E- দুইপাতা পত্রিকা
১০৭তম পঞ্চম সংখ্যা, ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
Mail iD: lokpathduiipatapatrika1978@gmail.com
আলোর অক্ষরে
পুরুষের ভ্রুকুটি ছেদ করে
উঠে আসে এক আলোকবিন্দু —
যে আলোয় দগ্ধ হয় অন্ধ নিয়ম,
আর জন্ম নেয় চেতনার শিখা।
ছেঁড়া মানচিত্রের ভেতর
লেখে নতুন পৃথিবী,
যেখানে কলম কাস্তের পাশে
বিপ্লব শেখে গান গাওয়া।
মাটির বুক জেগে ওঠে,
তুলোর ভেতর বোনা হয় ভবিষ্যৎ —
শাড়ির রঙে মিশে থাকে
অজস্র ভোরের প্রতিজ্ঞা।
নারীবাদ কোনো তর্ক নয় —
এ এক প্রভাতমন্দির,
যেখানে যুক্তি গলে যায় মায়ায়,
রোদ্দুর ঝরে পড়ে রুটির মতো।
রাত এখন তারই আকাশ,
সে নিজের নাম লেখে
আলোর অক্ষরে।
২)
আধো আলোয় নৌকার গান
দু’পাশে বন, যেন নিঃশব্দ প্রহরী,
তাদের ছায়া নদীর বুকে—
সেই ছায়ার ভেতর দিয়ে ভেসে চলে
আমাদের নৌকা, আমাদের নীরবতা।
তুমি গান ধরলে—
তোমার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ যেন নদীরই স্রোত,
আমার ঠোঁটে তার প্রতিধ্বনি,
দু’টি সুর মিলেমিশে হয় অদৃশ্য সেতু—
যেখানে প্রেমই ভোরের প্রথম আলো।
সন্ধ্যার মেঘ ঢেকে দিল আকাশ,
তবু তোমার চোখে চাঁদের আলো লুকিয়ে রইল।
আমি দেখি-তোমার নীরব দৃষ্টি
আমাকে টেনে নিয়ে যায় অনন্ত জলে,
যেখানে ডুবে গিয়ে আবার জন্ম নিতে চাই।
ফুটে থাকা বুনো ফুলেরা নদীর তীরে
আমাদের গান শুনে নত হয়,
যেন জানে—
এই প্রেম কোনো ক্ষণিক নদীযাত্রা নয়,
এ এক অস্তিত্বের তীর্থযাত্রা।
তুমি হাত বাড়াও, আমি নিঃশব্দে স্পর্শ করি,
সেই ছোঁয়া আর কোনো দেহ নয়—
এ যেন আত্মার জ্যোতি,
যা সন্ধ্যার আধো আলোকে পূর্ণ করে তোলে।
দাঁড়ের ছন্দ হঠাৎ স্তব্ধ,
মাঝি তাকায় আকাশ-জলে—
যেন সে-ও ভাসছে আমাদের গানে,
নদী তখন আপন মনে স্রোতকে বুকে টানে।
৩
তোমার না বলা কথার মধ্যে
তুমি কিছু বলো না, তবু আমি শুনি —
চোখের নিচে জেগে থাকা আলোর রেখা,
সেই তো কবিতা, সেই তো আমন্ত্রণ।
আমরা দু'জনই জানি,
ভালোবাসা উচ্চারণে নয়,
অধরা সেই স্থানে জন্মায়,
যেখানে নীরবতা স্পন্দনের মতো ধ্বনিত হয়।
রাত্রির বুকের ভেতর
যখন দু'টি নিঃশ্বাস মিশে যায়,
সেই তো সত্যিকার মিলন —
যা দেখা যায় না,
তবু পৃথিবীকে আলোকিত করে।
৪
পবিত্র পাতার গান
যে বেলগাছে ফল নেই,
তার পাতাও বাতাসে কাঁপে প্রার্থনার মতো।
তবু সমাজ বলে — “অশুভ”,
যেন অর্ঘ্যে রাখলে দেবতা রুষ্ট হবেন।
আমি দেখি,
ভক্তের হাতের নিঃস্বতায়ও ঈশ্বর হাসেন —
তিনি তো প্রেমের প্রতিমা, ফলের নয়।
যে নারীর সন্তান জন্মায়নি,
তাকে সমাজ বলে বন্ধ্যা,
তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে নীরব দহন।
কিন্তু কে জানে —
সে-ই তো শেখায়, মাতৃত্ব মানে দান,
রক্ত নয়, হৃদয়ের আলোয় জন্ম।
যেন জন্মের অধিকার গর্ভেই কোণঠাসা —
এই ভুল ভেঙে জাগুক জ্যোতির্ময় বোধ,
জন্মাধিকার আলোয় হোক উদ্ভাসিত।
ফলহীন বেল পাতায় থাকে সবুজ স্বপ্ন,
তেমনি যে নারী অন্যের চোখে রাখে মায়া,
নিঃশব্দে জাগায় সান্ত্বনা —
সে-ই তো জীবনের অর্ঘ্য, পবিত্র বেলপত্র।
ব্রাহ্মণ নয়, বলুক আজ মনুষ্য —
অন্ধ বিশ্বাসের কুয়াশা পেরিয়ে
জেগে উঠুক বিজ্ঞান-যুক্তির ধ্বনি,
যেখানে ধর্ম মানে আলো,
আর আলো মানে মানবতা।
যে নারী ভালোবাসে,
যার মন দুধের মতো শুভ্র,
তার প্রতিটি নিঃশ্বাসই পূজা,
তার প্রতিটি অশ্রুই প্রার্থনা।
৫
রাগিণীর শরীরে ছন্দের স্পর্শ
ভৈরবীর ভোরে ওঠে দীর্ঘ নিঃশ্বাস,
ইমনের মতো গোপন প্রত্যাশা;
বেহাগের সন্ধ্যার রঙিন ছায়ায়
মিশে যায় অদৃশ্য আকাঙ্ক্ষা।
আঙুলের ছোঁয়ায় বাজে তেওড়ার টোন,
অঙ্গভঙ্গি ছুঁয়ে যায় তিনতালের গতি;
কোমল চাহনির গভীর অন্তরাল থেকে
উঠে আসে ঝাঁপতালের অস্থির স্পন্দন।
তানপুরার গলায় যত শিহরণ জমা,
তবলার প্রতিটি আঘাতে খুঁজে নেয় অর্থ;
সে অর্থ মিশে যায় শরীরের ছন্দে—
যেখানে রাগিণী রূপ পায় জীবনময় ভাষা।
.............................….........
সীমা সোম বিশ্বাস
কলকাতা -৫৬
0 মন্তব্যসমূহ