দুইপাতা পত্রিকা ২৭তম সংখ্যা ।। প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 


এখন শুধরে 

শিখা মল্লিক 

 

অনেক সময় নষ্ট হয়েছে যেন 

গরম গরম করেই চুপটি থাকা

এখন বর্ষা ধরো হাতে সেই হাল 

নৌকা চলুক দেখে দেখে আঁকাবাঁকা

 

অজুহাত বেশি কাজ না করার ছল 

দেখে যাই শুধু ঘুমিয়ে কাটায় বেলা

সময় পালায় চৌকাঠ দিয়ে দ্রুত 

হয় না পাওয়া আসন্ন কালবেলা

 

আমিও এমন করেছি অনেক ভুল 

এখন শুধরে যথেষ্ট অনুকূলে

পাচ্ছি দেদার সুরভিত সব ফুল 

পালিয়ে গিয়েছে যন্ত্রণা জঙ্গলে

 

শুধু একবার তোমার মুখ

রবীন বসু 


একদিন তোমাদের বাড়ির উঁচু পাঁচিলে

উঠতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিলুম মাটিতে। 

একদিন তোমাকে ‘ভালবাসি’ জানিয়ে 

চিঠি দেব বলে স্কুলপথে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলুম

তুমি সেদিন স্কুলেই এলে না—

তোমাকে একপলক দেখার জন্য কত অপেক্ষা,

কত সময় ব্যয় করে এখন আমি বহুদূর—

জীবনের মাঝপথে এসে কর্পোরেট হাউসের 

কাঁচঘেরা ঘর বসে আকাশ দেখি—

যদি মেঘের মধ্যে তোমার মুখের আদল ভাসে!

এখন আমার চারপাশে অনেক মেয়ে 

বাড়িতে আমার স্ত্রী, সন্তান আছে—

তবু ঘাড় উঁচু করে তোমার বাড়ির 

                     পাঁচিল টপকাতে যাই

একবার, শুধু একবার তোমার মুখ দেখব বলে!

 

প্রাণজি বসাক

বল সারঙ্গী

 

কীভাবে মনে পড়বে… বল সারঙ্গী 

যেভাবে রং বদলে  ঢং বদলে সঙ্গী 

যেভাবে মা দিতেন চিরতাভেজা জল

লাল-চা দেবার পূর্বে প্রথম কসরত 

নাতিদীর্ঘ বালকবয়স ছুটে বেড়ায় 

 

মনে করে করে হয়রান বল সারঙ্গী 

জীবনে কেন    বয়সের বয়স বাড়ে 

অযথা যৌবন খুঁজে খুঁজে পাগলামি 

দৃষ্টি ঝাপসা তবু দেয়ালের রং বুঝি 

বল সারঙ্গী কতটা রং চড়ালে খুশি 

 

পুজোর পশরা দেখে নির্বোধ গর্ভ ঘর

বিকাশ চন্দ 

 

অচেনা ভাস্কর্যের উৎসবে বাঁচে অজানা বিষাদ

আর্তনাদ হীন যন্ত্রণায় ঢেকেছে মানুষের ঘর

মাটির স্তুপের ভেতর ঢেকে গেছে বংশ ঠিকুজি 

উইয়ে খেয়ে গেছে ভালোবাসার লিপিসত্র সব

কোন আকাঙ্ক্ষার ঠিকানা নেই মানুষের সংসারে

 

চিরকাল যেমন বাজে শাঁখ

মন্দিরের ঘণ্টা সকাল সন্ধ্যায় আরাত্রিক আলোয়

অকাল বৃষ্টির ভেতর ভালোবাসা ভেজে স্মৃতির ভেতর 

মায়াবী বউবাসন্তী সুর হলুদ পাখির স্বরে

চিরন্তন ভালোবাসাগুলি বাঁধা পড়ে আছে

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মতো 

অর্বাচীন পুজোর পশরা দেখে নির্বোধ গর্ভ ঘর

 

জন্ম সূত্রেই রক্তের ভেতর কান্নার বাসাঘর

জলভর্তি করতলে খুঁজে দেখে পূর্ব পুরুষের ছায়া

স্বপ্নের পাখিরা উড়ে যায় ঝরে যায়  উড়ান পালক

 

 মায়াবসত

সুব্রত মাইতি

 

তুমি যাই করো না কেন

সমুদ্র তোমাকে অশুভ সময়ে ডাকবে

একটু একটু করে শেখাতে চাইবে সাঁতার

ঢেউ এর সাথে ভাব বিনিময় -

নব্য রূপকথা রচিত হবে তোমাকে নিয়ে

এক তরল মরুতে তুমি তখন

ঈশ্বরের মতো নাকি মৎস্যকন্যা হয়ে

হৃদয় মেলে দেবে

গড়ে তুলবে মায়াবসত ভাষাহীন

বাক্য বিনিময়

নিজস্ব স্বপ্নগুলি সেখানে

কাগজের নৌকা হয়ে ভেসে যাবে

তুমি যাই করো না কেন

এভাবেই তোমার ভবিষ্যৎ লেখা হবে

 

ভিখিরি 

বিধানেন্দু পুরকাইত 

 

একটা ভিখিরিকে দেখে চমকে উঠছে সবাই

হাতে পায়ে ঘা

সারা শরীর দুর্গন্ধময়

 

পোশাকে শালীনতা বিরল

চুল দাড়ি নখ তথৈবচ 

যতটা সভ্য মানুষ আশা করে

 

ভিখিরির চোখে ছানি

মনে কি জানি একটা ভয়

অথচ ভিখিরির স্বরে সবাই আবিষ্ট

 

প্রত্যেকের ভেতরে এক ভিখিরির আনাগোনা 

করুণ আর্তি নিয়ে কাউকে খোঁজে 

ভালবাসার নাকি ভরসার?

 

প্রয় মুদ্রা

পুষ্প সাঁতরা

 

রেলিং ধরে গুটি গুটি
ঢেউ জ্যোৎস্না মাখা
ভয় রাখবার কাঁধ টুকতে
প্রণয় মুদ্রা আঁকা
চোখ মুছবার আড়ালেতে
সামান্য রোদমূখী
সাধ্যমত উড়িয়ে দিই
হৃদকমলে ঝুঁকি
চিত্রনাট্যে সাজঘরে সাজ
পদ্মবীজে মালার সুখ
কালকাসুন্দের জমাট জেদে
অভিমানের মরুবুক


শিবগঞ্জ 

অমিত কাশ‍্যপ

 

শিবগঞ্জ সমস্ত ভালোবাসাখানা তুলে নিল

এই দিকে শকুন্তলার বাড়ি, জোরে বলেছিল 

সারারাত বৃষ্টির পর সকালে নিরালা

রাস্তায় আকাশ ভাসে, টলটলে নীলবর্ণ আকাশ 

চমৎকার সময়, কোথাও চা চক্রের ঠেক আছে 

 

সবুজ এখনো ছুঁয়ে আছে স্থানে স্থানে

শহর গিলতে গিলতে কোথায় যেন আটকায়

রাস্তা পেরই সন্তর্পণে, জটিল রাস্তার বাঁক

সুবল মাহাতোর নিচু বাড়ির পাশে বেমানান 

অট্টালিকা শোভনতা নিয়ে ব‍্যতিক্রমী হয় 

 

বৈষম্য কি এখন থেকে শুরু চৌধুরীবাবু

জনগণনার নানান প্রশ্নবিধি এবার লাগু হয়েছে 

রাষ্ট্র যে কি করতে চায়, নম্রতা নিয়ে চলি

 

অসমাপ্ত পংক্তি

রুমকী দত্ত

 

তুমি চলে গেছ বহুদিন,

তবু বিদায়টা আজও শেষ হয়নি...

বুকের ভেতর এক টুকরো বিকেল

তোমার নামাঙ্কিত।

যে পথে একদিন

তোমার হাত ছুঁয়ে ফিরেছিলাম,

সেই পথে আজও কৃষ্ণচূড়া ফোটে।

সময়ের কাছে হার মেনেছে ঋতু,

বেঁচে আছে কেবল অপেক্ষা...

আজও গোপনে তোমার জন্য

আমি এক মুঠো জ্যোৎস্না তুলে রাখি,

জানি, আর কোনোদিন

তোমার চোখে চোখ রাখা হবে না,

তবু আমার সমস্ত কবিতার শেষে

তুমিই রয়ে যাবে অসমাপ্ত পঙ্‌ক্তি হয়ে।

 

নির্যাস , ছত্রিশ বসন্তের

অর্ণব সামন্ত

 

সুর ওঠে ভৈরবীতে পূরবীতে ডুবে যায় 

অবাধ্য ঝর্ণায় পান্ডুলিপি আঙুল রাখে

জ্যোৎস্নার মায়া মেদুরতা সেবা প্রথম আলো দ্বারে

 

মনকেমন ইমনের বুকে কথাকলি নাচে

মণিপুরী , ওড়িশি থমকে স্থির চিরমুদ্রায় 

দিগন্তের আঁচল ঢাকে যৌবন আত্মবন্ধু হাওয়ার অপেক্ষায় ! 

 

সিম্ফনি কখন যে ছুঁয়ে গ্যাছে আশিরনখ

রোমাঞ্চে , আড্ডায় পুরনো ভিতও আগুন জ্বালে

কোষে কোষে ওঠে গান , স্নায়ুতে স্নায়ুতে কবিতা আবেশ 

শব্দের শরীরে কাঁপুনি ঝাঁকুনি মনে তার নৈঃশব্দ্য অভিপ্রায় 

আঁধার হননকারী জলছবিগুলো অপরূপ জ্যামিতিক নির্মাণে  

সংঘর্ষ ধ্বংসের পর ডুবে থাকে নৃত্যশীল সৃজন মহিমায় 

 

নশ্বর পৃথিবীর টানে 

অর্পিতা দাস 

 

আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে রোজ

একটুখানি অমৃতের স্বাদ - 

মিঠেকড়া রোদে বেলা বয়ে যায় - 

 

ফিকে হয় আর সব

জানলা দোর মস্ত ফাঁকি-

 ধূ ধূ পথ কেবলই শূন্যতা - 

ভিনগ্রহীর মতো 

 সমাপ্তির রেখা টেনে

চারটি খুঁটি জড়াজড়ি করে 

  নশ্বর পৃথিবীর টানে 

প্রান্ত বরাবর.

 

মেঘচতুদর্শ

সুমিতা মুখোপাধ্যায়

 

ধুলোর ঐশ্বর্য নিয়ে জেগে আছি আমি

বাতাসের ঘুমের ভিতর,সমাপ্তির

সকল ধূসর প্রস্তাবনা শেষ হলে

আমি যাব রঙের উৎসর্জনে একা

সময়ের ক্ষতচিহ্নগলি রঙে - রঙে

ভরে দিতে,হয়ত তখন সময়ের

সিন্ধু থেকে, কালিদাসের রচনা থেকে

ধুলোর বেদনা নিয়ে, কিংবা সুদূর

দিগন্তপারের সেই বিরহী যক্ষের

বিরহের ধুলোময় বার্তাটুকু নিয়ে

উড়ে আসবে কোন আনত সজল মেঘ

বিরহিনীর আকীর্ণ কেশে জমে -ওঠা

ধুলোর আসক্তিহীন নগ্ন মায়াটুকু

ধারামুখরতা দিয়ে পূর্ণ করে দিতে।

 

 আগাছা

কবিতা সামন্ত


বাবাকে কখনো দেখিনি 

ঠাকুমাকে একদিনও ভাত বেড়ে দিতে


ঠাকুমা মাকে কখনোই পছন্দ করতনা


মাকে উঠতে বসতে দুচ্ছি করত 

তবুও মা-ই সবদিন 

ঠাকুমার সেবা করে গেছে


ভালো ছেলের তকমাটাও 

সমাজের কাছে কিন্তু বাবাই পেয়েছে


কেউ কোনদিন মায়ের নাম নেয়নি!


অথচ পান থেকে চুন খসলেই

সেই সমাজই সমস্ত দোষ মায়ের 

ঘাড়ে চাপিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে

মা সবটা মুখ বুজে সহ‍্য করে গেছে!


আচ্ছা এসমাজ নারীকে 

আগাছা মনে করে সবসময় তাই না?

 

রাতের গন্ধ মেখে 

মিতা ভৌমিক মান্না 

 

শেষ যুদ্ধটা হয়ে যাক তবে আজই, 

তারপর পৃথিবী আবার সেজে উঠুক- 

  নিপাট শান্তির শ্লোকে

অনুরণন ছড়িয়ে আবিরা গোধূলি 

নত মস্তকে পেশ করুক-

তারা জ্বলা সন্ধ্যার সমাচার

তারপর, তমালের পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা রাত্রি 

তার আঁচলে ঢেকে দিক চারদিক 

রাতের গন্ধ মেখে, 

এবার অভিসার মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হোক 

  পাটভাঙ্গা বিরহী সময়

 

অন্য পৃথিবীর পথে
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়

ঘোড়ার খুড়ের মতো এগিয়ে চলা নদী
কতো জনপদ ভেঙেছে, উপত্যকা ভেঙেছে
অংকের ধারাপাতের মতো শব্দ নদী

একটু নীরবতার জন্য পথিকের মতো
ভ্রমণের অভিপ্রায়ে নদী তীর ছুঁয়ে চলা
মেঠো পথ দিয়ে দূরে দূরে অন্য কোথাও

একাকী একটা অরণ্য অন্ধকারে হারিয়ে
যাওয়ার অভিলাষে পাতার শব্দ ভেঙে ভেঙে
গভীরে গভীরে আরও যেন গভীরে চলে যাওয়া

একটা শূন্য রেখার দিকে অন্তস্থল প্রসারিত
করতে করতে চাঁদ তারার গল্প শুনেছিলাম
এক বাল্যকালে পিতামহীর কোলে....

এখন সেই পথ খুজতে বেরিয়ে কেমন মনে
হয় পথ হারিয়ে এক অন্য পৃথিবীর পথে....

 

নীরব বীণা

বীথিকা পড়ুয়া মহাপাত্র 

 

হারিয়ে যাওয়া স্বরলিপির পাতা

মনের বোর্ডে গোপন ছবি আঁকে,

মুগ্ধ দিনের হাওয়া পাখির মতো

উড়ে এসে মন জানালায় বসে

 

নীরব বীণা বাজে না তো আর,

হারমোনিটার রিডগুলো সব বসা,

সারেঙ্গিটার তারগুলো সব ছেঁড়া

প্রবল ঝড়ে তবলা গেছে ফেঁসে

 

সময় আমার উল্টোদিকে হাঁটে,

স্মৃতিরা সব আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা

ঝাপটে ডানা মনটা উদাস করা

বেঁচে থাকার সুখের স্বপ্ন আঁকে

 

শব্দের কানাগলি

শঙ্কর সামন্ত

 

শব্দের কানাগলি খুঁজতে খুঁজতে 

ড্রোন হামলার শব্দ ঘিরে ফেলেছে প্রাণিত সুবাস,

আলোর পতন নিঃশব্দে পেরোতে চায় প্রেমের চৌকাঠ,

প্রেমিক-প্রেমিকা গাঢ় নীল বা সবুজ রঙে ডুব দেয় আত্মচেতনায়, 

বিশল্যকরণী জুড়ে দেয় ঘা মুখ,

আমি বানাই-অক্ষর সেতু কবিতার ছত্রে ছত্রে, 

সেতু ভাঙলেও অক্ষরের সেতু পথ দেখায়, তবুও-

স্বপ্ন পেরোতে চায় চেতনার আস্তানা, 

চেতনা চেতনাতেই থেকে যায়-

কানা গলি কানাগলিতেই,

নদীর দু-পার আছে বলেই-

নদী প্রানবন্ত


মেঘমহল 

প্রভাত ভট্টাচার্য 

 

যে লোকটা ছুটে বেড়াচ্ছিল 

প্রজাপতিদের সঙ্গে 

সে এসে বসল দীঘির পাড়ে 

জলছবি আঁকতে 

ছবি দেখতে নেমে এল মেঘেরা 

লোকটা বসে রইল মেঘ মেখে, আর

সেও ধীরে ধীরে মেঘ হয়ে গেল 

তারপর তৈরি হল মেঘের বাড়ি 

নেমে এল নক্ষত্ররাও 

কেউ আর ফিরে গেল না আকাশে 

মেঘমহলের ওপরে আলোক বিচ্ছুরণ 

আকাশ তাকিয়ে থাকে 

মেঘমহলের দিকে 

 

অজান্তেই ভিখিরি হয়ে গেলে
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

বিরিয়ানির প্লেট থেকে তুলে নিই লেগপিস, চিবোনোর
আমেজে স্বর্গসুখ, বাঁহাতে স্মার্টফোন তোমার হাসির
নকল দাঁতে ত্রেতাযুগের আয়না, মুলোদাঁত, ভয় পাই

নরম প্রোটিনে কামড় দিতেই দাঁতের সুখ ঠেলে দেখি
কামড়েছি শুকনো রুটি, ওয়েটারের দিকে তাকাতেই উত্তর,
আপনার প্লেট বদলে গ্যাছে, আপনি আর এলিট নন,
আম জনতা, বেকার জনতা
রাগে দুর্বাসা হবার আগেই শীতল উত্তর, মালিকের আদেশ

গদি আঁটা চেয়ার ছেড়ে রাস্তায় নেমে দেখি আমার সেই
বেকার জীবন হাসছে, সে কোনোদিন এমন নিঃস্ব ছিল না,
অযোগ্য তো নয়-ই, আমি  ভিখিরি রাবণ

মৃত্যু ততোটা ‘মৃত্যু’ নয়!

গোবিন্দ মোদক

 

একটা নিপাট ‘মৃত্যু’কে দাহ করে

বাবা ফিরে আসছেন লরী চেপে,

অথচ কারও কোনও বিকার নেই;

কেউ দু'পেগ চাপিয়ে গান গাইছে,

কেউ ফেসবুকে মগ্ন,

কেউ বা প্রেমিকার সঙ্গে কথোপথনে!

ড্রাইভার যতোটা সম্ভব

খানা-খন্দ বাঁচিয়ে লরী চালাচ্ছে,

রাস্তাটাও ততোটা নির্বিকার নয় –

যতোটা নির্বিকার

বাবার এই মুহূর্তের সহযাত্রীরা

বাবার সঙ্গে আমিও রয়েছি,

সদ্য মাতৃহারা

 

শেষ আশ্রয়
সুনীতা ব্যানার্জী

সারাদিনের ক্লান্তি মুছিয়ে দেয়
এক ফোঁটা কালির আঁচড়
যার ছায়ায়
     অনন্তকাল
বসে থাকা যায়
  ধ্যানমগ্ন ...

 

দক্ষিণের জানালা

ত্রিদিব রায়

 

খুলে দিয়েছি দক্ষিণের জানালা

একটু মুক্ত  বাতাস চাই 

হৃদয় ভেজানো এক পশলা বৃষ্টি 

অরণ্য আর আকাশের নিবিড় মায়ায়

একটু নিবিষ্ট বাঁচা বাঁচি

 

কেউ যেন বলেছিল, এ জীবন মহা শূন্য 

চাওয়া পাওয়া সমস্ত অসার

শেষ হলে ঘর গেরস্থালি

খালি হাতে শ্রান্ত ক্লান্ত 

ভুল পথে শুধুই এগিয়ে চলা

 

জীবনের খাতা শুধু ভুলে ভুলে ভরা

হিসেব মেলে না কিছু

লাভ ক্ষতি ফেলে রেখে কান পাতি 

রাখালিয়া মেঠো সুরে

সুখ খুঁজি ফড়িংয়ের উৎসুক ডানায়

 

ভালো শব্দটা   

নির্মলকুমার প্রধান 

 

ভালো- মিষ্টি শব্দটা

প্রায় সবার মুখ থেকে হারিয়ে গেছে

তবে ফুরিয়ে যায়নি এখনো

যেন কোথাও শিলার খাঁজে জীবিত ফসিল হ'য়ে  আছে। 

 

ঘোলা জলে হারিয়ে যাওয়া অলংকার যেন

হাতের কাছে কিন্তু আড়ালে

তার প্রত্যাশী হ'য়ে হাতড়াই সকলে নিত্য নিরন্তর

কিন্তু মুঠোতে উপচানো দ্রব্যের মতো অধরা। 

 

রাতের চাঁদ কিংবা দিনের সূর্যের মতো

চিরকালের মেঘ ঢাকা সে , অপসৃয়মান না হ'লেও

কোহিনূরের মতো আমাদের নাগালের বাইরে তার থাকা

ইচ্ছের রজ্জুতে বাঁধা নয় সে মোহময় শব্দটা

 

জীবন
প্রশান্তশেখর ভৌমিক

রাখলে কোথায় তল্পি-তল্পা, ঝুলি-ঝোলা, লটা-কম্বল,
বিষয়-আশয়, রোজনামচার পেটমোটা হালখাতা?
সারা গায়ে মেখে চুয়াচন্দন, গিরিমাটি, রসকলি...
দূর আশমানে কী খুঁজতে চায় বিস্ফার দুটো চোখ?
তাই  কি স্বজন তুলসীপাতায় ঢেকেছে দৃষ্টিপথ !
এখন যাচ্ছ চার বেহারার চতুর্দোলায় চেপে,
প্রিয় স্বজনের কান্নার রোল হরিনাম গানে চাপা
চললে কোথায় ঝাড়া হাত পায়ে উলঙ্গ সন্ন্যাসী?
শ্মশানভুমিতে  মহাযজ্ঞের চৌঘরা প্রস্তুত,
শুকনো সমিধ, গব্যঘৃতের সেবাটুকু পেয়ে খুশি?
ফনাধর সাপ লেলিহ আগুন নিরামিষভোজী নয়‌,
হাড়-মেদ-মাস কাঠকুটো ঘিলু সব কিছু গিলে খায়

মায়ের আঁচল, ঘুমের দোলনা, খেলার পুতুল আর
আগুন বিছানা, শেষ পালঙ্ক, বিষয়-আশয় সার
ঘরে আসা আর ঘর ছেড়ে যাওয়া দৃশ্যের বিপরীত,
নাটকের শেষে যবনিকাপাত আলোর উল্টো পিঠ
যেখানেই থাক ছবি নোটবুক অবয়ব পোড়া ছাই,
কালদর্পনে ধোঁয়াশার স্তর ছায়া কোত্থাও নাই । 

 

আয় আয় আয়

তাপসী লাহা 

 

চিৎকার করে ডাকার দরকার নেই 

বলো আসছি, আসছি   আসছিগো

 

এই তো এলাম.   পড়েছি এসে প্রায়

 

ভাত বেড়ে বসে থাকা 

সন্ধ্যা থেকে রাত্রি হয়ে যায়

 

অপেক্ষারা ঝোলের মত ঘন,গাঢ়, তেলঝাল বেশি কিনা ভয় হয়

 

তরকারির ঠান্ডা,তরিবত মিঠেকড়া শুনবে ঐ গোলার্ধ থেকে

 

পেঁচা, ফড়িংয়ের ডাক।শিউলির কমলা বোঁটায় খাতা হেরে যায়

রুপকথা জল কৃষ্ণকলি,বলি তোমাকেও চির সবুজের মিতা,

থালা সাজিয়ে ডেকে ওঠে আনত শালিক,

ভেজা মাথায় কর্তা ডাকে, আয়   আয়    আয়

 

 বলি, আসি  আসি,     এসে পড়েছি প্রায়

 

ঝড় ওঠে ক্লান্ত মরুভূমির উপর

বেলা বাড়ে ক্রম


বিষন্ন বিকেল

বিদ্যুৎ মিশ্র

 

ঝড় ওঠে ক্লান্ত মরুভূমির উপর

বেলা বাড়ে ক্রমশ উত্তাপ সারা শরীরে;

বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আর

উঠোন জুড়ে উড়ে বেড়ায় আদ্যিকালের ধুলো

তারপর অনেক না বলা কথা চুপ করে যায়

লেখা থাকে কবিতার পাতায়

সমস্ত অভিমান কখন যেন

হা করে তেড়ে আসে রাত বাড়লে

ধীরে ধীরে পলি জমা হতে থাকে জানালার বাইরে

কোথাও টুপটাপ ঝরে পড়ে শিশির বিন্দু

হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় কবিতা

বিষন্ন বিকেল জানে সব মন খারাপের গল্প


মূল্য 

মোঃ আব্দুল রহমান 

 

চারিদিকে ইনকামের ব্যস্ততা 

বাড়ছে, বেড়েই চলেছে...

 

সম্পর্কের গিঁট ছিঁড়ে ন্যাতা 

কুটুম্বহীন ঘরদোর

 

কোথায় টাকার স্বাদ!

 

অথচ মা আঁচলের গিঁট খুলে 

যে পয়সা দিতেন---

অমূল্য রতন!

আত্মীয়রাও বাড়িতে এলে...

 

সাত সমুদ্র তেরো নদীর বাঁধে 

সম্পর্কের শাশ্বত বন্ধন

 

ফিরে এলাম মাটিতে 

ননীগোপাল জানা 

 

খুঁজতে খুঁজতে গভীর গভীরতায় 

সব পাওয়ার আশায় 

শব হওয়ার উপক্রম

 কবিতা চাষ হয় না সর্বত্র 

 

উত্তরণের সিঁড়িতে ভবিষ্যৎ রেখে 

ভাবছি আকাশ কুসুম 

উদ্ভ্রান্ত জলদ শান্ত হয়ে খুঁজছে মাকে 

পৃথিবীর মাটিতে ফোঁটা ফোঁটা কান্নায় লেখা কবিতা 

 গানের পৃষ্ঠা নদীতে ভাসায় 

"গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা"

সবুজেরা সৃষ্টির ছড়া লিখছে ফুলে ফুলে  

চষা মাটির গন্ধ সর্বত্র 

যা চাই সব

 

নীরস বসন্ত

মালা মন্ডল মিদ্যা 

              

নরম হাতের স্পর্শে

মনের ভুবন ভরিয়ে ছিলে 

বলেছিলে আসব

বসে আছি সেই প্রতিক্ষায় |

জানি সেই স্পর্শই তোমাকে

ফিরিয়ে আনবে আমার কাছে .

মুখ লুকিয়ে কোথাও থাকতে পারবেনা

দিনের পর দিন শুধু গুনে যাচ্ছি

যদি অন্তত একটা চিঠির স্পর্শ পাই

এখন আর নেই কোমলতা নেই |

বয়সের ভাবে দেহ হয়েছে শুকনো কাঠ 

ফিরে আসো নি তুমি

বার বার ফিরে আসে

নীরস বসন্ত |

 

মুহূর্ত

মালা ঘোষ মিত্র

কলকে বীজ সবুজাভ তীব্র ডাক
আচ্ছন্নতা ধরে রাখে-----
তারপাশে সাপের খোলস
এক অবিশ্বাস্য রূপছটা-----
সব তছনছ করে তোলে,
জোছনা এসে ভাসিয়ে দেয়
ঠোঁটে ডুবিয়ে আদরে পিঠ ভিজে যায়
চৌম্বকীয় আকর্ষণে সুঘ্রাণ আসে----
কুঞ্জে বনদেবী গুঞ্জাফলের মালায় অপরূপা
বনের দিকে যাই----
সেখানে হাতির দলে মা হাতি
বাচ্চা আগলে রাখে
কলতানে অবর্ণনীয় মুহূর্ত---
নদীর পাড়ে মাছরাঙা

 

বৃষ্টির শেকড়

কৃষ্ণাংশু মাকুড়

 

আজ সারাদিন বৃষ্টি হয়েছিল

শ্রাবণের আকাশভাঙা তুমুল বৃষ্টি

বৃষ্টিতে সব ধুয়ে মুছে যায়

পড়ে থাকে জলের কষাটে দাগ

সেই দাগের ভেতরে কান্না, ব্যথা

ভাসমান কথারা পলি হয়ে জমে

আবার বৃষ্টি নামলে লতানো ব্রততীর মতো

সারা মাঠ ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠে...

 

বৃষ্টি মনের শেকড়ে ফেরার মোক্ষম বাহানা

যেদিন সকল বৃষ্টি ক্লান্ত হবে

আকাশ ভরাট হবে কাকবন্ধ্যা আলোয়

সেদিন সব কথা শুষে নিয়ে

সব কান্না মুছে দিয়ে

মাটি হবে অনন্ত সাহারা!


অভিযোগে রক্তাক্ত
নীলোৎপল জানা

রক্তাক্ত করেছে বলে আমি তোমায় রক্তাক্ত করতে পারি না।
আমার প্রতি তোমার অগাধ অভিযোগ সত্ত্বেও আমি প্রতিরোধ চাইনি।
তোমার অভিযোগ আপাত অর্থে অসন্তোষ সৃষ্টি করলেও অমূলক নয়।
বারবার নিজের পারিপার্শ্বিকতার প্রতি খেয়াল রেখে এগোতে চেয়েছি.....
বারবার চেষ্টা করেছি অভিযোগ থেকে পথ কেটে বেরোবার....
চেষ্টা যে করিনি তা নয় , সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারিনি,
চারদিক সামলে উঠে কিছুই দিতে পারিনি তোমায়
তুমি যদি মনে কর শুধুমাত্র চাহিদা মেটানো টাই জীবনের লক্ষ্য
তা হলে আমি বলব এ জীবন ব্যর্থ, হাতে হাত রেখেও অনেকটা পথ হাঁটা যায়....
এসো, পথে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে দুজনে বিশ্রাম নিয়ে।
যে কথা বলার অপেক্ষায় থেকেও বলতে পারিনি আমিও তুমি
তা নাই বা বলা হল, এইতো বেশ ভালো আছি।
আসলে সব কথা বলার দরকার হয় না
হাত ধরে কাটিয়ে দেবো বাকিটা জীবন, এটাই তো জীবনের পরম পাওয়া
এই প্রাপ্তি কজনার হয়, আবার জীবন পাবো কিনা জানি না
জীবনে যা পেলাম যা পাইনি , কোনো হিসাবই রাখার প্রয়োজন নেই।
এই যে কাছাকাছি আছি এটাই জীবনের চরম পাওয়া।


==================


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. প্রতিটি সংখ্যাই আকর্ষণীয় ও মূল্যবান। প্রিয় সম্পাদকবন্ধু সমেত সবাইকে অভিনন্দন জানাই।

    উত্তরমুছুন