E- দুইপাতা পত্রিকা
১০৯তম প্রথম সংখ্যা , ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
কেন যাই
আশিস মিশ্র
কেন যাই বকুলের কাছে
কেন যাই না মুকুলের কাছে।
কোথায় কখন যাবো
কাউকে বলিনি।
বকুল ও মুকুল কতবার
কতকিছু দিয়েছে।
আমারও দেওয়ার আছে
সামান্য কয়েক পংক্তি।
অংকের মতো, তবুও মেলেনি
শেষ পর্যন্ত ভুল থেকে গেছে উত্তর।
২.
রাজার বাজার
রাজার বাজারে আর যাই না।
কতদিন হয়ে গেল, সেই কবিকেও
আর এক লাইনও লিখতে দেখিনি।
এইভাবে কত কবি বাজারেই হারিয়ে গেছে।
কেউ তাদের খোঁজ নেয় না
পাতা খুলে পড়ে না একটি কবিতাও।
যন্ত্রের বিক্রি বেড়ে গেছে
কবিতা বিক্রি বাড়েনি একটুও।
৩.
বসে থাকতে থাকতে
বসে থাকতে থাকতে
নতুন দুটি চোখ এসে বলল,
কেমন আছো।
মনে হয়, সেই চোখ দুটি
আমারই নিজের ভেতরের।
ভেতরের চোখ বাইরে এলে
তাকে নিয়ে নতুন চোখ তৈরি করি।
দেখাগুলি, দৃশ্যগুলি নতুন মনে হয়।
তিন বছর আগে
তিন বছর আগে যেখানে গিয়েছিলে
সেই বালিয়াড়ি এখন বদলে গেছে।
তোমাকেও এখন অচেনা লাগছে
মুখের রেখায় নানারকম বাঁক।
এসব দেখে দেখে আয়নার সামনে
আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলে।
আমিও কত বদলে গেছি...
আর ফিরে আসবে না সেই মুখ
আর ফিরে আসবে না সেই বালিয়াড়ি।
কেবল ভেসে যাওয়া
একই রেখায় চলমান দু-জন ;
জলবায়ু পরিবর্তনের পরও
নতুন ছবি আঁকতে ব্যর্থ।
সেই পুনরাবৃত্তি --সেই রঙের ছাপ
--
একবার দালির দিকে
একবার ভ্যানগঘের দিকে
ফিরে তাকালে।
তারপরও মুখের অবয়বে
জীবনানন্দের কথা বসিয়ে ভাবলে,
এবার বুঝি নতুন রেখা আসবে।
এলো না, কিছুই এলো না ;
তোমাদের কাব্যভাষা বলে কিছু নেই
কেবল স্রোতে ভেসে যাওয়া।
========================
হলদিয়া।। পূর্ব মেদিনীপুর
==========================
আশিস মিশ্রের পাঁচ কবিতা : অভিজ্ঞতা, সময়-চেতনা, কাব্যভাষা ও সাংস্কৃতিক সংকট
একটি গবেষণা-ধর্মী প্রবন্ধ
ক. ভূমিকা
সমকালীন বাংলা কবিতা গত দুই দশকে যেমন আনুষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে মুক্তগদ্য ও চিত্রকল্পনির্ভর ভাষার দিকে অগ্রসর হয়েছে, তেমনি ব্যক্তিমানসের গভীরে থাকা আত্ম-সচেতনতা, সামাজিক উদ্বেগ, ভাষার অন্তর্দাহ এবং সময়ের ক্ষয়—এসবই কবিতার কেন্দ্রে এসেছে। আশিস মিশ্র এই ধারার একটি উল্লেখযোগ্য ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতা যেমন ব্যক্তিগত অভ্যন্তরের জগৎকে কেন্দ্র করে, তেমনি সমাজ ও শিল্প-সংস্কৃতির ক্রমশ পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে বিশ্লেষণের পথে দাঁড় করায়।
এই প্রবন্ধে আলোচিত পাঁচটি কবিতা—‘কেন যাই’, ‘রাজার বাজার’, ‘বসে থাকতে থাকতে’, ‘তিন বছর আগে’ ও ‘কেবল ভেসে যাওয়া’—সমকালীন মানব–অভিজ্ঞতার বহুস্তরীয় প্রতিফলন। এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন কবিতাপাঠ নয়, বরং একটানা চলমান কিছু মৌল থিমের আন্তঃসম্পর্কিত রূপায়ণ :
১/আত্মানুসন্ধান ও ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার ভঙ্গুরতা
২/সময়ের ক্ষয় ও স্মৃতির রূপান্তর
৩/সমকালীন সমাজে কবিতা ও শিল্পের প্রান্তিকতা
৪/কাব্যভাষার সংকট ও নন্দনতত্ত্বের প্রশ্ন
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো : কবিতাগুলির পাঠ-সংলগ্ন পাঠ বিশ্লেষণ, কাব্যবিন্যাস ও চিত্রকল্পের ভূমিকায় আলোকপাত, এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর সাংস্কৃতিক–দার্শনিক প্রশ্নগুলিকে খতিয়ে দেখা।
খ. আত্মানুসন্ধানের ভাষা : ‘কেন যাই’ কবিতার পাঠ বিশ্লেষণ
‘কেন যাই’ কবিতায় কবি নিজের যাত্রাপথ নির্ণয়ের এক ব্যক্তিগত অনুসন্ধানী রূপক নির্মাণ করেছেন। বকুল ও মুকুল এখানে কেবল প্রকৃতির প্রতীক নয়, বরং জীবন-অভিজ্ঞতার দুই ভিন্ন দিকের প্রতিনিধিত্ব। বকুল—পরিচিত, স্মৃতিময় কোমলতার রূপ; মুকুল—অপরিচিত, নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। কবির প্রশ্ন : তিনি কোন পথে যাবেন?
এই দ্বৈত টানাপোড়েন আধুনিক মানুষের চিরচেনা সংকট—
নতুন জীবনের অজানা পথ বনাম অতীতের নিরাপদ আবেগ।
কবিতাটি শেষপর্যন্ত এসে দাঁড়ায় এক বিপরীতধর্মী স্বীকারোক্তিতে—
অংকের মতো হিসেব করেও জীবন মেলে না; ভুল থেকেই যায়।
এটি কাফকার ‘জীবনের অসমাপ্ত হিসাব’-তত্ত্বের সঙ্গে সাযুজ্যময়। ভুল—এখানে ব্যর্থতা নয়, বরং মানবঅস্তিত্বের মৌল বৈশিষ্ট্য। কবিতাটি আধুনিক আত্মদর্শনের এক শক্তিশালী প্রতিফলন হিসেবে উঠে আসে।
গ. শিল্প ও যন্ত্রসভ্যতা : ‘রাজার বাজার’ কবিতার সাংস্কৃতিক পাঠ
‘রাজার বাজার’ কবিতাটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিন্যাস নিয়ে এক মর্মান্তিক ভাষ্য। শিল্প যখন বাজারের বাইরে চলে যায়, তখন কবি তার অবস্থান কোথায়?
কবিতার সংহত বক্তব্য—
যন্ত্রের বিক্রি বেড়েছে, কবিতার নয়।
এই লাইনটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের বিরুদ্ধে শুধু অভিমান নয়; বরং সাংস্কৃতিক পুঁজিবাদের সমালোচনা। মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘কমোডিটি কালচার’ (commodity culture) মানুষের মনের জায়গা দখল করলে অনুভূতি, আবেগ ও শিল্প—সবই বাজার-অপসারিত হয়ে পড়ে। মিশ্রের কবিতায় সেই বাস্তবতাই ধরা পড়ে।
তবে এটি নিছক নস্টালজিয়ার কবিতা নয়। এটি সমকালীন কবি-অস্তিত্বের একটি সংকটনির্ভর দার্শনিক পাঠ—
কবিতাহীন জনজীবনই আধুনিক মানুষের আত্মিক শূন্যতার মূল লক্ষণ।
‘হারিয়ে যাওয়া কবিরা’ তাই প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় হারাতে থাকা ভাবনা ও স্মৃতির।
ঘ. অভ্যন্তরীণ দৃষ্টি : ‘বসে থাকতে থাকতে’ কবিতার বিশ্লেষণ
এই কবিতায় কবি আত্মচেতনার এমন এক অবস্থান নির্মাণ করেন যেখানে বাহিরের দৃশ্য লুপ্ত, এবং ভিতরের চোখই প্রধান। কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—
অন্তরের চোখ বাইরে এসে নতুন দৃষ্টির জন্ম দেয়। এই ধারণাটি ভারতীয় দর্শনের ‘অন্তর্দৃষ্টি’ (inner vision) চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। উপনিষদীয় ভাষায় ‘দ্বিতীয় চক্ষু’ বলতে যে জ্ঞানের আলো বোঝায়—এ কবিতায় তার কাব্যিক প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
অন্তরের চোখের বাইরে আসা মানে ব্যক্তির নিজেকে পুনর্মূল্যায়ন করা। নতুন চোখ তৈরি করা মানে—
নতুন ব্যাখ্যা, নতুন নন্দন, নতুন ভাষার জন্ম।
এটি সৃজনশীলতার অন্তর্জাত উৎস সম্পর্কে একটি মৌল বক্তব্য।
যেভাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—“আলোকের এই ঝর্ণাধারায়”— তেমনি মিশ্রের কবিতায় আলোকের উৎস আসে অন্তর থেকে।
ঙ. সময়ের পরিবর্তন ও স্মৃতির রূপান্তর : ‘তিন বছর আগে’ কবিতার বিশ্লেষণ
সময়ের ক্ষয়কে কেন্দ্র করে গভীর কাব্যিক বোধ তৈরি করেছে এই কবিতা। বালিয়াড়ি বদলে গেছে—এ শুধু ভূগোলের বদল নয়; এটি সময়ের অসীম শক্তির পরিচয়।মানুষও বদলে যায়—মুখের রেখায় নানা বাঁক পড়ে—এই অংশটি যেন ফুকো-এর রাজনৈতিক ‘বায়োপাওয়ার’ তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে সময় শরীরে ক্ষমতার চিহ্ন রেখে যায়।
কবিতার শেষ পংক্তি—
আর ফিরে আসবে না সেই মুখ, সেই বালিয়াড়ি।
এটি বার্গসনের ‘স্মৃতির স্থায়িত্ব’ তত্ত্বের বিপরীতে দাঁড় করানো এক ক্ষণস্থায়ী অভিজ্ঞতার সত্য।
কবি জানেন—প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি অসম্ভব; স্মৃতি থাকে, কিন্তু রূপ বদলে।
কবিতা তাই সময়ের নির্মমতা এবং স্মৃতির রূপান্তরকে একই সঙ্গে প্রকাশ করে।
চ. কাব্যভাষার সংকট : ‘কেবল ভেসে যাওয়া’ কবিতার প্রয়োগধর্মী বিশ্লেষণ
আশিস মিশ্রের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ কবিতাগুলির একটি এটি।
এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের রূপক ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছেন—পরিবেশ বদলায়, পৃথিবী বদলায়, কিন্তু কবির ভাষা বদলায় না।
কবি যখন দালি, ভ্যানগঘ, জীবনানন্দ—এই তিনটি সৃজনশীল নাম তুলে আনেন, তখন বোঝা যায়—নতুন শিল্পভাষা তৈরি করতে হলে ব্যক্তিত্বের গভীরতা ও ভাঙচুর প্রয়োজন।
কিন্তু সমকালীন শিল্পসৃষ্টিতে অনুকরণের আধিক্য—সেই পুনরাবৃত্তি—সেই রঙ—সেই স্রোত।
এ কবিতায় আশিস মিশ্র একপ্রকার নন্দন-রাজনৈতিক বক্তব্য রেখেছেন—যে সমাজে নতুন ভাষা তৈরি হয় না, সে সমাজ সৃজনশীলতার মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এই বক্তব্য আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্বের মূল সুর।
ছ. থিম্যাটিক আন্তঃসম্পর্ক : পাঁচ কবিতার কেন্দ্রীয় ধারণা
পাঁচটি কবিতার থিমকে জোড়া লাগালে দেখা যায়—
সেগুলি একই নদীর বিভিন্ন স্রোত।
১) আত্মচেতনা ও ব্যক্তির ভেতর-যাত্রা
‘কেন যাই’, ‘বসে থাকতে থাকতে’—এই দুই কবিতা মানুষের আত্ম-দর্শনের গভীরে প্রবেশ করে।
২) সময় ও পরিবর্তনের চিহ্ন
‘তিন বছর আগে’—সময়কে দেহ, প্রকৃতি ও স্মৃতির ভেতর চিহ্নিত করে।
৩) শিল্প-সংস্কৃতির সংকট
‘রাজার বাজার’—কবিতাহীনতার সমাজ চিত্র।
৪) ভাষার নতুন জন্মের প্রশ্ন
‘কেবল ভেসে যাওয়া’—নতুন কাব্যভাষার অভাবকে তুলে ধরে।
এই চারটি থিম মিলেই নির্মাণ করে—
এক সমকালীন মানবজীবনের সঙ্কট-সংলগ্ন কাব্যদর্শন।
জ. কাব্যভাষা ও শৈলী : শব্দ-সংযম ও ভাব-গভীরতার সম্পর্ক
আশিস মিশ্রের কাব্যভাষা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তিনি জটিল শব্দ ব্যবহার করেন না; কিন্তু প্রতিটি শব্দ ধারণাগত গভীরতা বহন করে।
শব্দসংযম—নবীন বাংলা কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা।
মিশ্রের ভাষা তিনটি স্তরে কাজ করে :
A/দ্যোতনামূলক—রূপক, প্রতীক, পুনরাবৃত্ত চিত্র
B/অন্তর্মুখী—দর্শন, প্রশ্ন, আত্মানুসন্ধান
C/সামাজিক—সমকালীন সংস্কৃতির পরিবর্তন
এই তিনটির সমন্বয় তাঁর কবিতাকে শুধু লিরিক নয়, বরং তাত্ত্বিক দ্যোতনাও দেয়।
ঝ. উপসংহার : পাঁচ কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
এই পাঁচটি কবিতা বাংলা সমকালীন কবিতার কিছু স্থায়ী প্রশ্নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—
* আমরা কাকে খুঁজি? কোথায় যাই?—ব্যক্তিগত আত্ম-দর্শন
* শিল্প কি আজ বাজারে অবান্তর?—সংস্কৃতির সংকট
* নতুন চোখ কীভাবে জন্মায়?—সৃজনশীলতার জন্ম
* সময় কীভাবে আমাদের বদলে দেয়?—দেহ, স্মৃতি ও প্রকৃতি
* কবিরা কি ভেসে যাচ্ছেন?—ভাষার নন্দনতাত্ত্বিক প্রশ্ন
আশিস মিশ্র এই প্রশ্নগুলিকে এক সরল অথচ শক্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন। তিনি বাংলা কবিতায় এমন এক কণ্ঠ, যা চুপচাপ হলেও ধারাল; নরম হলেও গভীর। তাঁর পাঁচটি কবিতা মিলে সমকালকে প্রশ্ন করে, স্মৃতিকে মূল্যায়ন করে, আর কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।
এই প্রবন্ধের আলোচনায় স্পষ্ট হয়—আশিস মিশ্রের কবিতা কেবল অনুভব নয়; এটি এক গভীর নন্দন ও দার্শনিক বোধের ফল, যা সমকালীন বাংলা কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
0 মন্তব্যসমূহ