E-দুইপাতা পত্রিকা
১১৫তম দ্বিতীয় সংখ্যা, ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
সৌমিত বসুর পাঁচটি কবিতা
জীবন এক আশ্চর্য দূরবিন
সত্যের পাশে যারা বসতে চেয়েছে
লিখি তাহাদেরও কথা।
প্রেমিক স্বভাব নিয়ে
যারা আজও স্বপ্ন থেকে খিদে পেড়ে খায়
তারাও কিভাবে আজ
উড়ে আসে কলমের নিবে।
আমি চতুর্ভূজ, সারাদিন ঘুরে ঘুরে কান্না শেখাই
হাত ধ'রে পার করি চাঁদের এপিঠে জ্বলা উঁচু নিচু আলো।
একা হতে গিয়ে
নিবে গেছে যেসব ধুনুচি
গুগগুল ছড়িয়ে তাকে
কিকরে বাঁচিয়ে রাখি বলো?
২.
হারানো পথের ভয়
আকাশ ফুঁড়ে হয়ে গেছে অপরূপ বৃষ্টি
ধানখেতের ভেতর দিয়ে যে নক্ষত্রটি
পথ চিনিয়ে নিয়ে এলো
সেই কি আমার গতজন্মের ভাই ?
অথবা ডোরাকাটা মেয়েটির বালি ।
দাঁত দিয়ে আস্তে আস্তে চিনতে শিখলাম
ব্লাউজের ফিতে , হুকের গোলকধাঁধা ;
মৃত্যু তখনো দেখি দূরে , অপেক্ষায় ।
অবজ্ঞার দেশ , আর যেন এখানে না জন্মাই ।
৩.
ডুবজল
দড়িতে সার দিয়ে বসে আছে আত্মহত্যা
যেন নিহত হলেই সমস্ত সমাধান
ভেসে যাবে পুকুরের জলে।
এতকাল বর্শা নিয়ে
যারা জঙ্গল তোলপাড় করেছে
তারাও ঘাসে রক্ত মুছে
চুপিসারে নেমে গেছে স্নানে।
প্রথম দৃশ্য শেষে নিভে যাওয়া আলো
মঞ্চের ওপর সে একা।খুব একা।
যতক্ষণ অন্ধকার সে ভেবে চলে
আত্মহত্যারা ভাইবোন হাত ধরাধরি করে কোথায় চলেছে?
৪.
পথ
পথ বলে কিছু নেই
যে কোন যাত্রাকেই আমি পথ বলে মানি।
যে নরম ত্বক বেয়ে অশ্রু নেমে আসে, কিংবা ক্ষত বেয়ে টপটপ নেমে
আসে রক্তদাগ
পথ বলে সেসব কি লেখা আছে ইতিহাস জুড়ে?
সিল্ক রুটে র চেয়ে তারাও কি কম অর্থবহ?
আমি সারাদিন সেইসব পথ খুঁজে মরি।
সন্ধ্যা হলে বেড়ালটি পাশে এসে বসে ,
বোঝায় আমাকে
কতোপথ লুকোনো রয়েছে তার থাবার ভেতর।
যাই, খুঁজি।
৫.
জন্মান্তর
যতবার ভেবেছি
এবার ঘৃণা লজ্জা পাবে
ততবার ঘৃণা
নতুন ঘৃণা দেখে হেসে উঠেছে।
আমরা কখনো কখনো কাউকে
পয়সা নিয়ে নদী পার করে দেই।
আমরা কখনো কখনো
আতসকাঁচ দিয়ে
ঘৃণা পড়ে ফেলার চেষ্টা করি।
আমাদের চাওয়া পাওয়ার পাশে
মুখ নিচু করে বসে থাকে বিবেক।
কাউকে না জানিয়ে
আমরা ভেতরে ভেতরে
মৃত্যু পড়ে ফেলি।
=================তিনটি কবিতা আলোচিত
সৌমিত বসুর কবিতাগুলো অস্তিত্বের সংকট, একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক দহনের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। তাঁর লেখনীতে ফুটে ওঠে মানুষের অসহায়তা এবং একই সঙ্গে উত্তরণের আকুতি।
১. জীবন এক আশ্চর্য দূরবিন: দৃষ্টি ও যন্ত্রণার বিস্তার
প্রথম
কবিতায় কবি নিজেকে এক 'চতুর্ভূজ' সত্তা হিসেবে দেখছেন, যার কাজ কান্নার শিক্ষা
দেওয়া এবং চাঁদের রুক্ষ আলোয় মানুষকে পথ দেখানো। এই কবিতার মেজাজ অনেকখানি পোলিশ
কবি উইস্লাভা সিমবরস্কা (Wislawa Szymborska)-র মতো। সিমবরস্কা যেমন সাধারণ
তুচ্ছ জিনিসের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কে (Wonder) খুঁজে পান, সৌমিত বসুও তেমনি
'স্বপ্ন থেকে খিদে পেড়ে খাওয়া' মানুষদের কলমের নিবে ঠাঁই দিচ্ছেন।
- বিশ্লেষণ: কবি এখানে একাধারে দ্রষ্টা এবং পথপ্রদর্শক। ‘ধুনুচি’ এবং ‘গুগগুল’
ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি আমাদের ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিকতার অনুষঙ্গ এনেছেন।
জীবন যখন ‘নিভে যাওয়া’ ধুনুচির মতো স্তিমিত, কবি তখন তাকে বাঁচিয়ে রাখার
দায়ভার নিচ্ছেন।
- বিদেশী অনুষঙ্গ: জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে (Rainer
Maria Rilke) তাঁর Letters to a Young Poet-এ লিখেছিলেন যে- কবির
কাজ হল একাকীত্বকে রক্ষা করা। সৌমিতের কবিতাতেও সেই একা হয়ে যাওয়া
মানুষগুলোকে আগলে রাখার এক গভীর আর্তি আছে।
২. হারানো পথের ভয়: শরীর ও বিচ্ছেদের হাহাকার
দ্বিতীয়
কবিতাটিতে এক ধরণের জাগতিক স্মৃতিকাতরতা এবং মৃত্যুর শীতল হাতছানি পরিষ্কার।
বৃষ্টির শব্দ, ধানখেত আর নক্ষত্রের মাঝে কবি খুঁজে পেতে চান এক হারানো আত্মীয়তা।
- বিশ্লেষণ: “দাঁত দিয়ে আস্তে আস্তে চিনতে শিখলাম / ব্লাউজের ফিতে, হুকের
গোলকধাঁধা”—এই পংক্তিটি শরীরের কামনার চেয়েও অস্তিত্বের এক বিভ্রান্তি এবং
পরক্ষণেই মৃত্যুর উপস্থিতিকে তীব্র করে তোলে। কাম ও মৃত্যু (Eros and
Thanatos) এখানে সমান্তরাল।
- বিদেশী অনুষঙ্গ: এই কবিতার শেষ লাইন—"অবজ্ঞার দেশ, আর যেন
এখানে না জন্মাই"—আমাদের মনে করিয়ে দেয় রুশ কবি আন্না আখমাতোভা (Anna
Akhmatova)-র কথা। আখমাতোভা যেমন নিজের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক
যন্ত্রণার মাঝেই দেশাত্মবোধ এবং বিতৃষ্ণার এক টানাপোড়েনে ভুগতেন, এখানেও কবির
অভিমান তেমনি তীব্র। আবার, মৃত্যু এবং শরীরের এই দ্বৈরথ অনেকটা ফরাসি কবি শার্ল
বোদলেয়ার (Charles Baudelaire)-এর কবিতার কথা মনে করায়, যেখানে
সৌন্দর্যের অন্তরালে মৃত্যু সর্বদা ওত পেতে থাকে।
৩. জন্মান্তর: ঘৃণার অবিনশ্বরতা ও বিবেকের নীরবতা
তৃতীয়
কবিতাটি সবচেয়ে বেশি দার্শনিক এবং নৈরাশ্যের সুরবাহী। ঘৃণা কেন লজ্জিত হয় না বরং
নতুন ঘৃণাকে দেখে হাসে—এই প্রশ্নটি আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য।
- বিশ্লেষণ: কবি দেখিয়েছেন মানুষ হিসেবে আমরা কতটা খণ্ডিত। একদিকে আমরা 'পয়সা
নিয়ে নদী পার করে দেই' (অর্থাৎ জাগতিক আদান-প্রদান), অন্যদিকে আমাদের ‘বিবেক’
মুখ নিচু করে বসে থাকে। ‘আতসকাঁচ দিয়ে ঘৃণা পড়া’ একটি অসাধারণ চিত্রকল্প, যা
আমাদের সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধির অসাড়তাকে বিদ্রূপ করে।
- বিদেশী অনুষঙ্গ: আইরিশ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটস (W. B. Yeats)
তাঁর ‘The Second Coming’ কবিতায় লিখেছিলেন, "The best lack all
conviction, while the worst / Are full of passionate intensity." কবিতায় বিবেক মুখ নিচু করে থাকা মানেই সেই ‘The best’ এর
নীরবতা, যা ঘৃণাকে আস্কারা দেয়। আবার, ভেতরে ভেতরে 'মৃত্যু পড়ে ফেলা' অনেকটা টি.
এস. এলিয়ট (T. S. Eliot)-এর ‘The Hollow Men’ কবিতার মতো—যেখানে জীবনের
শূন্যতা মৃত্যুকে অনেক বেশি সহজলভ্য করে তোলে।
মূল্যায়ন
সৌমিত বসুর এই কবিতা ত্রয়ী একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করে। প্রথম কবিতাটি যদি হয় সহমর্মিতার
(Empathy), তবে দ্বিতীয়টি অভিমানের (Resentment) এবং তৃতীয়টি উপলব্ধির
(Realization)। তিনি কেবল বাংলা ভাষার কবি নন, তিনি আধুনিক মানুষের সেই
সার্বজনীন কণ্ঠস্বর, যা একই সঙ্গে চাঁদের আলোয় পথ হাঁটতে চায় আবার পৃথিবীর ঘৃণায়
বিদীর্ণ হয়।
এই
কবিতাগুলো আমাদের শেখায় যে, জীবন নামক দূরবিন দিয়ে আমরা যেমন নক্ষত্র দেখি, তেমনি
নিজেদের ভেতরের অন্ধকারকেও চিনে নিতে হয়। বিদেশী কবিদের মতোই সৌমিত বসুর এই
উচ্চারণগুলো দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের চিরন্তন দুঃখ ও আশাবাদের দলিল হয়ে
ওঠে।
=============================
আলোচনা পড়ে কমেন্ট করুন Plz

0 মন্তব্যসমূহ