E-দুইপাতা পত্রিকা
১১৩তম প্রথম সংখ্যা, ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
শঙ্খশুভ্র পাত্র-র পাঁচটি কবিতা
প্রথমেই তুমি, স্বীকার করেছ৷ আমিও মিত্রবোধে
হাতে-হাত রাখি— যেখানে নির্জনতা হয়ে ওঠে গান...
আমি সে ওষ্ঠের দিকে পুনরায় সূর্যোদয়—
জবাকুসুমসংকাশ৷ চোখ মেলি৷
ফল-ফুল-লতা-পাতাময় সে এক আশ্চর্য ছাদবাগান...
স্পর্শ
কিছুই তো হয় না৷ না সে গয়নানৌকো—
না সে ময়না, টিয়ে পাখি!
তবে রাখি৷ ভূমিতলে আমার সমস্ত ভাবুকতা৷
অস্তরাগের দৃশ্যে সমূহ বিরাগ একাকার৷
রঙের বৈচিত্র্য— গোধূলিকে ডেকে আনে৷
তোমার আঁধারকুন্তলে কতশত কুন্দ-তারা!
জ্যোৎস্নার অপেক্ষা নেই৷
কিছুই তো হয় না৷ তবু, মনটিকে ছুঁয়ে থাকি তার...
বাদল
নীরবতার মধ্যেই আছে তৃষ্ণা— সেই
প্রার্থিত শব্দ৷
জলের আল্পনা কীভাবে গোপন করবে?
কল্পনাকে রক্ষা করো৷ তার পর অথই নির্মাণ...
সুনিবিড় নীড়ের প্রত্যাশা—পাখিদল
সাতটি তারার তিমির, দ্যাখো, মেঘের ডানায়
নেমেছে বাদল...
চই চই
দেখা তো হবেই, ওই একা-একা, অবাধ্য রেখায়...
তরুচ্ছায়া করুণশঙ্খের মতো সম্পর্কে নিবিড়৷
কী জানে কীসের টানে অভিমানে এত কথা!
অবরেসবরে দিঘি, সে-ই ভালো৷ আলোজল৷
হুঁস তো ফেরে না৷ সন্ধ্যা আবছায়া৷ নৌকোর ছই৷
আমিও ফিরিব গৃহে— যখন হাঁসের দল—
হাওয়ায় জেগেছে 'চই
চই'...
মুদ্রণ প্রমাদ
সাক্ষাৎ সমুদ্র, এ-ছাড়াও মুদ্রণযোগ্য আছে কিছু৷
সব কি ধরতে পারি৷ ঝাউ-ডালে চাঁদ
তোমার আঁকার খাতায় বিস্তর হাসে৷
পাঠশালায় চুপিচুপি দেখেছি তো! স্বপ্নে, কুপি জ্বেলে৷
সে অনেক আগের স্মৃতি৷ তথাগত— যে-রকম
কবিতায় অন্ধ হয়ে বসে থাকে মুদ্রণ প্রমাদ৷
====0===0===0====
শঙ্খশুভ্র পাত্রের কবিতা: ব্যাখ্যা
শঙ্খশুভ্র পাত্রের কবিতাগুলি তার স্নিগ্ধ
ভাবনা, ভাষার সূক্ষ্মতা এবং জীবনবোধের গভীরতা দিয়ে পাঠককে এক নতুন দৃষ্টিতে ব্যস্ত
করে তোলে। তার কবিতার বিশেষত্ব হল সেগুলি এক দিকে স্বতন্ত্র, অন্যদিকে প্রতীকী এবং
গূঢ়। যেহেতু তিনি নিজেকে প্রকৃতি, অনুভূতি এবং জীবনের একেবারে অন্তর্নিহিত
বিষয়গুলির মধ্যে ডুবিয়ে দেন, তাই কবিতাগুলি শুধু অনুভবের স্তরে নয়, চিন্তার স্তরেও
পাঠককে এক বিশাল আকাশে নিয়ে যায়।
ছাদবাগান কবিতাটি প্রথমেই পাঠককে নিজের
মধ্যে নিমগ্ন করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা রাখে। এখানে ছাদবাগানের মাধ্যমে যেটি উঠে
আসে, তা হল মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতার সঙ্গে প্রকৃতির একাত্মতা। "আমি সে
ওষ্ঠের দিকে পুনরায় সূর্যোদয়"—এই বোধটি কবিতায় নতুন করে একটি গূঢ় অর্থ সৃষ্টি
করে। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি যেমন প্রতিদিন সূর্যোদয়ে নতুন হয়ে ওঠে,
তেমনি মানুষও তার সম্পর্কের মধ্যে অজানা প্রগতি অর্জন করতে পারে। ছাদবাগানটি, যার
প্রতিটি ফল, ফুল, লতা এবং পাতা মিশে আছে, মানব জীবনের নিঃসঙ্গতা এবং সংশয়ের মধ্যেও
কীভাবে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়, সেটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্দেশ করে।
স্পর্শ কবিতায় কবি আরও জটিল, কারণ এখানে
শঙ্খশুভ্র পাত্র ব্যক্তি ও অনুভূতির সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রকাশ করেন। "কিছুই
তো হয় না"—এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা একটি পরিণত রূপকে সামনে নিয়ে আসে, যা সম্ভবত
মানব মনকে ধরা দেয়, যেখানে কিছু চিরস্থায়ী পরিবর্তন হয় না, কিন্তু তবুও মন সেই
অভ্যন্তরীণ ছোঁয়ার মধ্যে লুকানো অনুভূতির কাছে ফিরে আসে। কবি রঙের বৈচিত্র্য এবং
আঁধারের আলোকে ঘিরে মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার মধ্যে বেঁধে দেন, যে-রকম একটি মেঘমুক্ত
আকাশে চাঁদের আলো এসে পড়ে।
বাদল কবিতায় প্রকৃতি এবং মানুষের
মিথস্ক্রিয়া আরো জোরালো হয়ে ওঠে। এখানে "জলের আল্পনা" এবং "মেঘের
ডানায় নেমেছে বাদল"—এমন একটি ছবি ফুটে ওঠে যা প্রকৃতির খেলা ও মানবের
অভ্যন্তরীণ কল্পনাকে একত্র করে। বাদল আসে, কিন্তু তার আগমনও যেন স্বপ্নের মতো এক
অব্যক্ত প্রার্থনার প্রতিফলন। কবিতাটি মনোভাবের গভীরতার মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে,
যেখানে পাঠক বুঝতে পারে, প্রকৃতির ঘটনাবলি একে অপরের সাথে সম্পর্কিত, এবং একে একে
মিলিত হয়ে সৃষ্টির ধারাবাহিকতা তৈরি করে।
চই চই কবিতায় শঙ্খশুভ্র পাত্র
প্রাকৃতিক শব্দের চমৎকার ব্যবহার করেছেন, যেমন “চই চই”, যা সৃষ্টির সঙ্গীত এবং
সময়ের কুহককে ইঙ্গিত দেয়। “হাঁসের দল—হাওয়ায় জেগেছে 'চই চই'...” এখানে কবি অবাধ্য
সময়ের শব্দরূপকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন, যা জীবনের এক বিচিত্র ও গভীর পথচলার ইঙ্গিত
দেয়। এটি সম্পর্কের অজানা টানাপোড়েন এবং নিজস্বতার প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা
প্রকাশ করে।
মুদ্রণ প্রমাদ কবিতায় পাঠককে একটি রূপক জগতে
নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে "মুদ্রণযোগ্য" কথাটি এক অর্থে মনের গভীরতম
অনুভূতিগুলির প্রকাশের প্রতি ইঙ্গিত দেয়, যেখানে শব্দের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থের
সীমাহীনতা ক্রমশ বৈপরীত্য তৈরি করে। “ঝাউ-ডালে চাঁদ তোমার আঁকার খাতায় বিস্তর হাসে”—এটি
এক অলংকারমূলক চিত্রকল্প, যা প্রকৃতির খ্যাতি, স্মৃতি এবং মানুষের শৈল্পিক চেতনার
দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে চিত্রিত করে। "মুদ্রণ প্রমাদ" শব্দবন্ধটি কবিতায়
যেমন সৃষ্টির গ্লানি বা ভুলের দিকে ইঙ্গিত করে, তেমনি এটি শিল্পের শুদ্ধতা ও
ব্যর্থতার মাঝে এক ধ্রুব অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়।
শঙ্খশুভ্র পাত্রের কবিতাগুলি গভীরতর
অনুভূতি এবং স্বতন্ত্র শৈলীর জন্য বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, জীবন
এবং সম্পর্কের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সেতু নির্মিত হয়, যা পাঠককে এক গভীর
অন্তর্নিহিত জগতে প্রবাহিত করে। তার ভাষার নিপুণতা, শব্দের পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্বাচন
এবং সৃষ্টির সূক্ষ্মতা তার কবিতাকে বিশেষ করে তোলে। শঙ্খশুভ্র পাত্রের এই
কবিতাগুলি মানব জীবনের অগণিত দিককে প্রতিফলিত করার ক্ষেত্রে এক অনন্য মাধুর্য
সৃষ্টি করে।

0 মন্তব্যসমূহ