স্বর ধার করে

                    কে যেন বলে গেল

আমি আছি তোমাদের যত্ন সজ্জায়।


বিশেষণের শেষে  

শ্যামল রক্ষিত


 বিশেষ্যের সংজ্ঞা নেই, বিশেষণেরও না

বহুত্বের চুড়িদার পরে একরৈখিক যাযাবর

মহাভারতের পৃষ্ঠায় পা রাখে—

ভাঙনের সূত্র জানতে


 অভ্যাসগুলো ভুল হয়,

খোলস বদলে সুড়সুড়ির সকাল

কামরাঙা চোর খোঁজে আইনের ফাঁকি,

ফিশফিশানি সংসদ ভেঙে

শহীদ মিনারের তলায় জড়ো করে কাব্যিক সম্ভাষণ


 দেশটাকে বদলাতে হবে—

এই অজুহাতে মহাজনি যুদ্ধ

সোজাসাপটারা মগজে আয়না বসিয়ে

সভ্যতার মাপ পালটে দেয়


 তাঁবেদারিতে এত ধ্বংসস্তূপ ভাবনা—

সম্রাটের সিন্দুকে মৌলবাদীরা ফোঁসফোঁস করে।

 

বিশ্বছন্দে রথযাত্রা

প্রাণজি বসাক 

ধূপ চন্দন ফুলেল সুগন্ধি কাঠের রথে হে বিশ্বনাথ

হে ঈশ্বর দড়ি টানা বিশাল চাকার ঘূর্ণনে রথযাত্রা

অপার মহিমায় উত্তাল ভক্তবৃন্দ ভক্তির অশ্রুসিক্ত

মানুষে মানুষে মহামিলনের পথে একাকার কীর্তনে

জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে গায় সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গান


আকাশে বর্ষার ঘন মেঘের আনাগোনা যেন ঝরবে

বাতাসে ওড়ে স্বাধীন পতাকা প্রতীক উৎসব মুখরে

জয় জগন্নাথ কীর্তন সুরে মাতাল ভক্তরা টানে দড়ি

এমন বিশ্বজনীন উৎসব যেন জীবনের অনন্ত যাত্রা

ঈশ্বর ও মানুষের মিলনে ওঠে বিশ্বছন্দের চেতনাবোধ


 নয়নপথগামী

মহুয়া ব্যানার্জী


বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ নিয়ে তোমার আগমন-

প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দারুব্রহ্ম হয়ে

চির প্রকাশিত সত্য সুন্দর।

তোমার চলার পথে করুণার ধূলিকণা

আনন্দের খোঁজ দেয়।

নব নব কলেবরে নিত্য লীলাখেলা,

তোমার আঁখি পদ্মে জগতের দায়ভার

দেশজুড়ে ঘৃণা দেখতে দেখতে

আমরা তো চক্ষুষ্মান অন্ধ!

তবুও তোমার কাছেই ভালোবাসা শিখি,

তোমার কাছেই নতজানু বার বার!

 

প্রগতির প্রতীক

ননীগোপাল জানা

 

সম্মুখে অজ্ঞাত বন্ধুর পথ

দর্শনে সুদর্শনের রথ

থমকে দাঁড়ায় না প্রগতি

গতির সূচক শরীর -শকট


সামিল হবো রথযাত্রায়

আত্মা আরোহী।

সারথি- মন বুদ্ধি ও বিবেক

খোঁজে পরিপূর্ণতার কর্মযোগ

না থামা জিতেন্দ্রিয়।


অমোঘ রজ্জুতে বাঁধা প্রেম প্রীতি ভালবাসা

জীবন এগিয়ে যাবে পরমাত্মায়।

পথে রথদেখা আম কাঁঠাল

হাজার পশরায় ভক্তের আনন্দ

মুগ্ধ জগন্নাথ!


জগন্নাথের যাত্রাপথে

অঞ্জনা চক্রবর্তী


জগন্নাথ আজ মন্দির হতে

পথে চলে আসে রথে

রথি মহারথী, ভিখারী মেথর

এক হলো সেই গতে।


রসি ধরে টানে, জনগণ জোরে

কাদায় আষাঢ় মাস,

হেসে কয় নাথ, সাথে বলরাম

শরীরতো -রথে বাস।


নরদেহে যেমন দুশোছয় হাড়

রথের কাঠে তাই

ষোলো চাকায় চলে এ যান

জ্যানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রীয়, ষড়রিপুতেও ঠাঁই।


ঈশ্বরের ইচ্ছায় রথ চালিত

যেমন চলে কায়া

কদিন চলে জগৎ মায়ায়

তারপরে সব মৃত-ছায়া।

 

রথের মেলা রথকে ঘিরে

পাঁপড় ভাজা জিলিপি

খোকা খুকুর ভারি আনন্দ

যেমন জগন্নাথ, বলরাম শুভদ্রা লেখা লিপি।

 

সেপিয়া রঙের রথের মেলা

দেবাশিস ঘোষ

    দেখতে দেখতে সেই রথ কতদূর চলে গেছে! ছেচল্লিশটা বছরের তলায় পড়ে আছে সেই রথের দিকে ছুটে যাওয়া আমাদের পথ। আমার হাইস্কুল শুরু। রথ তো অনেক পথ। ছোট ছোট আমাদের পা। ছোট পকেট। আরও ছোট অ্যালুমিনিয়ামের কয়েকটা পয়সা। ঐ তো সম্বল। পাঁচ জোড়া খালি পা। তিন কিমি পথ। তখন অনেক দূর ঐ পাঁচ খুদের কাছে। পাঁচ জোড়া পা চলেছে বড়বাজারের মাঠে রথের মেলায়। কিছু দিন পরেই ঝুলন। পুতুল কিনতে হবে। মাটির পুতুল, চাঁচের পুতুল। তখনও প্লাস্টিক পুতুল আসে নি। কত কথা পথ চলতে চলতে! তবুও পথ ফুরোতে চায় না। ভাঙাচোরা ইট বেরিয়ে থাকা, রাস্তায় হোঁচট। পা কেটে যায়। তবুও পরোয়া নেই। মেলা ডাকছে তাদের। চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট হেঁটে শেষে মেলার মাঠে পৌঁছনো। পৌঁছেই কত পুতুল! কোনও দোকানে শুধু মাটির পুতুল। কোথাও বা চাঁচের পুতুল। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণীর পুতুল। কী ভীষণ জীবন্ত ঝুড়ি মাথায় চাষী, লাঙল হাতে কৃষক, টিকটিকির মুখে ধরা পড়া আড়শোলা, টোপর ও চূড়া পরা বর বৌ। সাদা দাড়িভর্তি বুড়োদাদুর গলায় স্প্রিং। নাড়িয়ে দিলেই দাদু ঘাড় দোলাতেই থাকত। চাঁচের পুতুলগুলো সাদা চ্যাপ্টা। সারস, সৈনিক, ফুটবল খেলোয়াড় এইসব। যত বৈচিত্র্য তত ভাল। ঝুলনের জন্য শহর, গ্রামের মডেল বানানো হবে। আগ্রহ নিয়ে খেলনা দেখি আর পকেটের পয়সা গুনি আমরা। সাধ অনেক সাধ্য নগন্য। এর মধ্যে দোকানী ধরে ফেলে একজন একটা খেলনা সরিয়েছে। দোকানী তার থেকে খেলনাটা নিয়ে জায়গামতো রেখে সতর্ক নজর দেয়। তারক এর মধ্যে একটা পাতায় করে আলুকাবলী কিনে এনেছে। সবাইকে একটু করে দিচ্ছে। হঠাৎ ঝেঁপে বৃষ্টি এল। আর থামে না। দোকানের সামনে লেজুড়ের মতো বাড়ানো তাঁবু। তাতেই আমাদের আশ্রয়।এর মধ্যে কেনা হয়েছে দু'চারটে পুতুল। বাকিটা এর ওর থেকে ধার করে চালাতে হবে ঝুলন। পুতুল কিনে মন টগবগ।ঘন্টাখানেক পরে বৃষ্টি থামল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। শিগগির বাড়ী চল। চল চল। পাঁচজোড়া পা জল কাদা মেখে যখন ঘরে ফেরে তখন সাতটার কাছাকাছি। চারপাশ অন্ধকার। তখন তো এত আলো ছিল না!


রথের দড়িতে সময়ের স্পন্দন

শংকরপ্রসাদ গুড়িয়া

   আষাঢ় এলেই মহিষাদলের বাতাসে এক অদ্ভুত প্রত্যাশার গন্ধ ভেসে ওঠে। রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে ঘিরে শতবর্ষের স্মৃতি যেন নতুন করে প্রাণ পায়। মহিষাদলের রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানুষের সম্মিলিত আবেগের এক চলমান ইতিহাস।

    রথের চাকা ঘুরতে শুরু করলে মনে হয়, সময়ও যেন নিজের অতীতকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। কাঠের বিশাল রথ, শঙ্খধ্বনি, কীর্তনের সুর, উলুধ্বনি আর মানুষের ঢল—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনির্বচনীয় সাংস্কৃতিক মহাকাব্য। রথের দড়িতে অসংখ্য হাত একসঙ্গে টান দেয়; সেখানে পরিচয়ের ভেদরেখা মুছে যায়, থেকে যায় শুধু মানুষের মিলনের ভাষা।

    আজকের ডিজিটাল যুগে, যখন মানুষ ক্রমশ পর্দার আড়ালে বন্দি হয়ে পড়ছে, তখন মহিষাদলের রথযাত্রা আমাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়। এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতার প্রকৃত শক্তি প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সহযাত্রায়।

    রথ তাই কেবল দেবতার গমন নয়; এটি মানুষের অন্তরযাত্রা। অহংকার থেকে বিনয়, বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্প্রীতি, স্বার্থ থেকে সমবেদনার পথে এগিয়ে যাওয়ার এক নীরব আহ্বান। প্রতি বছর রথ ফিরে আসে, আর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য কখনও অতীত নয়; সে বর্তমানের মধ্যেই ভবিষ্যতের বীজ বুনে চলে।

বকুল কিশোরী

ত্রিদিব রায়

 

আষাঢ় এলেই মনে পড়ে তোমার কথা

ঝড় বৃষ্টি, বিজলি বাতি হীন রথের মেলায়

সন্ধ্যা নেমেছে, ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টিতে

ভিজেই যাচ্ছো তুমি, হাতে বকুল ফুলের মালা

বয়স কত আর হবে, হয়তো সতেরো।

তোমার কপালে গালে বৃষ্টির ফোঁটা

ডুরে শাড়িটা ভিজে লেপ্টে গেছে গায়ে,

মেলায় আসা কেউই তোমার মালা কেনেনি।

দুঃখী মেয়ে তুমি, তোমার ঘরে বড়ই অভাব

আলো আঁধারি ভোরে কোঁচড় ভরে

বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথেছিলে

বড় আশা নিয়ে। এখন বৃষ্টির আড়ালে

তুমি কেঁদেই চলেছ। তোমার বূকের ভেতর

উথলে ওঠা অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে চরাচর।

 

দিনানাথের সংসার

কবিতা সামন্ত


আষাঢ়ে মেঘ জমছে,বৃষ্টি তেমন একটা নেই বললেই চলে।চাষীরা চৈতির চাতকের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন গুনছে। যতই দিন যায় পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন থেকে সমস্ত কিছুই কেমন যেন বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। দিনা দশেক আগেই পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়েছে একথা কারোর অজানা নেই। স্নান যাত্রা করে প্রভু এখন ধুম জ্বরে পড়ে আছেন। সেবায়িতরা প্রভুর জ্বর সারিয়ে তুলতে পথ‍্য তৈরিতে ব‍্যতিব‍্যস্ত। প্রভুর জ্বর সেরে উঠলে রাজ পোশাক পরিহিত হয়ে ভাই বোনকে সঙ্গে নিয়ে প্রভু ভক্তদের দর্শন দিতে যাত্রায় বেরোবেন রথে চড়ে।


এদিকে দিনানাথের সংসারটা জগন্নাথ ভরসায় চলে। গত একমাস ধরে ভীষণ গরমে দিনানাথের ব‍্যমো হয়েছে সারবার নাম নেই। সংসারটা অচল প্রায়।গায়ের রথতলায় জগন্নাথ মন্দিরের পাশে তার ফুলুরি,চপ,বেগুনী,পাঁপড় ভাজার দোকানটায় ধুলো জমেছে। অনেকেই যারা দিনানাথের দোকানের বাঁধা খরিদ্দার খোঁজ করে সহানুভূতি দেখাচ্ছে ঠিকই কিন্তু কেউই একটিবারও তার সংসারের দিকে তাকায়নি। এই বাজারে আপন জনেরাই যেখানে খোঁজ নেয়না সেখানে বাইরের লোকেরা আর কিইবা খোঁজ নেবে!দু দুটো কচি শিশু অনেকদিন থেকেই আলু সেদ্ধ ভাত খেয়ে রয়েছে। দিনানাথের স্ত্রী দু একবার দোকান দিয়েছিল কিন্তু তেমন বেচাকেনা করতেতো পারেইনি বরং জমা থেকে আরও খরচ হয়ে গেছে। সবাই বলে দিনানাথের হাতে জাদু আছে। ওর দোকানের তেলেভাজা খেলে নাকি আর কোথাও পোষায় না।

দিনানাথের স্ত্রী রোজ হত‍্যে দিয়ে পড়ে রয়েছে রথতলার জগন্নাথ মন্দিরের বন্ধ দরজার সামনে।রথের আগে যদি দিনানাথকে প্রভু সুস্থ না করে দেয় তবে এই রথতলাতে জীবনে আর কোনদিন সে পা রাখবেনা।

রথের সময় ওই আটদিনে এতো বেচাকেনা যে মাস তিনেকের উপার্জন হয়ে যায় দিনানাথের।

যে দিনানাথ এতদিন নিষ্ঠার সঙ্গে প্রত‍্যেকদিন দোকানের সবথেকে প্রথম তেলেভাজাটা জগন্নাথ দেবকে প্রসাদ রূপে নিবেদন করে তবেই খদ্দেরকে দিত আজ সেই দিনানাথের এই অবস্থায় প্রভু এমনি করে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন!


রথতলাতে রথের মেলা

দীনেশ সরকার

 

প্রতি বছর রথতলাতে বসে রথের মেলা

আষাঢ়ের এই মেলায় বসে হরেক রকম খেলা।

রথের দিনে মেলা শুরু উল্টোরথে শেষ

মেলায় গেলে মন ভরে যায় খুশি-মজা বেশ।

 

রথের দিনে রথের রশি সবাই মিলে টানে

আকাশ-বাতাস মুখরিত ‘জয় জগন্নাথ’ গানে।

মন্ডামিঠাই জিলিপি আর গরম পাঁপড় ভাজা

ভারী মজায় খায় সকলে নোনতা খাস্তা খাঁজা।

 

ম্যাজিক শো আর পুতুলনাচও দেখায় রথের মেলায়

খোকা-খুকুর মন ভরে যায় মজার মজার খেলায়।

কেউ বা কেনে রঙিন চুড়ি কেউ বা পাতার বাঁশি

আম-পেয়ারা লেবুর কলম বেচে গাঁয়ের চাষি।

 

ভাগ্যিস হাত নেই

বীথিকা পড়ুয়া মহাপাত্র


জগন্নাথকে সাক্ষী রেখে চলছে হরির লুঠ,

আশীর্বাদ পেতে যে যাঁর শিশুকে তুলে ধরছে

রথের উপর জগন্নাথের চরনতলে।

হাঁকছে পুরোহিত দশ,বিশ,পঞ্চাশ টাকা বলে।

 

টাকার রেটে ভাগ হচ্ছে ভগবানের আশীর্বাদ!

কম টাকা তো ফুল, বেলপাতা

বেশী টাকায় রথের ওঠার সৌভাগ্য!

অনেকটা ট্রেনের স্লিপার ক্লাস ও

ফাস্ট ক্লাস এ.সি কামরার মতো!

 

ভক্তের ভক্তি দেখছে জগন্নাথ,

হাসছেন,ভাগ্যিস হাত নেই,

নাহলে দুটো থাপ্পড় কষিয়ে দিতেন ঈশ্বর!

 

রথযাত্রা

গোবিন্দ মোদক


আষাঢ় মাস এসে গেলেই বর্ষার মরশুম

সেই সঙ্গে পবিত্র সে “রথযাত্রা”র ধুম!

জগন্নাথ আর বলরাম রথে আসীন হন

মাঝখানে সুভদ্রা বোন — পুলকিত মন!

রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বসে যে যায় মেলা

পুতুলনাচ, নাগরদোলা আরও কত খেলা।

মাটির পুতুল, খেলনা নানা, হরেক রকম মাল,

কাচের গ্লাসে সরবতটা হলদে সবুজ লাল।

জিলিপি আর পাঁপড়ভাজার গন্ধে আকুল মেলা

জমে ওঠে দুপুর শেষে ঠিক যে বিকেলবেলা।

মেলার মজা ছলকে ওঠে ফুচকা আইসক্রিমে

এগ-তরকা রুমালি-রুটি মাংস কিংবা ডিমে।

খাওয়া-দাওয়া, কেনা-কাটা, মিলনমেলা রথ

ভক্ত-জন আর মেলার ভিড়ে জনাকীর্ণ পথ!

হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামে নাকাল যে হয় মেলা,

হাঁকডাক আর ছুটোছুটি; ফুটিয়ে যে যায় বেলা॥


যখন ঈশ্বরেরও রূপান্তর

বিকাশ চন্দ

 

চোখের তারায় তারায় পাক খায় বিশ্বের কুণ্ডলী

চাকার দাগে আঁকা জীবনের পথ

নীল জলের স্তম্ভ দেখে দারু দেহে ঈশ্বর

যে দেহে প্রেমের উৎসব সে হারায়  জলের কলরবে

দু'দিন মাত্র পথের দেবতা দেখে ধুলোর শরীর

বাকি সব দিন মর্মর মন্দিরে বৈদিক দেহে বারোমাস

 

কে জানে হে পরমানন্দ কোথা থেকে আসে

ফিরেও বা যায় কোথায় কেবল সমুদ্র নীল ডাকে

প্রতিদিনই সেই এক দেহে নতুন আঙ্গিক

তবুও একশ' আট ঘড়া জলে চাই স্নান সে কী আত্মদীক্ষার

 

কেউ দেখেনি ঈশ্বরের রূপান্তর হেঁটে যাওয়া পথে

লবণ সমুদ্র দেখেনি দেবতাদের প্রাত্যহিক ভ্রমণ

শুক্লপক্ষের আষাঢ় দ্বিতীয় জানে

জগন্নাথ বলভদ্র সুভদ্রা খোঁজে মাটির ঘরের মাসী

পতিত জন জানে পথের দেবতা খোঁজে পথের সাথী


রথ

প্রশান্তশেখর ভৌমিক

 

রথ এবং রথযাত্রা ঠিক কবে শুরু হয়েছে

কেউ কি জানেজানে না, তবুও

রথের রশিতে টান দিতে ভিড় করে

কানা, খোঁড়া, ল্যাংড়া, আরও অনেকে।

সবাই মানে তার ইচ্ছা পূর্ণ হবেই।

কারও হয়, কারও হয় না।

তা বোধ হয় জগন্নাথও জানেন না।

তবুও তেমন কোনো কারণ ছাড়াই

রথের চাকা গড়িয়ে চলে...

আবহমান কাল....

 

পুণ্যতার বর্ষণ

মোঃ আব্দুল রহমান

 

রথের শাশ্বত চাকা পোড়া মাটি স্পর্শ

করতেই যেন পুণ্যতার বর্ষণ ও প্লাবন

হাজারো ভিড়ে প্রার্থনার প্রতিধ্বনিতে

সেজে ওঠে সভ্যতার কোলাহল---

 

শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে

এগিয়ে চলে মানবতার মিলনের মহৎ উৎসব

রঙহীন রশিতে সাজানো বিচিত্র বুদ্ধিমত্তা

একটু ছুঁতে পারলে স্বর্গীয় অনুভূতি

মন ও শরীর মিলনে গঙ্গাস্নান!


এ যেন রথ নয়

বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি মানবের জাগতিক

পবিত্রতা! চিরন্তন শান্তির বিশ্রামাগার!


সত্যের পথে এগিয়ে চলে মানবতার অভেদ্য ধ্বজা

যার রশি ছুঁতেই ঐশ্বরিক পুণ্যতার বর্ষণ!


অন্তর্যামী

মালা ঘোষ মিত্র

 

সারাদিন অপেক্ষার পর

বিকেলে বেরিয়ে পড়ি রথের মেলায়

আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ঘটা,

মেলা বসেছে বড়ো রাস্তায়

রথ আসছে, বিশাল ভিড়,

ছেলের হাত ধরে,রথের রশি টানি-----

দিতে হবে প্রণামী,পূণ্য হবে অন্তর্যামী।

রথ মানেই জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা

মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, আরো কত কি

ছোট তুতুল বায়না করে নাগরদোলায় চড়ত

সে এখন একাই ঘোরে----

পুরোনো দিনেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে

বৃষ্টির হয়ে ঝরে পড়ছে।

জয় জগন্নাথ সকলের মঙ্গল করো

মনের সকল দুঃখ, গ্লানি

পিষ্ট হোক রথের চাকায়।


রথযাত্রা মহাযাত্রা

সুব্রত মাইতি


আধুনিক যুগের সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না যাত্রী যান টি -যার নাম রথ। এর স্টিয়ারিং নেই, ব্রেক নেই, নিজস্ব ইঞ্জিন বলতেদুটো রঙ চটা কাঠের ঘোড়া। আমাদের এখানের রথে যাঁরা আরোহন করেন তাঁদের কোন জন পিতল বা পাথরে নির্মিত। এছাড়া আছেন শালগ্রাম শিলা। আর এই রথের আদি যাত্রী যাঁরা তাঁরা তিন ভাই বোন কাঠে নির্মিত, তাও আবার হস্তপদহীন।

এখানের রথ কে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য আছে চারটা বিশাল রশিএই টানের ক্ষেত্রেও আবার সমস্যা আছে। ডানদিকের রশিগুলিতে বেশি টান পড়লে রথ গড়গড়িয়ে বাম দিকে চলে যাবে। আবার উল্টোটা হবে বামদিকের রশিগুলিতে বেশি টান পড়লে। রথের উপর দাঁড়ানো উদ্বিগ্ন সারথি মাইকে চিৎকার করে বিষয়টা সামাল দেন। আচ্ছা, রথটা কি আরো বহুদিন টিকে থাকবে, নাকি কালের নিয়মে হারিয়ে যাবে? যাঁদের ভক্তি আছে সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা তো রথ টানার জন্য আসতে পারবেন না। আর যাদের পাপ- পূণ্য ইত্যাদি দিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই সেই যুবক-যুবতীদের রথ টানার বিষয়ে কতকাল উৎসাহ থাকবে? রথযাত্রার দিন সকালে এইসব ভাবছিল অতনু। সে সিদ্ধান্ত করলো রথ নিয়ে একটা এ, আই রিল বানাবে। রথটা হারিয়ে গেলেও মোবাইলে এর দড়িতে হাত ছুঁইয়ে পুন্যার্থীরা স্বস্তি পাবেন। কিন্তু এটা করতে হলে তো প্রকৃত রথযাত্রার ভিডিও চিত্র নিতে হবে।

চারিদিকে প্যাচপ্যাচে কাদা, আম কাঁঠাল, জিলিপি সিঙ্গাড়ারগন্ধ। বৃষ্টিহীন মেঘলা দিনের তীব্র গুমোট। অতনু অবাক হয়ে দেখল উৎসাহ হারানো তো দূরের কথা, বহু হাজার মানুষ এসে ইতিমধ্যেই ভরিয়ে ফেলেছে রথ সড়ক।

সারথির পটকা ফাটানোর সাথে সাথেই রথের রশিতে টান পড়ল। অতনু কখন যে ওই রশিতে হাত দিয়েছে তা সে নিজেও জানে না। প্রায় আড়াইশো বছর বয়সী রথ। তার পিতা, পিতামহ, প্র পিতামহ তাঁদের কালে হাত দিয়েছিলেন এই রশিতে। ভিডিও করার কথা ভুলে সর্বশক্তি দিয়ে টান দিল অতনু। গড় গড়িয়ে রথ এগিয়ে চলল মহাকালের পথে।

 

ছেলেবেলার রথ

সুরজিৎ গুছাইত


দুলকি চালে এগিয়ে চলে

জগন্নাথের রথ,

হাজার তারায় সেজে উঠেছে,

আজকে রাঙা পথ।

 

ছোট্ট বেলার রথের মেলা

পাঁপড় ভাজার গন্ধ,

জিলিপি আর মিষ্টি সুরে

পড়াশোনা সব বন্ধ।

 

দড়ি টানার নেশায় কেমন

ছুটত সবাই আগে,

পুণ্য লাভের আশায় মনে,

ভক্তি প্রেম জাগে।


আজও মনে উঁকি দেয়

সোনালী রথের চাকা,

স্মৃতির পাতায় রোদ্দুর হয়ে

আল্পনা সব আঁকা।


আশা

গোবিন্দ বারিক


যে বৃষ্টি দাও তুমি

তাইতো অসমাপ্ত সভ্যতা

খড়খড়ি খুলেছে কেউ, কেউ বা বিকেলের বাদল,

হরিনাম সংকীর্তন এ-বুকে উঠেছে ঢেউ

অশান্ত ভিড় ঢেলে এগিয়ে চলেছে রথ

এ-বিকেল প্রকৃতই দেবতার ঢল


যে আনন্দ দাও তুমি

নিঃসংশয়ে আত্মীয় কুটুম প্রীতি

আলপথ ধরেছে কেউ, কেউ বা অজগর ঢালাই

ঝিরঝির বৃষ্টি মেখে হেঁটে যায় স্বয়ং ঈশ্বর

হত্যালীলা বর্বরতা অশান্ত সময়

রথ যেন আলো রূপ রস চরাচর-হৃদয় ।


রথযাত্রা, আজকের ভেতরে ফিরে দেখা কাল…

অদিতি সেনগুপ্ত

 

রথযাত্রা শুধু ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট তারিখ নয়, এ হল আমার কাছে এক অন্য ধরনের ‘ফিলিং’… যেটা হঠাৎ করেই ফিরে আসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রথের ছবি ভেসে উঠলেই মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই দিনগুলো। পাড়ার ধুলো-মাখা রাস্তায় ছোট্ট ছোট্ট হাতে টানা রথ, আর তাতে সাজানো জগন্নাথ দেব, বলরাম আর সুভদ্রা। পাঁচটাকার গুজিয়া ভোগ। পাড়ার বড়রা খুচরো পয়সা ছুঁড়ে দিতেন সস্নেহে। সেইসব পয়সা জড় করে রথের মেলায় ঘোরার অদ্ভুত এক উত্তেজনা! এখন সেসব শুধুই হলুদ স্মৃতি!

এখন শহরে রথযাত্রা হয় মহা সমারোহে! দূর থেকে দেখি, ভিড়ের মধ্যে আর ঢোকা হয় না… তবুও দড়ি টানার দৃশ্যটা দেখলেই ভেতরে কিছু যেন নড়ে ওঠে। মনে হয়, মানুষ আজও তাহলে একজোটে কিছু টানতে পারে… বিশ্বাস, স্মৃতি, কিংবা শুধু কিছু মুহূর্তের আনন্দ। এই একসাথে থাকা, একসাথে রথের রশি টানার অনুভূতিটাই হয়তো রথযাত্রার আসল উপজীব্য।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে উৎসবগুলো বদলে যায়… কিছুটা বাস্তব, কিছুটা ডিজিটাল। তবু রথযাত্রা এলে একটা নরম আলো পড়ে মনের কোনে আর পুরোনো দিনের সেই নির্ভার আনন্দ আর আজকের সচেতন জীবনের মাঝে কোথাও একটা সেতু গড়ে ওঠে।

আমার কাছে রথযাত্রা মানে ফিরে পাওয়া… পুরোনো আমি, কিছু হারানো মুহূর্ত, আর একটু সহজ করে বাঁচার ইচ্ছে। হয়তো সেই কারণেই, প্রতি বছর রথের চাকা ঘোরার সাথে সাথে আমিও একটু ঘুরে যাই, আর চুপচাপ দেখে নিই নিজের অন্তরমহল…

 

রথসুড়ার স্মৃতিপট

খুকু ভূঞ্যা


আষাঢ় এলে টুকিপিসির কথা মনে পড়ে

বটপাতার ছায়ার নিচে বসে চুপচাপ আকাশ দেখত

কখনো পথিকের চলাচল

রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলেই থামিয়ে বলতো বউ দাঁড়া

তোকে ভালো করে একটু দেখি

তোকে দেখলে আমার সাত দিনের দাম্পত্য জীবন মনে পড়ে যায়

পিসিকে জড়িয়ে বসে পড়তাম

রথসুড়ায় তখন রথ সাজানোর হৈচৈ

পিসি সেদিকে তাকিয়ে বলতো রথ দেখতে আসিস

দড়িতে একটু টান দিয়ে যাস

জীবনে আরোগ্যের মতো শান্তি আর কিছুতে নেই

 

সকাল থেকে মাইক বাজছে রথসুড়ায়

রথ সাজানো হচ্ছে

বটতলার কুঁড়েটা নেই

সাদাথান পরা খইমুখ হাসিটি আর দেখতে পাইনা

রথের ত্রিদেব দেবী সেদিকেই তাকিয়ে ভাবছে

এ বছরেও মাসির বাড়ি যাওয়া হলোনা –

 

রথের মেলা ‌

রবীন বসু


আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে বৃষ্টি সারা বেলা

মানুষ তবু যাচ্ছে ছুটে আজকে রথের মেলা!

পুবের পাড়া থেকে রথ যাবে দক্ষিণ পাড়া

কাঁসর ঘণ্টা বেজে উঠতে পড়ে গেল সাড়া।

রথের রশি ধরে টানছে ভক্ত মানুষজন

কাদামাখা পথে চাকা গড়াচ্ছে বন-বন!

রথে বসে বলভদ্র সুভদ্রা ও দেব জগন্নাথ

জয়ধ্বনি উঠছে যেন আকাশে ভীম নাদ!

মেলা বসে পথের পাশে মেলা বসে মাঠে

জিনিসপত্র কেনে লোকে ঘুরে বেলা কাটে।

গাছের চারা বিক্রি হচ্ছে কাঁঠাল আম ও জাম

অনেক দূরে সাগর ধারে জগন্নাথের ধাম!

গরম গরম পাঁপর ভাজা খুকির হাতে দেখি

মুখ ভরা  যে মধুর হাসি নয়তো তাহা মেকি!

খোকার হাতে পাতার বাঁশি বাজে মিষ্টি সুরে

রথের দিনে রূপকথারা থাকে অচিনপুরে!

 

রথারূঢ় তুমি

কৃষ্ণাংশু মাকুড়

 

রথারূঢ় তুমি

তবে আমারই রজ্জুতে এ স্পর্শ কার

কাষ্ঠের চাকায় যে ধাতব শব্দ

তোমার শরীরে যে ছেনির আঘাত

স্বেদ বিন্দুতে এ কোন ছবি!

 

কত বর্ষ জুড়ে গড়িয়েছে রথ

বেজেছে সাম্যের গান?

লিখেছ সম্প্রীতির বেদভাষ্য?

 

পথই দেব  রথই  দেব

ঈশ্বরের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত

হতে জন্ম নেয় যাত্রা

যুগ যুগ ধরে গড়িয়ে দিয়েছে

সভ্যতার নব প্রস্ফুটিত রথ ।

 

শুভ রথযাত্রা

অরবিন্দ সরকার

 

রথযাত্রা  ঐক্যবদ্ধ মানুষের ঢল

গোধূলির মত বর্ণময় পোষাকে সকলে সজ্জিত

শ্রীজগন্নাথদেবের শুভ যাত্রা সুভদ্রা ও বলরামকে

সাথে নিয়ে

বৃষ্টিস্নাত দিন

রশিতে টান দলমত নির্বিশেষে

দেহ, মন ও আত্মার ত্রিবেনী সংগম

মালিন্য কলুষ মুক্ত হয়ে

অভিযান আত্মিক বৈভবে

পরিচিত অপরিচিতদের মহান মিলন মেলা

প্রিয় মাসীর বাড়ি গমন

শৌর্যে বীর্যে রশি ধরে এগিয়ে চলা

চৈতন্যের প্রকাশ।

ভালোবাসার মালা গেঁথে চলা

সংহতির সৌরভে ঐকতান ভূমি ধরে এগিয়ে চলা।

=========================

পাঠকদের কাছে বিনীত অনুরোধ পত্রিকাটি পড়া ও দেখার পর ভালো খাারাপ কমেন্ট করুন প্লিজ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ