E- দুইপাতা পত্রিকা
১০৯তম পঞ্চম সংখ্যা , ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
ফুলটামঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
রোজ আমার বাগানে বিশেষ একটা ফুল ফোটে –
যেমন সুন্দর, তেমনই মিষ্টি, দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
কখনো সে ভোরের শিশির মেখে স্নাত, কখনো
সূর্যের আলোয় লালিমা-দীপ্ত, আপন দ্যুতি নিয়ে সে হাসে,
রঙ ঢালে, সুগন্ধ ছড়ায়, তার মেলে দেওয়া অপূর্ব
পাপড়ির সৌন্দর্যে চারপাশ ঝলমল করে উঠে।
কখনো সখনো তাকে অভিমানেও নুয়েপড়তে দেখি–
সব রূপেই সে অনবদ্য,সব সাজেই অপরূপা!
সারাদিন আমার দৃষ্টির মধ্যে থেকে আমাকে মুগ্ধ করে,
বিমোহিত করে, আমাকে আনন্দে মাতিয়ে রেখে বিকালে
সে বিবর্ণ, ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে – সে ঝরে যায়।
আশ্চর্য! পরের দিন আবার যথাসময়ে ফুলটা ফোটে –
একই মহিমা নিয়ে আগের দিনের মতোই উদভাসিত হয়,
রূপে-রসে-গন্ধে বর্ণময় করে তোলে।
আমার প্রতিদিনকার জীবনপথে ফুলটা যেন আমার
হৃদয়ের সাথি হয়ে পড়েছে, নিজের অজান্তে কখন যেন
তাকে ভালোও বেসে ফেলেছি।
অশেষ নির্মাণ
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
অসীম – অপার ভালোলাগা নিয়ে ছেয়ে থাকো সর্বক্ষণ,
তোমার ভালোবাসা আমার বুকের অতল গভীরে
এক অদ্ভুত লীলাকার্য চালায় - তুমি প্রতিনিয়ত আমার
মধ্যে নির্মাণ হতে থাকো।
তুমি আমার কাছে এতটাই সুন্দর আমার কোনো নির্মাণে
তুমি আর শেষ হও না, যেখানে শেষ করি পরক্ষণেই
সেখান থেকে আবার শুরু করতে হয় – আপন খেয়ালে
তোমাকে আমি নির্মাণ করেই চলি। বিনি সুতোর বাঁধন-
অথচ কি অসম্ভব শক্তি সে বাঁধনের।
মনের মধ্যে কখনো আত্মতুষ্টি আসে তোমাকে যেভাবে
গড়তে চেয়েছি সেভাবেই বুঝি গড়ে ফেলেছি, একটু
পরেই সেই মনই বাদ সাধে-কই কোথায় গড়লাম তোমাকে?
তোমার অনুপম সৌন্দর্য, অনবদ্য রূপলালিমাকে ভাষায়
নির্মাণ করি এ তো আমার সাধ্যাতীত, তাই তোমাকে নির্মাণ
করতেই থাকি এক সুন্দর থেকে আরো কোনো সুন্দরের টানে।
আনন্দলোকের মোহানা
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
তোমার বুকের থেকে খসে পড়ে উড়নি-
এক অলৌকিক রূপমাধুরী আমার
চোখের সামনে প্রতিভাত হয়।
ভালোবাসার প্রজাপতিটা কানে কানে বলে-
এই রূপলাবণ্য কেবল তোমার প্রাণভরে
দেখে নাও।
আমার পাগল মন এই তোমাকে পাবার
জন্য ব্যাকুল ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে জাগে,
বুকের ভিতর নাচানাচি করতে থাকে
প্রেমের পাখিটা।
অনুপম এক স্বপ্ন আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে
যায় আনন্দলোকের মোহনায়-
তোমার দিকে।
চিরসুন্দর
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
তুমি চিরযৌবনবতী, তুমি অপরূপা
চিরসুন্দরী – তুমি চিরউত্তাল সমুদ্র
ঢেউ, তুমি চিরনবীন ভালোবাসাময়।
তুমি চিরসবুজ উদার আকাশ মন,
তুমি চিরভালোবাসা ধন, চিরকালের
নিত্য সহচর, অরূপ মাণিক রতন।
তুমি বুকের ভিতরে চিরবহমান,
নতুন কথার ছন্দে-সুরে চিরকালের
গান, তুমি চিরস্বপ্ন – চোখের পাতায়
নিত্য বৃষ্টিস্নান।
তুমি চিররূপকথার গল্প, চিরকুসুমের
ঘ্রাণ, তুমি চিরপ্রেমগাথা, চিরআলোকিত প্রাণ।
ডানা মেলেছি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
ভালোবাসার আকাশে ডানা মেলে
দিয়েছি তোমার হৃদয় ছোঁব বলে,
তোমার রাঙা দুটি ঠোঁটের রেণু
মাখব বলে।
ভালোবাসার আকাশে ডানা মেলেছি
তোমার বুকের মোহময় উপত্যকায়
নিভৃতে খেলা করবো বলে, তোমার
নীল শাড়ির আঁচলে মুখ ঢাকব
বলে।
ভালোবাসার আকাশে ডানা মেলেছি
তোমার শরীর নদীর জলে ডুব-
সাঁতার কাটবো বলে, মহানন্দে নিজেকে
সিক্ত করবো বলে।
ভালোবাসার আকাশে ডানা মেলেছি
তোমার চোখের তারায় স্বপ্ন আঁকব
বলে, তোমাকে নিয়ে খুশির জোয়ারে নাও ভাসাব বলে।
=====================================
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতির প্রেম-নান্দনিকতা : পাঁচ কবিতার সমালোচনামূলক আলোচনা
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতির এই পাঁচটি কবিতায় কবির কল্পনা, প্রেমানুভূতি, রূপবোধ ও রোমান্টিক নান্দনিকতার যে বিস্তার পাওয়া যায়, তা একদিকে ব্যক্তিগত আবেশে আবদ্ধ হলেও অন্যদিকে সার্বজনীন মানবিক অনুভূতিকে স্পর্শ করে। কবিতাগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে নিরন্তর সৌন্দর্য-অন্বেষণ, রূপের পুনরাবিষ্কার, এবং প্রেমিকের মনোজাগতিক উন্মোচন। এ সমস্ত কবিতায় ভালোবাসা কেবল অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং এক চিরনির্মাণশীল সৃষ্টিপ্রক্রিয়া, যা কবিকে প্রতিদিন নতুন করে রচনা করে, আবার ভেঙে দেয়।
‘ফুলটা’ কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতির প্রতীকী সম্পর্ক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে। ফুলের দৈনন্দিন বিকাশ–উদ্ভাসন–ম্রিয়মাণতা–পতনে কবি প্রেমের ক্ষণস্থায়ী অথচ পুনর্জাগ্রত সত্যকে ধরেছেন। প্রতিদিন ঝরে গিয়ে আবার নতুন করে ফোটার ঘটনাটি প্রিয়জনের উপস্থিতির মতোই—অলৌকিক, নবীন, এবং অবিনশ্বর আকর্ষণে ভরপুর। এই কবিতায় প্রেমিকার রূপকে ফুলের নিত্যনবীকরণ মানসিকতার সঙ্গে মেলানো হয়েছে, যা কবির আবেগের পুনরাবৃত্তি এবং পুনরুজ্জীবনকে নির্দেশ করে।
এর বিপরীতে ‘অশেষ নির্মাণ’ কবিতায় প্রেমকে দেখা যায় এক অন্তর্মুখী সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে। এখানে কবি যেন আত্মার ভেতরেই প্রিয়জনকে নির্মাণ করে চলেছেন—এক অনন্ত কাজ, যার কোনো শেষ নেই। কবির ভাষায় “বিনি সুতোর বাঁধন”—এই প্রকাশটি প্রেমের অদৃশ্য অথচ দৃঢ় বন্ধনকে অনন্যভাবে তুলে ধরে। প্রিয়জনের সৌন্দর্যকে ভাষায় প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতা থেকেই আবার নতুন করে তাকে নির্মাণের চেষ্টা—এই প্রক্রিয়াটি কবিকে সৃষ্টিশীলতার এক অপরাহ্ণে দাঁড় করায়।
‘আনন্দলোকের মোহানা’ কবিতায় প্রেমের অনুভূতি আরও বেশি শারীরিক ও ইন্দ্রিয়প্রবণ হয়ে ওঠে। উড়নি খসে পড়ার দৃশ্য, বুক থেকে উঠে আসা রূপমাধুরী, প্রেমিক হৃদয়ের ব্যাকুলতা—সব মিলিয়ে কবি প্রিয়জনকে উপলব্ধি করছেন দেহগন্ধে, স্পর্শে, স্বপ্নে। এখানে প্রেম এক প্রবাহমান নদীর মতো, যা তাকে টেনে নিয়ে যায় “আনন্দলোকের মোহনায়”—অর্থাৎ রূপ-রসের চরম পরিতৃপ্তির রাজ্যে।
‘চিরসুন্দর’ কবিতায় প্রিয়জনের রূপ ধারণ করে রূপকন্যা, সমুদ্রঢেউ, সবুজ আকাশ, বৃষ্টিস্নাত স্বপ্ন—এমন নানা প্রতীক। এই কবিতাটি মূলত আর্শীবাদমূলক স্তোত্রের মতো। এখানে প্রেমের আধার প্রিয়জনকে সময়ের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে কালজয়ী রূপ দেওয়া হয়েছে—চিরযৌবনবতী, চিরনবীন, চিরউত্তাল। কবির নান্দনিক দৃষ্টি প্রিয়জনকে এক সর্বজাগতিক সৌন্দর্যের প্রতীকে রূপান্তরিত করে।
শেষ কবিতা ‘ডানা মেলেছি’—এ কবি প্রেমকে আকাশ-বিস্তৃত স্বাধীনতার মতো দেখিয়েছেন। এখানে প্রেমিক যেন পাখির মতো উড়ে গিয়ে প্রিয়জনের হৃদয়, ঠোঁট, বুকের উপত্যকা, শরীর নদী—এ সবকিছুর কাছে পৌঁছতে চায়। এই কবিতায় দৃশ্যকল্পগুলি অত্যন্ত সংবেদনময়, কখনো প্রণয়মত্ত, কখনো আত্মসমর্পণের সুরে পূর্ণ।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এই পাঁচটি কবিতায় মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি অত্যন্ত সরল, স্বচ্ছ, মধুর ভাষায় প্রেমের বহুমাত্রিক রূপ—আবেগ, রূপ, স্পর্শ, প্রকৃতি, আকুলতা, সৌন্দর্য, এবং চিরনির্মাণ—সব দিকই তুলে ধরেছেন। কবিতাগুলোর মূল শক্তি তাদের চিত্রকল্পের দীপ্তি, ভাষার কোমলতা, এবং অনুভূতির অকপটতা। তাঁর কবিতা পাঠকের মনে প্রেমের সেই চিরন্তন স্পন্দনটি জাগিয়ে তোলে—যা প্রতিদিন নতুন করে ফোটে, নির্মিত হয়, এবং আবার সীমাহীন আনন্দলোকের দিকে ডেকে নেয়।
========================
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি
গ্রাম-রাজবল্লভপুর
পোস্ট-মালবান্দি
জেলা-পশ্চিম মেদিনীপুর
পিন-৭২১১২৭
0 মন্তব্যসমূহ