E- দুইপাতা পত্রিকা
১০৯তম তৃতীয় সংখ্যা , ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
এক বসন্তে লেখা কবিতা
অজিত বাইরী
১
সাঁঝবাতির আলো
দুঃখের সাঁঝবাতি জ্বেলে বসে আছো;
বাইরে এসো।
উঠোনময় ছড়িয়ে পড়ুক আলো।
পড়শিজন আছে পাশাপাশি, কথা হোক এ-বাড়ি ও-বাড়ি।
লাউডগা লতিয়ে উঠেছে মাচানে,
ভারায় ঝুলছে ডুরে শাড়ি---
এইসব গার্হস্থ্য ছবি জীবনকে আজও করে নমনীয়।
ইচ্ছে করে, নিজ-হাতে পুঁতি দু'চার ঝাড় রজনীগন্ধা।
শত দুঃখের ফাঁকে বাতাস বয়ে আনুক সুগন্ধ।
কেন দুঃখ-কাতর মুখে বসে আছো?
বাইরে এসো।
উঠনময় ছড়িয়ে পড়ুক সাঁঝবাতির আলো।
২
আমাদের দিন, রাত
আমাদের সবদিন, সবরাত যায় না একরকম;
প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাতের চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন।
আজ যে সন্ধ্যা কাটালাম দুজনে সমুদ্র-সৈকতে,
একইরকম সন্ধ্যা আর ফিরবে না জীবনে।
নদীর পাড় ধরে যে বন্ধুর সঙ্গে হেঁটেছি গতসন্ধ্যায়,
তার সঙ্গে হয়তো দেখা হবে না পুনর্বার।
নিরন্তর বয়ে যাওয়া শুধু, এক ঢেউয়ের সঙ্গে মেলে না অন্যঢেউ।
৩
ভাবো
ভাবো, সেই রাতের কথা, যে রাতে
নক্ষত্ররা কথা বলে।
যে রাতে পাতার মর্মর ভাসিয়ে নিয়ে যায়
রাতের এক কিনার থেকে অন্য কিনারে।
আকাশ অনেক বড়,
কবির হৃদয় তার থেকেও বড়।
ভাবো, আকাশ নেমে এসেছে উঠোনে
আর সন্ধ্যাতারাটি জ্বলছে মাটির দাওয়ায়।
শূন্যের গভীরে যে কত ঢেউ, তারপরেও কত ঢেউ, ভাবো।
৪
নীরবতা
নীরব থাকো, নীরবতাও এক অনন্য শিল্প;
কবিতার দুই পঙক্তির মধ্যেকার বিরতির মতো।
কিংবা বসন্তের কোকিলের ডাক স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যেমন ফিরে ফিরে আসে।
নীরব থাকো, নীরবতাও কখনও কখনও অধিক বাঙ্ময়।
যখন সমুদ্রের তীরে বসো
কিংবা মুগ্ধ তাকিয়ে থাকো তুষারমৌলির দিকে
তখনও কত কথা বলো, নিরুচ্চার, ভাষাহীন।
৫
তুমি লেখ
উন্মুক্ত রাখো দরজা, দিগন্তের বাতাস আসুক।
লঘু বাতাস
চূর্ণ পাতা ছড়িয়ে দিক ঘরের মেঝেতে।
বিকেল নামুক পৃথিবীতে---মায়াবী বিকেল।
সন্ধ্যার আকাশে
সত্যের মতো ফুটুক একটি দুটি তারা।
তুমি লেখ,
জীবনকে লেখ।
=======================
অজিত বাইরী–র “এক বসন্তে লেখা
কবিতা” সংকলনের পাঁচটি কবিতার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হল—
প্রথম কবিতাটি আত্মসমর্পণ,
বিষণ্নতা ও পুনরুজ্জীবনের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। “দুঃখের সাঁঝবাতি জ্বেলে”
বসে থাকা মানুষের চিত্র আসলে হতাশাগ্রস্ত মনকে বোঝায়—যে নিজের আবদ্ধ অন্ধকার থেকে
বেরোতে পারছে না। কবি আহ্বান জানান—“বাইরে এসো”—এ যেন ভেতরের ক্লান্তি থেকে জীবনের
আলোয় ফিরে আসার ডাক। এখানে উঠোন, পড়শি, লাউডগা, ডুরে শাড়ি—এসব গ্রামীণ গার্হস্থ্য
উপকরণ জীবনের সহজ-নমনীয় রূপকে তুলে ধরে। প্রকৃতি ও সংসারের এই পরিচ্ছন্ন ছবি মনে করিয়ে
দেয় যে কঠিন দুঃখের ফাঁকেও জীবনের সৌন্দর্য আছে। রজনীগন্ধার ইচ্ছে, সুগন্ধি বাতাস
জীবনের সমবেদনা ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত। ফলে কবিতাটি দুঃখ থেকে আলোতে উত্তরণের একটি প্রতীকী
দৃশ্য নির্মাণ করে।
দ্বিতীয় কবিতাটি সময়ের
অবারিত গতি ও অভিজ্ঞতার অদ্বৈত প্রকৃতি নিয়ে লেখা। এখানে প্রতিটি দিন-রাতকে আলাদা
চরিত্রযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে—কোনো দিন-রাত একরকম থাকে না। সমুদ্র-সৈকতে কাটানো
একটি সন্ধ্যা, কিংবা বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অতিবাহিত সময়—এসব মুহূর্ত কখনও পুনরাবৃত্ত
হয় না। কবি বোঝাতে চান—জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অনন্য, অপরিবর্তনীয়। ঢেউয়ের উপমা
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—এক ঢেউয়ের সঙ্গে আরেক ঢেউয়ের মিল নেই, যেমন আমাদের অভিজ্ঞতাগুলির
সঙ্গে নিজেদেরই পূর্ব অভিজ্ঞতার মিল থাকে না। এই কবিতার মূল দার্শনিক বক্তব্য—অবধারিত
পরিবর্তনই জীবন; তাই মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরাই সত্যিকারের বোধ।
এই কবিতাটি কল্পনা,
বিস্ময় ও কবিমানসের উন্মোচন। “নক্ষত্ররা কথা বলে”—এ শুধু প্রকৃতির রূপক নয়, মানুষের
অন্তর্লোকের আলোড়নও বটে। পাতার মর্মর ধ্বনি যেন জীবনের স্রোত বয়ে নিয়ে যায় এক প্রান্ত
থেকে অন্য প্রান্তে। এখানে কবি আকাশ ও কবির হৃদয়ের তুলনা করে বলেন—হৃদয় আকাশের থেকেও
বড়, কারণ হৃদয়েই কল্পনা, স্বপ্ন ও অনুভূতির অনন্ত বিস্তার। আকাশ নেমে এসে উঠোনে বসা,
সন্ধ্যাতারার দাওয়ায় জ্বলে ওঠা—এসব প্রতীক মানুষ ও মহাবিশ্বের মেলবন্ধনের ইঙ্গিত।
শূন্যের গভীরে অসংখ্য ঢেউ—এ মহাজাগতিক অনুভূতি, মানুষের চেতনার অসীমতার উপমা। কবিতাটি
পাঠককে ধ্যানমগ্নতায় নিয়ে যায়।
চতুর্থ কবিতায় নীরবতাকে
এক গভীর ও শিল্পিত ভাষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কবি বলেন—নীরবতা শুধুই শব্দের অনুপস্থিতি
নয়; বরং দুই পঙ্ক্তির মধ্যে বিরতির মতো, যেখানে কথার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ লুকিয়ে
থাকে। কোকিলের বিরতিশীল ডাক, সমুদ্রের তীরে বসে থাকা, তুষারমৌলির দিকে তাকিয়ে থাকা—এসব
মুহূর্তে মানুষ অনেক কথা বলে, কিন্তু উচ্চারণহীনভাবে। কবিতাটি বোঝায়—অভিব্যক্তির সবচেয়ে
শক্তিশালী মাধ্যম কখনও কখনও নীরবতা। মানুষের গভীর অনুভূতি, মুগ্ধতা, শোক বা প্রার্থনা—এসবই
শব্দহীন যোগাযোগে প্রকাশ পায়। তাই নীরবতা এক বিশেষ শিল্প, যে শিল্প সবসময় শব্দের
ওপর নির্ভর করে না।
শেষ কবিতাটি সৃষ্টি,
মুক্তি ও জীবনের স্বরূপকে লিপিবদ্ধ করার ডাক। উন্মুক্ত দরজা, দিগন্তের বাতাস, লঘু বাতাসে
উড়ে যাওয়া পাতা—এসবই স্বাধীনতার ইঙ্গিত। পৃথিবীতে “মায়াবী বিকেল” নেমে আসে, আকাশে
সত্যের মতো ফুটে ওঠে তারা—এ যেন জীবনের নির্মলতা, সত্যতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। এই মুক্ত
প্রকৃতির ভেতরেই কবি আহ্বান করেন—“তুমি লেখ, জীবনকে লেখ।” লেখালিখি এখানে শুধু কবিতা
বা সাহিত্য নয়; জীবনের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, সংগ্রাম ও সৌন্দর্যকে লিপিবদ্ধ করার মানসিক
অনুপ্রেরণা। বাস্তবতা ও কল্পনার মিলনে জীবনকে নির্মাণ করার সৃজনশীল ডাক।
====================
0 মন্তব্যসমূহ