E- দুইপাতা পত্রিকা
১০৯তম দ্বিতীয় সংখ্যা , ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
আত্মা শিখা মল্লিক
জানি না আত্মা আসবে কি না!
তবুও ফটোতে ফুলের মালা
প্লেটে সন্দেশ,কাচের গ্লাসে জল।
ধূপকাঠিও জ্বলছে
নিমেষেই ঘরটা জেগে উঠল
আমাদের নাকও হয়ে উঠল সচল
কিন্তু দূরে কাছে ডেকে উঠল না
একটিও কাক।
শুধু আত্মাই জানল.......
আত্মার আত্মীয় আত্মাই।
তাকেও খাতির করবে আত্মা, আত্মালোকে।
২.
আড্ডা ভেঙে যেতেই
আড্ডা ভেঙে যেতেই ভূতের চেহারা
সবাইকে অচেনা লাগে।
উত্তর -দক্ষিণ, পূর্ব -পশ্চিমমুখী হতে
পারলেই প্রাণে বেঁচে যায়।
এদিকে বহিরাগত বন্ধুদের মুখ.....
বেহাল রাস্তার দশা,কত চিহ্ন যুক্ত হয়
কত আঁকাবাঁকা নদী, জোনাকির আলোও
জ্বলে না চোখে!
অথচ একসঙ্গে ছবি তোলা
ছবির প্রচারও বেশ উত্তম কিন্তু
হৃদয়ের ম্যাপিং হলে,নিকষ কালো
পাথর খন্ডের রূপ।
৩.
আমার সিংহাসন
ওর প্রশস্ত বুকে ছিল আমার সিংহাসন
চাইনি নিজের করে নিতে।
বসলেই অছিলায় দিয়ে দিত সমস্ত
দায়িত্ব ভার।
ওদিকে মুখ লুকিয়ে কাঁদত নদী
মাঠঘাট জলাশয় অবশ্যই শ্যাওলামাখা।
আকাশে তারার সাথে কে বলত কথা
ইচ্ছেমতন ?
দূরবীনে অন্য গ্রহের সুলুকসন্ধান
হত না জানি !
জল খেয়ে উইঢিবি গলে গেলে
কে ধরত আমার হৃদয়ের হাল!
৪.
শুকনো তেজপাতা
তোমার ভালোবাসা পেতে চাই
শুকনো তেজপাতা।
জানি ভেতরে রেখেছ সুবাস।
পরীক্ষা নিচ্ছ কে ভেজায় নয়নের জলে।
আমি কী পারব আদরে সবুজ করে
জৌলুস দিতে !
নাকি আরও রূঢ় আচরণে পঞ্চত্বের দিকে ?
৫.
সময় নষ্ট নয়
সময় নষ্ট নয়।
এসো, ভরিয়ে ফেলি বাগান।
ঐখানে কি দেখছ না হাসছে মরুদ্যান ?
ঐখানে কি দেখছ না তৈরি হচ্ছে জলাশয়
আর ঝোপঝাড়
জোনাকির জন্ম হবে, আলোকিত হবে গ্রাম।
এসো, পুঁতে রাখি বাঁশগাছ
কিচিরমিচির আর শীতল বাতাস।
নদী জানে বলে বসে নেই বাজিয়ে চলেছে
হারমোনিয়াম।
তার জলে স্নান সেরে অনেকের রোগমুক্তি
আর বৌদ্ধিক জ্ঞান।
========================
শিখা মল্লিকের কবিতার আলোচনা।
পাঁচটি কবিতায় শিখা
মল্লিক যে ভাবনার-মহাকাশ নির্মাণ করেছেন, তা মূলত মানবমনের গভীর অভিজ্ঞতা,
হারানো-প্রাপ্তির দোলাচল, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং আত্মিকতার নানা পরতকে ছুঁয়ে যায়।
প্রতিটি কবিতা আলাদা বাস্তবতা থেকে উঠে এসে একক অভিজ্ঞানুভূতির ভিতর মিলেমিশে একটি
সামগ্রিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
১. আত্মা
প্রথম কবিতায় ‘আত্মা’র উপস্থিতি প্রতীকী—মৃত্যুস্মৃতি, আচার, অপেক্ষা আর
অনিশ্চয়তার মিলন। ফটোতে ফুলের মালা, সন্দেশ, জল—সবই মৃতকে স্মরণ করার প্রচলিত
নিদর্শন। কিন্তু কবি জানেন না আত্মা আসবে কি না—এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই কবিতার
সারবস্তু। ধূপকাঠির ধোঁয়া যেমন ঘর ভরিয়ে তোলে, তেমনি স্মৃতি ভরিয়ে তোলে মনকে।
কিন্তু কাক ডাকছে না—যা সাধারণত কোন সংকেত বা অশরীরী উপস্থিতির প্রতীক। শেষপর্যন্ত
কবিতা বলে, “আত্মার
আত্মীয় আত্মাই।”—বলা যায়, মৃত্যুর পর-পারলৌকিক সম্পর্কও স্বনির্ভর;
আত্মার প্রতি খাতির সেই আত্মালোকে। জীবিতের আচার হয়তো বাহ্যিক, কিন্তু আত্মার জগৎ
আলাদা।
২. আড্ডা ভেঙে যেতেই
এখানে সম্পর্কের সামাজিক মুখোশ আর বাস্তবতার ব্যবধান তৈরি হয়েছে গভীর বিদ্রূপে।
আড্ডায় সবাই পরিচিত, কিন্তু আড্ডা শেষ হলেই “ভূতের চেহারা”—অচেনা হয়ে ওঠা মুখ।
সমাজে মানুষ মুখ বদলায়, দিক বদলায়, সুবিধামতো অবস্থান নেয়—“উত্তর-দক্ষিণ,
পূর্ব-পশ্চিমমুখী”—এই রূপক তাই। বহিরাগত বন্ধুদের মুখও ক্লান্ত, যেমন বেহাল
রাস্তা, আঁকাবাঁকা নদী—সমাজের সমস্যা, দুর্নীতি, ক্লান্তি—সবই এতে ধরা পড়ে। অথচ
একসঙ্গে ছবি তোলা, তার প্রচার—সেই কৃত্রিম সুখের সংস্কৃতি। কিন্তু হৃদয়ের ম্যাপিং
করলে কালো পাথর—অর্থাৎ অন্তরে শুষ্কতা ও নিষ্ঠুরতা। এই কবিতা মানুষের দ্বিচারিতা
তুলে ধরে।
৩. আমার সিংহাসন
এটি একটি সম্পর্কভিত্তিক কবিতা—সম্ভবত প্রেম বা দাম্পত্যে সহমর্মিতা, নিরাপত্তা ও
নির্ভরতার অনুভূতি। “ওর প্রশস্ত বুকে ছিল আমার সিংহাসন”—একটি সুন্দর প্রতীক;
ভালোবাসাকে আশ্রয় এবং মর্যাদা উভয়ই দেখায়। কিন্তু বক্তা অধিকার চাননি—ভালোবাসার
স্বাধীনতা চেয়েছেন। সেই মানুষটি দায়িত্ব নিতে চাইলে কবি আসলে বোঝাতে চান—সেই
সম্পর্ক ছিল সমর্পণ ও আস্থার। কবিতায় নদী, মাঠঘাট, শ্যাওলা, তারা—এগুলো প্রকৃতির
উপমা হলেও সম্পর্কের আবেগগত রূপক হিসেবে ব্যবহৃত। শেষে উইঢিবি গলে যাওয়ার
উপমা—সংকটের মুহূর্তে কে সামলাবে হৃদয়ের হাল?—অর্থাৎ ভালোবাসার প্রকৃত শক্তি সংকটে
বোঝা যায়।
৪. শুকনো তেজপাতা
এই কবিতায় ভালোবাসার রূপক অনবদ্য। তেজপাতা শুকনো হলেও সুবাস ধরে রাখে—যেমন সম্পর্ক
ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার গভীর স্নেহের গন্ধ থাকে। প্রেমিক/প্রেমিকা প্রশ্ন করেন—তাঁর
ভালোবাসাকে কি আবার সবুজ করতে পারবেন? নাকি তা আরও কঠোর আচরণে পঞ্চত্বের দিকে
যাবে? এখানে প্রেমের পুনর্জাগরণ বনাম বিচ্ছেদের দোলাচল ফুটে উঠেছে। শুকনো পাতা
মানেই শেষ নয়; যত্ন দিলে তা আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে—এটাই কবিতার সৌন্দর্য।
৫. সময় নষ্ট নয়
এই কবিতায় মানবজীবন, সমাজ ও প্রকৃতিকে একমিলিয়ে এক পুনর্গঠনমূলক বার্তা আছে। বাগান
ভরানোর আহ্বান মানে নতুন করে সৃষ্টি করা, মরুদ্যান মানে আশার উত্থান। জলাশয়,
ঝোপঝাড়, জোনাকি—প্রকৃতির পুনর্জন্মকে ইঙ্গিত করে। বাঁশগাছ, শীতল বাতাস—গ্রামজীবনের
পবিত্র শান্তি। নদী হারমোনিয়াম বাজায়—অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই ছন্দ তোলে। নদীর জলে
রোগমুক্তি ও জ্ঞানের ইঙ্গিত—পুনশ্চধারা, পবিত্রতার প্রতীক। এই কবিতা মূলত
পুনর্নির্মাণ, আশাবাদ এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টির আমন্ত্রণ।
শিখা মল্লিকের কবিতাগুলো অনুভূতিনির্ভর,
প্রতীকসমৃদ্ধ এবং সমাজ-মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। মৃত্যু, সম্পর্ক,
দ্বিচারিতা, প্রেমের পুনর্জাগরণ এবং জীবনকে নতুন করে সাজানোর আহ্বান—এই পাঁচটি
কবিতা পাঁচটি চেনা মানসযাত্রাকে ভিন্ন ভিন্ন আলোকছটায় ফুটিয়ে তোলে। প্রতিটি কবিতায়
অন্তরের সরল অথচ সূক্ষ্ম বেদনা ও আশা একত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।
==========================
0 মন্তব্যসমূহ