E- দুইপাতা পত্রিকা
১০৮তম প্রথম সংখ্যা, ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
Mail iD: lokpathduiipatapatrika1978@gmail.com
লুকোচুরির চতুর্থ প্রহর
শান্তনু প্রধান
নষ্ট হয়ে যাওয়া লুকোচুরি — কাউকে বলিনি।
হয়তো তাই পাপ খসিয়ে, ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছে স্নিগ্ধ প্রতিমা,
আর আমাদের রুগ্ণ রোদ নিখুঁতভাবে জড়িয়ে ধরেছে তাকে।
ওহে শ্মশানচারী কাপালিক,
তোমার রুদ্রাক্ষে কি লেগে আছে সেই সব রাতে জেগে থাকা পাপ?
আমি কিন্তু কিছুতেই পুড়ে যাচ্ছি না।
ভোরের আলোয় লেগে আছে কুয়াশার তরল—
সেইসব দেখে কারা যেন নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ছায়াহরিণের কণ্ঠ।
বিনিদ্র ডালপালা থেকে নেমে আসা
অজস্র আকাশ ভেঙে পড়েছে ব্রিজের ওপর—
ততই বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে জলজ পরিদের যাত্রায়।
বিশ্বাস করো, আমার তো কোনো আলো নেই—
বুকের ভেতর এক সমুদ্র জল,
মাঝেমধ্যে জ্যোৎস্না লেগে উপচে পড়ে হাড়-মাংস।
হয়তো তাই—
কষ্ট করে, কোনোদিন, কাউকে বলা হয়নি
নষ্ট হয়ে যাওয়া এক লুকোচুরির কথা।
তিন ফোঁটা অশ্রুর মহাকাশ
কোথায় থাকিস, মনে পড়ছে না আর
সহস্র নক্ষত্র ভেঙে-চুরে খুঁজতে খুঁজতে নিঃস্ব হয়ে গেছি।
পুতুল আমার, তোকে তেমন করে লালন করতে পারিনি বলে
সেতুর ওপর ঝুঁকে আছে প্রস্তরীভূত ও কস্তুরীভূত আকাশ।
এখানেই কোথাও তুই ছিলি, ক্ষতবিক্ষত হয়ে—
প্রাচীন কোনো গুহার রক্তাক্ত পাতার আড়ালে।
শুধু তোর শরীর দেখিনি।
কেন যে তুই সময়ের আগে বাইরে এলি?
উদ্ভাসিত ধুলোয় তৃষ্ণার সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলাম।
আনন্দ হতে হতে, কেন যে তোর এত রাগ হলো?
একটি গিরিখাদ পেরিয়ে এসে দেখি—
নুয়ে পড়ার আগে
শূন্য হয়ে গেছে সবকিছু।
বরফ-পর্বতের ওপর একটুও সূর্য নেই, শুধু
তিন ফোঁটা অশ্রুজল ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে চলেছে।
এখন আমি যেন ভারহীন।
আমার পৃথিবীটুকু ভেসে গেছে ওই তিন ফোঁটা জলে।
কোথায় থাকিস, মনে পড়ছে না কিছু।
ভালো থাকিস, ভীষণ আনন্দে থাকিস—
হাজার বছর পরে, কোনো এক নদীর ধারে
আবার যেন তোকে বুকে পাই।
স্রোতহীন নদীর প্রার্থনা
রোয়া ওঠা ছাদের কার্নিশ বেয়ে
বৃষ্টি নেমেছিল একদিন আমার শরীরে।
পাথর ভাঙা সেই বৃষ্টি—
আমার সমস্ত নীরবতা জুড়ে
আমিও ঠিক বুঝিনি কখনো তোমাকে,
শুধু "ধর্ম" বলে জেনে এসেছি এতকাল।
এখন অদৃশ্য সবকিছু।
আমি যেন কেমন করে নদী হয়ে গেছি—
তাও কি জানো? স্রোতহীন নদী।
তোমার ছায়ায় যেদিন মাদুর পেতেছিলাম,
সেদিন তুমি বুঝি বৃক্ষ ছিলে।
আজও তোমার শাখা-প্রশাখায় আনন্দের নাচ-গান।
গভীর অরণ্যে কারা যেন দু’হাত তুলে নাচে।
হে ঈশ্বর, চারিদিকে কেন এত সুরভি?
কার স্পর্শ পেতে চাইছি আজ?
তোমার সমুদ্রযাত্রা শেষ হলে,
একবার লিখে দিও যৌবনের কথা।
এখনও সেই বৃষ্টি
আমার শরীর বেয়ে মিশে যাচ্ছে জলের গভীরে।
নেশার পেট চিরে
নেশা ঠিক কতখানি হলে
নির্জন রাস্তায় গাড়ি থেমে যেতে পারে?
নির্মম হাতুড়ির ঘা একদিন স্রোত ভেবে
এই রাস্তায় বয়ে যাচ্ছিল।
সেদিন কোনো স্বপ্ন ছিল না বৃন্তে,
পাশের বাগানভর্তি ঘাসে
আমিও যেন কেমন করে
বিরূপ স্রোত হয়ে উঠেছিলাম।
এখন বারান্দায় বসে আছি—
অন্ধকারের ভেতর খুঁজে চলেছি
সহস্র নদী, তার ফাঁকফোঁকর,
চেনা শব্দরা কানে এসে বাধে,
তবু হাতের নাগালে কিছুই পাই না।
সমস্ত অতীত,
ছেঁড়া পাজামার পকেট থেকে
ঝুলে পড়ছে আমার অন্ধ দুই চোখে।
ও আমার অতীত—
প্রাণের চেয়েও প্রিয় অতীত,
এইভাবে অনাত্মীয় হয়ে যেতে পারো?
এই তো আমার মাথার ওপর
চাঁদের প্রভায় নেচে উঠছে
গঙ্গার পাড়ভাঙা সেই পরিশুদ্ধ ঢেউ।
আত্মহারা পাখিদের স্বরলিপি
ভেঙে ফেলছে পুরনো গাছের ছায়া।
অথচ এত কিছুর মধ্যে তুমি নেই—
কেন যে নেই...
এবার আমি সার্জিক্যাল ছুরি দিয়ে
নেশার পেট চিরে ঢুকে পড়ছি
ধাত্রীর গর্ভে।
এখন শুধু একবার—
কেউ তো একটা ধূপ জ্বালো
তুলসী পাতার নিচে।
ঘুড়ির সুতো
ঝরে-যাওয়া একটি বিকেল,
জলের ভেতর তিরতির করে বয়ে চলে।
সেই রাত, তবে কি
আজও ঝুলে আছে বাদুড়ের নখে?
আরেকটি সময়,
তর্জনী উঁচিয়ে রেখেছে—
অসুখ বারান্দায়!
তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো
অসুখ বারান্দা,রাত , না কি
ঝরে-পড়া সেই বিকেল
কিছুই না—
বিরূপ শূন্যতায় ফেটে পড়ে অতীতের অস্পষ্টতা।
স্বাধীনতা ও পরাধীনতার মাঝখানে
ঘুমিয়ে আছে তার প্রোথিত ডানা।
ও-পাড়ায় তীব্র বিদ্রূপ বাজেউঠবে বলে
হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলাম তুচ্ছ কিছু কথা।
তবু কেন, গোপন এক কষ্ট
ঝুলে থাকে শোবার ঘরে?
মাঝে মাঝে আমিও, জানি না কেন—
বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখি ভো-কাটা ঘুড়িটির সুতো।
===============================
কাকদ্বীপ।। দঃ ২৪পরগনা

0 মন্তব্যসমূহ