কুহকের দেশে
শঙ্খশুভ্র পাত্র
যারা পালাতে চেয়েছিল দেদার দুঃখ,
দিগন্ত পেরিয়ে ঝিলিমিলি-আলো-বাসে...
অর্বাচীনের প্রাচীর ডিঙিয়ে ডিঙিকে আড়াল করে৷
দিঘি কি দেখেনি? ডুগি-তবলায় কারা যে রইল মেতে?
অনুসন্ধানে ঘনায় সন্ধে, সন্দেহ দানা বাঁধে৷
ছয় চরণের স্মরণিকাপ্রাণ পিলপিল অলিগলি...
শৃঙ্খলাবেশ...
কে চায় কেদার? এধার-ওধার শূন্য...
দিগন্তে ঢেউ মূর্ছনা আঁকে, দেদার দুঃখ তত ক্ষণে দেবদারু!
কেউ কি ফিরেছে? প্রাচীনেই যত দুরু দুরু বুক—
দারুব্রহ্মের শুরু৷ প্রেমের কবিতা তোমাকে
ডাকেনি...
রং লাগে হিল্লোলে...
বসন্তমন সন্ত জানে না, কুহকের দেশে অস্থির কুহু ভাসে...
তৈমুর খান
কত ফুল ঝরে গেল বনে
ঝরা ফুলের হাসি
কুড়োতে এসেছি
দুঃখ কত জমে আছে মনে
কোকিল ডেকেছে কত
ময়ূর নেচেছে কত
ঘাস ছিঁড়ে খেয়েছে হরিণে
পরিরা গেয়েছে গান
মৌমাছিদের মধু পান
সকাল এসেছে পাখির কলতানে
আজ শুধু ধুধু মাঠে
স্মৃতির জাবর কেটে
একাকী চেয়ে আছি বড়ো আনমনে !
সৌমিত বসু
তুমি যে শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে
তা কি তুমি বোঝো না বিমলা?
জেগে থাকলে নিখিলেশ যেটুকু সত্যি, ঘুমিয়ে পড়লে
সন্দীপ যে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমি সন্দীপ হয়ে জন্মালে তুমি কি রাজি আছো
বাড়িয়ে দিতে তোমার ঠোঁট।
পাখিভাষা ও স্থানমাহাত্ম্য
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
পাখিদের উপভোগ্য ভাষা অজান্তেই চিনি
বাঁকুড়ার কাকের কর্কশ কথায় অভ্যস্ত কেউ
গোসাবার কাকের মধুভাষে চমকাবেন তা
স্বতঃসিদ্ধ, স্থানের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক অকাট্য।
খিড়কিপুকুরের ডাহুকদের ঠুংরি আর দাদরা শুনে
যাঁর বাল্য কৈশোর আর যৌবন কেটেছে ষাট পেরিয়ে
ডুঁয়ার হোগলাবনে ডাহুকদের তেরেকেটে তাকতাক
তিনি কোনোভাবেই মেলাতে পারবেন না, স্থানমাহাত্ম্যে
তাও স্বতঃসিদ্ধ।
আগুন পাখি
বিধানেন্দু পুরকাইত
এত আগুন এত আগুন বৃষ্টি ধোওয়া জলে
এত আগুন লুকিয়ে ছিল ধ্রুপদী আঁচলে
বনের মধ্যে শাপ শ্বাপদের বিভেদ বিড়ম্বনা
আগুনপাখি একা নাকি দানাও খোঁটে না।
মুক্তকেশীর চোখে স্নাত কালের বৈশাখ
আমার পুকুর হাবুডুবু আগুনে হয় খাক
আগুন ঝরে অষ্টপ্রহর দোটানা সংগ্রাম
সেকি আমার আগুনপাখি - কী যেন তার নাম!
নাম জানা নেই অথচ সে আগুন ঝরায় রোজ
আনত মুখ মুখের চেয়ে মনে রাখে খোঁজ
সেই পাখিটা করুন কাতর একা অদ্যাবধি
আমি পুড়ি সে পোড়ে কি মগ্ন রঞ্জাবতী!
মায়ামহল
অমিত কাশ্যপ
দাঁড়াই, পাশে যারা ছিল তারা এগয়
অনেক এগিয়ে আর তারা তাকায় না
সম্পর্ক এমনই
আমার ভেতর এখন এক তন্ময়তা
ভাব সমাধি বলা যায়, ওই মায়ামহল
মায়া বলতে ঘর থেকে শুরু হয়ে বিশ্ব সংসার
বিকেল পড়ে আসছে, অদ্ভুত আলোর সমাবেশ
কনে দেখা, শিবেন জ্যেঠা বলতেন
আমার পায়ে শেকল, গায়ে মণিময় অহংকার
সরতে পারছি না, মায়া
আবাসন থেকে কেউ একজন বেরিয়ে
খুঁজছেন কিছু
স্বপ্ন
সুমন দিন্ডা
এইখানে থেমে যাক সময়,
রাস্তার ভিড়ে থমকে থাকুক প্রিয় মুখ,
দৃষ্টি মিলে যাক সমানে সমানে।
দিব্যজ্যোতি খুলে গিয়ে
আলতো হাসিতে রঙিন হোক চারপাশ,
পরীরা ভুল করে নেমে আসুক,
পুষ্পবৃষ্টি করুক দেবতারা,
দুটি পবিত্র আত্মা যখন মিলে যায়
স্বর্গ সেখানেই।
প্রশ্নহীন
প্রাণজি বসাক
এতো দূর থেকে আলোক আসে
এসেই ধ্বস্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে
অন্ধকারের মহল্লায়
দেখা হয় না - দূরে সরে যায় আঁধার
দেখা হলে কথা হত হালহকিকত জানা যেত
কোথায় সে রেখে যায় ছায়াটুকু প্রশ্ন করা যেত
সারাদিন পর আঁধার ছুটে আসে গোধূলির শেষে
দেখতে দেখতে আলোকও লুকিয়ে পড়ে বেলা শেষে
দেখা হলে প্রশ্ন রাখা যেত দিনভর উদ্বিগ্ন
থাকো কেন
দেখা না দেখার এমন খেলা জাগতিক জীবনে
প্রশ্নহীন
উৎপলেন্দু পাল
অনাগত বর্ষার পদধ্বনী শুনে
ডোবা খাল বিল খানাখন্দগুলোর
চারিদিকে অক্লান্ত ব্যাঙের ডাক
আমার আস্তিনের ভাঁজে এখন
এক বিরামহীন কর্ম তৎপরতা
লুকিয়ে রাখা সাপগুলো সব যেন
আস্তিন ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে চায়
যতোবার সামলে রাখি ওদের
ততোবার যেন হামলে পড়ে ওরা
যদিবা আটকে রাখি কদাচিৎ
হিসহিসিয়ে ফোঁস করে ওঠে ওরা
তীব্র আক্রোশে ছোবল দিতে চায়
এতকালের দেয়া দুধ কলা সবই
যেন একেবারেই খরচের খাতায় ।
অসংবদ্ধ
মহুয়া ব্যানার্জী
যতদূর দৃষ্টিপাত ততদূর সীমারেখা-
এদিকে সীমার মাঝে অসীম ধরা
দিতে চাইলেই সবকিছু এলোমেলো!
প্রেমের জন্য নতজানু হলে
সব ভুল একদিন ঠিক হয়ে যাবে
ভাবতে ভাবতেই প্রবল ঝড়ে
মাঝদরিয়ায় নৌকা টলমল…
ডুবতে ডুবতে শ্যাওলা জমে গায়ে।
ঘর ভাঙে, মন ভাঙে, সম্পর্ক…
বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ…
সীমারেখা মুছে যায় ধীরে
সমান্তরাল রেললাইন কুয়াশায় ক্রমশ অস্পষ্ট।
আর্তনাদ
অরূপ দত্ত।।
মাড়িয়ে চলে যেতে পারো,
না আমি কিছুই বলবো না।
জানি বিকেল পেরোলে
সকল ধর্ম সান্ধ্য প্রার্থনায় বসে।
ভালোবাসায় থেকো
আর সবাইকে ভালোবাসায় রেখো
শুধু এটুকুই প্রার্থনা সবার।
তবু চাইলে আমাকে মাড়িয়ে যেতে পারো কিছুই বলবো না,
একটি শুকনো পাতা মাড়িয়ো না কখনও
পায়ের তলায় তার করুণ আর্তনাদ শুনতে পাবে।
আর্তনাদ
সুমিতা মুখোপাধ্যায়
রাত নেমে আসে খোলা জানলায়
ভীড় করে আসে কিছু স্বপ্ন ক্লান্ত দুচোখ,
নয়নের আলো কুয়াশা ঘেরা পথ
শান্ত শীতল চারিদিক আর সঙ্গীহীন
বিবর্ণ কিছু ইচ্ছে প্রদীপের আগুনে
ছাই জমে আছে শেষ জীবনের আর্তনাদ
এ খেলাঘরের মহাত্মন
শব্দ আর নৈঃশব্দ্যের বিচরণ
হৃদয়তন্ত্রীতে মূর্ত হাহাকার
স্বপ্নসন্ধানী বীণার আঁধার
রোদনধ্বনিকে ডেকে বাণী দিই
অসুরের মাঝে খুঁজি সুর,
বাসহীন ভাষ্যহীন পরম আত্মায়
নিমগ্ন জিজ্ঞাসার অন্তঃপুর ।।
রেল লাইন
সুশান্ত সেন
দূর থেকে নিংড়ে খেজুর গাছের রস একটু চেখে নিয়ে
রেল লাইনের ধারে পৌঁছে গেলাম,
সেখানে শীতে কুঁকড়ে থাকা রেলের লাইন
দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে।
রেল কামরার ভেতর উত্তমকুমার
শর্মিলা ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে
নিলেন,
ইন্টারভিউ কুচি কুচি করে সামনের কাঁচের
গেলাসে,
কালো ফ্রেমের চশমা আবার পরে নিয়ে।
রেলের লাইন স্টেশন এ থামলো।
খেজুর রস একটু পরেই গেজে উঠবে
দুহাতে দুটো মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে
কর্মাটারের ওভার ব্রিজ এ উঠে এলাম।
এই আমি বেমানান
গৌতম ঘোষ-দস্তিদার
শহুরে সভ্য বিজলি আমায় দেখে একচিলতে
হেসেছিল—
আমি নাকি ওর মতো চমকাতেই শিখিনি;
কে জানে? তাই হবে হয়তো…
উলঙ্গ অবাধ্য গোটা একটা সমুদ্র আছড়ে এসে
পড়েছিল
আমার বেমানান শরীরের মুখোমুখি,
নোনতা জলের হঠাৎ আসা স্রোত আমায় গোগ্রাসে
গিলে নিল…
ওদের যুগলবন্দি পরিহাসে যোগ দিতেই
ধূমকেতুর উদয় হলো
চুলে চিরুনি না দেওয়া এক ঝোড়ো হাওয়ার ছেনালি
চুম্বন…
এদের সবার কাছেই আমি নত হয়ে ছিলাম,
মাথা নুইয়ে খুঁজেছিলাম আত্মিক উপশম;
অথচ, অনায়াসে ফেঁপেফুলে ওঠা
মেদসর্বস্ব এই বন্ধ্যা কলাগাছটার মতো;
সফল হওয়া হলো না আমার কোনোদিন!
জানালার পাশে
শান্তনু প্রধান
কখনও কেউ জানালার পাশে বাতাস হলে
নড়ে উঠি, থেমে যায় সমস্ত রক্তের তৎপরতা।
এ-ঘর ও-ঘর ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কিত চোখের
ছায়া।
কোথায় যে তাকে বসতে দেব—
উঠোন জুড়ে বেদনার গান, তবু সেই কৃষ্ণপক্ষের বাতাস
গ্রিল টপকে ঢুকে পড়ে নিঃশব্দ চেতনার ভেতর।
বাতাস কি জানে বৈকুণ্ঠের ভাষা?
স্বচ্ছ নদীর আড়ালে যদি কেউ
নিজের অন্তরাত্মা খুলে রাখে,
সেই স্পর্শ ঝরে পড়ে নিঃসঙ্গ আলোর মতো।
আমার এই আত্মউন্মোচন কি তবে নির্বাসিত
নির্লিপ্ত আকাশে পুঁতে রাখে চেতনের
প্রান্ত-অভিযান।
কখনও কেউ জানালার পাশে বাতাস হলে
সে যেন আমায় আরও নির্জন করে...
লুকোচুরি
শিখা মল্লিক
আজ লুকোচুরি চলছে মেঘ - সূর্যের
ভেতরেও লুকোচুরি দেহ ও মনের
যাব কী যাব না ছুটে সে প্রিয় আড্ডায় ।
না হয় ভেজাবে খুব ভিজব না হয়
একটা সঠিক বার্তা দিলেই তো হয়
দোটানায় রাখে কেন দুশ্চিন্তা বাড়ায় ।
না হয় থাকব ঘরে জানালার ধারে
দূর থেকে মনোলোভা সুগন্ধের জেরে
উড়ব খানিক মেঘে মনের ডানায় ।
এমন কেন যে তাঁর কলকাঠি নাড়া
উড়ু - উড়ু মানুষকে একঘরে করা
অমোঘ বিধান যেন পিছু পিছু ধায় ।
শেষ থেকে
আভা সরকার মণ্ডল
শেষ থেকে শুরু হওয়া গল্পটি
অর্থহীন ছিল না ---
গতানুগতিক পথ থেকে সরে গিয়ে
চলনগীতের সুর পালটে ছিল হাওয়া!
প্রখর তাপে ছায়ার অনুভব দিতে
উপযাচক হয়ে এসেছিল সুশীতল তিরস্কার
শুধু নিজেকে ক্ষমা করতে না পারার আফসোসে
ভিজে গেছে যাবতীয় উপঢৌকন ।
অগোছালো সন্ধ্যা
রুমকী দত্ত
মেঘের রঙে বোশেখ বিকেল কালো
গনগনে রোদ পুড়িয়েছে দিনটাকে
সন্ধ্যাটা নয় হয়ে যাক অগোছালো
পড়ছে মনে? ভালোবেসেছিলে যাকে?
যার কথা ভেবে স্বপ্ন দেখো রোজ
রাঙিয়েছিল হয়তো নতুন ভোরে
সে কি রেখেছে? হাসনুহানার খোঁজ?
কদম ফুটেছে শ্রাবনে বা ভাদ্দরে?
আষাঢ়ের দিনে হেঁটে ছিলে বৃষ্টিতে?
হাতে হাত ছুঁয়ে কানে কানে কথা বলা
হেমন্ত বা পৌষের ভেজা শীতে
সোনা রোদ মেখে বসেছো ছাতিম তলায়?
একলা দুপুর পিচগলা রাজপথ
সানগ্লাস চোখে মরীচিকা যেন কোনো
আবেগের ঘুড়ি ক্লান্তির মতো শ্লথ
স্বপ্ন দেখো না, হৃদয়ের কথা শোনো।
শুনতে শুনতে ছুটির ঘন্টা বাজে
ঘুম ভেঙ্গে যায় বাস্তব মুখোমুখি
থাক সে আপন ব্যস্ত নিজের কাজে
বলে দিও তাকে "তুমি আজ বড় সুখী"।
আপন-পর
নীলেশ নন্দী
ধূসর স্মৃতিরা ভিড় করে আসে মনে,
বুক ঠেলে উঠে আসে গভীর দীর্ঘশ্বাস,
স্তব্ধ পরিবেশে দহন হয় একাকিত্বের,
জীবনে কত আপনজন দূরত্বের সৃষ্টি করেছে,
আজকাল কী কেউ কারও খোঁজ নেয়?
তবু তুমি ঝলমলে রোদ্দুর হয়ে এসেছিলে,
নিভৃতে মনে ফুটিয়ে গিয়েছ ভালোবাসার কুসুম,
এখন তোমায় খুঁজি সন্ধের উজ্জ্বল শুকতারার
গায়ে;
তুমি শিখিয়ে গিয়েছ জীবন স্রোতের মতো,
যেখানে আপন মানুষ দূরে সরে যায়, দূরের মানুষ হয় আপন।
একটা প্রশ্ন একটা অপেক্ষা কবি
শংকর সামন্ত
একটা প্রশ্ন একটা অপেক্ষা, জেগে থাকে হৃদয়ে মনে,
কেউ প্রকাশ করে কেউ প্রকাশ করে না।
প্রশ্ন ঝুলে থাকে ধানের শীষে, বটের ঝুরিতে,
চাঁদের গায়ে,কখনও পথের বাঁকে বাঁকে,
একটা নস্টালজিয়া ঘিরে ফেলে-প্রশ্নের শেষ কি
কোনদিন হবে?
প্রহর শেষ হয় সময় এগিয়ে চলে,
অশান্ত মনের দূষণ গিলে ফেলে আস্ত সব কোলাজ
সে নদীর হোক বা ঝর্ণারই হোক স্রোতের বিপরীতে
কখনোই না।
সমুদ্রের ঢেউ বলে দেয় আমি বেঁচে আছি-
ক্ষণিকের হৃদ স্পন্দন বেঁচে থাকার আশ্বাস
দেয়,
হার মানতে হয় পৃথিবীর ঘূর্ণনের কাছে।
তা বলে কি হামাগুড়ি দিয়ে সূর্যকে পদক্ষিণ
করার চেষ্টা
কোনদিন ছুঁতে পারবে না!
এমন যদি হতো - -তবে?
জয়দেব মাইতি
চলো ফিরে যাই সেই অতীতের দিনে।
যেখানে এখনো আলো হয়ে পড়ে আছে, আমাদের শৈশব, কৈশোর আর জীবনের আধবেলা।
ধূলোখেলা আর খেলাধূলার মাঝে সেই খুশির সকাল,
মন খারাপের বিকেল আর আধো ঘুমে ঠাকুমার
গল্প, টেনে নিয়ে চলে বারবার।
অনিকেত, তুমিও কি আজ আমার মত ফিরে যাও সেই দিনে?
এখনো কি আমাদের নিয়ে, বন্ধুদের খুনসুটি উপভোগ করো?
শুনতে কি পাও বাতাসের কোণে সেই অসম্পূর্ণ
স্পর্শ কথা?
অনিকেত, সেদিনে ফিরতে আজ আমার ভীষণ মন চায়।
ইচ্ছে করে, আমাদের নিয়ে কথা হোক সর্বত্র।
কৃষ্ণচূড়া রাঙিয়ে দিক পরন্ত বিকেলে...
আত্মস্থ
সুব্রত মাইতি
আলোর পৃথিবী দেখার পর
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া ধৃষ্টতা
ঘুমের ভেতর অজস্র স্বপ্ন
কখনও মাটিতে এসে বসবে না।
আমি চলাফেরা করছি চিবুক চিপে চিপে
তবুও ভাঙছে খন্ড খন্ড চিন্তার স্তুপ।
অজস্র প্রশ্ন অস্পৃশ্য ছায়ার ভেতর কাতর
অনেক প্রিয়মুখ পতনের জন্য আহুতি উন্মুখ
যেখানে গাছেরা ছায়া শীতল বুকে মাথা তুলে
আমরা শুধু উপদেশ দিচ্ছি
আর আত্মস্থ করছি বারবার
আসুন এবার এক একজন শব্দহীন যাত্রী হই।
ভালোলাগার সাঁকো
প্রভাত ভট্টাচার্য
এপারে কিছু ভালোলাগা
ওপারেও বেশ কিছু
এপারে নানা রঙের কোলাজ
ওপারেও রামধনুর ঝিলিক
দুপারের ভালোলাগা চায়
মিলেমিশে এক হয়ে যেতে
কিন্ত মাঝখানে যে
ব্যবধান বিরাজমান
তাই দুপারের ভালোলাগা
বিস্তৃত হয় ধীরে ধীরে
আর মাঝখানে জুড়ে গিয়ে
গড়ে ওঠে এক অভিনব
ভালোলাগার সাঁকো।
যেতে চাওনি
শংকরপ্রসাদ গুড়িয়া
কমল, তুমি যেতে চাওনি।
হাসপাতালের সাদা বিছানায় তখনও পড়ে ছিল
কয়েকটি অসমাপ্ত দিন,
স্ত্রীর মুখ, কন্যার ভবিষ্যৎ, আর বেঁচে থাকার একগুঁয়ে ইচ্ছে।
ক্যান্সার ধীরে ধীরে তোমার শরীর নয়,
তোমার আগামীকাল খেয়ে নিচ্ছিল।
শেষবার যারা তোমার কাছে গিয়েছিল, তাদের বলেছিলে— "ওদের একটু দেখো।"
তারপর একদিন তুমি চলে গেলে।
আজও ভাবি— মানুষ কেন চলে যায়, যখন তার সবচেয়ে বেশি থাকার প্রয়োজন হয়?
এক কাপ
মেরী খাতুন
সকালে এক কাপ অনিচ্ছার চা
এক কাপ স্নান
এক কাপ অনিচ্ছার অন্নপিন্ড
চলো হে শরীর
তোমাকে ঠেলে ঠেলে দিয়ে আসি
এক কাপ উত্তপ্ত চেয়ারে
তারপর?
তারপর আমি কী করব?
এক কাপ সবুজ---কোথাও নেই
এক কাপ গান---কোথাও নেই
এক কাপ গাছতলা খুঁজতে খুঁজতে
আবার এলার্ম যাবে বেজে
ওঠো হে শরীর
তপ্ত চেয়ার ছেড়ে
ফিরতে হবে চার কাপ উনুনের ধারে
অগ্নি ছাড়া কে আর তোমার প্রতীক্ষায় ...
প্রেম শূন্য হয়নি ধরা
মনীষা কর বাগচী
মানুষের মন বড়ই চঞ্চল
মরীচিকার পিছে ছোটে বিরামহীন
যেখানে কষ্ট, যেখানে বেদনা
সেদিকেই ছুটছে লাগামহীন।
ছোট ছোট আশা বড় বড়
ব্যথা দিয়ে চলে যায়,
দেখছি তো আপন হবার ভান করে
মানুষ কেমন মানুষকে কাঁদায়।
অপমান অবহেলা সহ্য করা ভালো মানুষের ভাগ্যে
যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে...
নিরাদর সয়ে সয়ে, ঘা খেয়ে খেয়ে
মানুষ কেমন বেঁচে থাকে মৃত্যুর ফাঁকে ফাঁকে।
তবু মানুষ ভোলেনা ভালোবাসা
ভোলেনা বিশ্বাস করা,
তাইতো এখনো মরেনি কোমল হৃদয়
এখনো প্রেম শূন্য হয়নি ধরা।।
পরিচয়
প্রশান্তশেখর ভৌমিক
তুমি কি তবে আরও একটি মুখোশ পরবে ?
বিষের সাগরে পনের বছর ডুবিয়ে রেখেও,
তুমি আমাকে কখনোই বুঝতে দিলে না... যে
তোমার আসলে কোনো মুখই নেই।
এতটা নিচে নেমে যাওয়া—রঙের প্রলেপে
মাখামাখি!
ধন্য হোক তোমার এমন শিক্ষা-দীক্ষা
ত্রিবার ধন্য হোক, সেই জঘন্য নিষ্ঠুরতা...
তোমার পারিবারিক শিক্ষায় চিরতরে অমর হয়ে,
তুমি বেঁচে আছো—কেবলই এক নীরব ঘাতক রূপে।
তবে এই-ই হলো তোমার প্রকৃত পরিচয়...!
গর্ব কোরোনা
অণিমা গুছাইত।
যে মেয়েটি নিজে ৫ টাকা খরচ করার পরিবর্তে
সংসারে চারজনের মধ্যে ভাগ করে
তারপর নিজের জন্য খরচ করে
তাকে আর যাই বলো
আনস্মার্ট বলোনা
কারণ সে সংসার সম্বন্ধে একটু বেশিই জানে।
তুমি পাঁচ টাকা নিজের জন্যই খরচ করো
তুমি কোনোদিনও জানবে না ত্যাগ শব্দটির মানে।
ঝুলে থাকা কথাগুলো
বিকাশ চন্দ
অন্তরঙ্গ সময় বয়ে আনছে অন্য জলবায়ু
নিয়ন্ত্রণের খবর বইছে বল্গাহীন ঘোড়া
ছড়িয়ে ছিটিয়ে বদলে যাচ্ছে জল মাটি ফল ফুল
বৃক্ষের দায় নেই রঙের নিয়ন্ত্রণ বোঝে
বসন্তকাল
কে যেন মাটি ছুঁয়ে দেখেছিল আত্মার স্বরূপ
পাখিরা এখনো সংসার বাঁধে গাছের শাখায়
সকল ঋতুতে হেসে খেলে ভুলে যায় মৃত্যুর বাধা
দুর্ভাগা রাতের আর্তচিৎকার ভাসে মায়ের রক্ত
শিরায়
সকল বিচ্ছিন্ন উচ্চারণে ভাসে জন্মের
ক্ষতচিহ্ন
ছুঁয়ে ছিল পরম্পরা বইছে আতঙ্কের ভারি রাত
এখন বশ্যতা হীন কারা চলে অনিন্দ্য উৎসবে
বুকের ঝুলে থাকা কথাগুলো আশ্চর্য উড়ালপথে
কখন গানের ছন্দে নেমে আসবে মানুষের উপহারে
আঁধার
অনিন্দিতা সেন
রোদ্দুর থাকেনা জীবনে
আবছা আঁধার যখন তখন,
কিনারায় এসেও ফিরে যায় তরী
খাতা
সৌগত কান্ডার
দিস্তা কাগজে বাঁধাই করা পুরোনো খাতাটা,
সেদিন খুঁজে পেলাম মরচে ধরা ট্রাঙ্কে।
খাতাটায় কোনো কবিতা নেই।
পাতার ভাঁজে হলদেটে কোনো প্রেমপত্রও নেই,
যেমনটা গল্প-উপন্যাসে পড়া যায়।
নেই কোনো ব্যর্থ প্রেমের কষাটে গদ্য
বা নিষিদ্ধ চোরকাঁটার অকপটতা।
খাতাটা আসলে অঙ্কের। অনার্স ক্লাসের।
পাতার পর পাতায় অঙ্কশায়িনী অঙ্ক।
এত দিন পরেও যেন তাদের ভিতর থেকে
ফুটে বেরুচ্ছে ঊষাকালীন ব্রহ্মতেজ।
নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতে গেলাম প্রাচীন
পৃথিবীর।
ঠিক তখনই অঙ্কগুলো হয়ে উঠল বসরাই গোলাপ !
কে কাকে ডাকছে
সুব্রত মাইতি (মহিষাদল)
কে কাকে ডাকছে -
বোবা বাতাস ইরেজার দিয়ে
মুছে দিচ্ছে সেই সব শব্দের ভ্রুন।
আমার গভীরে গড়ে উঠছে দ্রোণপুষ্প।
দুঃখিনি বাতাস সেই গন্ধময় রেনু
আঁচলে কুড়িয়ে চলে যাচ্ছে অচেনা ঠিকানায়।
রাস্তাগুলো আজকাল গৃহস্থের দুয়ার স্পর্শ করছে না।
বিধাতার মতো অলৌকিক উড়ালে
চলে যাচ্ছে দিক চিহ্নহীন মরুভূমিতে।
জলের নেশা করতে করতে ক্লান্ত সমুদ্র
আপাতত কপাল খুঁড়ে
আশ্রয় চাইছে ভূমির কাছে।
কে কাকে ডাকছে -
এক অন্তর্লিন মৃত জীবন রক্তমাংসের গভীরে
কুলকুণ্ডলীনী হয়ে বসে থাকে।
ঘ্রাণ
মালা ঘোষ মিত্র
গোধূলির কনে দেখা আলোয়,
বাকি থেকে যায় কিছু কথা-----
আহ্লাদে জ্বর জ্বর লাগে,
দাউ দাউ আগুন জ্বালিয়ে দাও,
মনোযোগ দিয়ে দেখি,
বিষুবরেখা পাশ দিয়ে ফিরে গেছি।
জটিল নামতাগুলো অসমাপ্ত গল্পের মতো
ঘুরে ফিরে তোমাকেই দেখি-----
ভেতরে ভিজতে থাকি-----
কলেজস্ট্রিটে বইপাড়ায় ঢুকেই
ছুঁয়ে দিই তোমার এলোচুল,
কস্তুরী ঘ্রাণ মেখে নেমে আসে মেঘ
ভিজিয়ে দেয় সমস্ত শরীর,
বুকের মধ্যে-----
প্রজাপতি ডানা মেলে।
বিষাদের স্বাদ
পান্নালাল জানা
ক্লান্ত হৃদয়ে একাকী হেঁটে চলছি, অক্লান্ত অবসরের চাহিদায়।
যাতে না বারবার মুখোমুখি হতে হয় অমীমাংসিত
প্রশ্নের সম্মুখে।
দ্বন্দ্বের বিদ্রূপ সইতে হাতিয়ার বানিয়েছি
নির্জীব প্রাণ, নির্লোভ ঘ্রাণ।
প্রত্যাশার কোনো শেষ নেই, অতৃপ্ত কামনা, বাসনা,
চরিতার্থ করার চেষ্টায় এই আমৃত্যু নাট্য
রচনা।
অবিশ্রান্ত নদীর ন্যায় বয়ে যাচ্ছি কেবল
শেষ নিশ্বাসের আলাপে।
সয়ে যাচ্ছি নীরবে, কেবল আয়ু ফুরিয়ে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায়।
তবুও অভিনয়ে লড়ছি, বাস্তবের নীচে চাপা পরার ভয়ে।
নেপথ্যে নিজ অবুঝ মন মোহ, মায়ায় নিজেকে কারারুদ্ধ রাখতে চায়।
হৃদয় বিদীর্ণ করা কথার অভিমানে দুচোখ ভরা
নির্জন রাত,
বলে বেদনার বিষাদেই স্মৃতি হাতরে চাঁদের
দিকেই তাকিয়ে থাক!
বুঝবে না, কেউই বুঝবে না তোমার পরাজয়ের স্বাদ ও পরিজনদের
বিবাদ।
তাই অকাতরে, স্বেচ্ছায় ধীরে ধীরে ডুব দিলাম বিষাদের স্বাদে।
তার হাতের পুতুল
নীলোৎপল জানা
আমরা সকলে পুতুল, তার হাতে
নিজে থেকে কিছু করার সাহস নেই
তিনি যখন যা করান সেভাবেই নিজেকে গুছিয়ে নিই সকলের কাছ থেকে।
কখনো কখনো সমাজকে মানতে হয়
যে সমাজের স্তন চুষে প্রতিটি কোষ জীবিত হয়ে ওঠে ,
যে সমাজের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়....
তবুও তার হাতের পুতুল হয়ে থাকি অজান্তে।
কখন কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে মারাণ-ব্যাধি নিজেও টের পাই না---
বাঁচতে ইচ্ছে করে আমার নিজের লোক গুলোর জন্য,
বাঁচতে ইচ্ছে করে যারা আমার দিকে আগ্রহে তাকিয়ে থাকে!
সব ইচ্ছেই পূর্ণ হয় না কারণ
সবকিছুই অলক্ষ্যে তারে বাঁধা পুতুলের মত ঝুলে আছে
আসলে সমাজে যার থাকাটা সবচেয়ে জরুরী ছিল
সেই সরে পড়ে সবার অলক্ষ্যে সকলকে ফেলে......
==========================
সকল
কবিকে শুভেচ্ছা জানাই। অনেকর কবিতা বাদ দিতে
হয়েছে নিয়ম না মেনে পাঠানোর কারণে। ধন্যবাদ।

0 মন্তব্যসমূহ