E-দুইপাতা পত্রিকা ১১৫তম প্রথম সংখ্যা, ২০২৫ সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

 E-দুপাতা ত্রিকা

১১৫তম প্রথম সংখ্যা, ২০২৫

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com


নীলোৎপল জানার দুটি কবিতা

সরু দড়ির উপর জীবন

------------------

সরু দড়ির উপর পা রেখে খেলা দেখায় সেই কুমারী,

নীচে জমে থাকে জনতার ভিড়,

চোখ দুটো তীক্ষ্ণ ক্ষুধার মতন।

তারা তাকিয়ে থাকে তার স্তনের দিকে, দড়ি নয়—

তখন আরো সরু হয়ে যায় পৃথিবী, তার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে কাঁপে জীবন,

কিন্তু হাসি লেগে থাকে ঠোঁটে, কারণ হাসলেই রুটি জোটে।

লোকজন হাততালি দেয়, তবু চোখের তলায় লুকিয়ে থাকে শিকারির নখ।

সে জানে—এই শহরে শরীরই মুদ্রা,

আর আত্মা? তা খেলা ঘরের ধুলোয় হারিয়ে গেছে অনেক আগেই।

 তবু সে হাঁটে, বাঁচার জেদ নিয়ে,

কারণ জীবনের দড়ি যত সরু হয়, আশা ততই দৃঢ় হয়ে ওঠে।

 ২.  

রঙ্গিলা বাউল 

------------------------

বুকে বাঁধা দোতারার তারে আজ জেগে ওঠে প্রতিরোধের সুর।

স্তন বাউল রোদ্দুরে নাচে, ভিতরে আগুন, বাইরে বিস্ময়।

কেউ ছুঁতে পারবে না—শরীর নয়, আত্মাই আমার অবিনাশী ঘর।

ধর্ষকের ছায়া ভাঙা সেতু মাত্র, তার ওপারেই আলো ঝলকায়।

রক্তে লেখা বিদ্রোহের জ্বালা আজ বজ্রের মতো কাঁপিয়ে দেয় আকাশ।

চিৎকারের বদলে নীরবতার পাহাড় গড়ে তুলেছি বুকের ভেতর।

আমি শিকার নই, আর কারও ভয়ের অবলম্বন নই।

পৃথিবী যদি দহনে জ্বলে ওঠে, আমিই হব বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা।

মুক্তির গান গাইব, গলার রক্তে লিখব নতুন ভাষা।

যে হাত অত্যাচার করে, সেই হাতেই ভাঙবে তার শিকল।

বেঁচে থাকার অধিকার আমার—রোদ্দুরের মতো নির্ভীক।

ধর্ষণ নয়, মুক্তিই আজ আমার একমাত্র তান।

 ==================

বিদেশি কবিতার সঙ্গে  তুলনামূলক আলোচনা

কবিতা :
১. “সরু দড়ির উপর জীবন”
২.
“রঙ্গিলা বাউল”

   বিশ্বসাহিত্যিক তুলনা : পাবলো নেরুদা, সিলভিয়া প্লাথ, মায়া অ্যাঞ্জেলু ও নাজিম হিকমত বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক কবিতা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার প্রবণতায় সমৃদ্ধ। আলোচ্য দুইটি কবিতায় নারীর শরীর, অস্তিত্ব ও মুক্তির প্রশ্ন যে ভাবে উঠে এসেছে, তা ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী কবিতা ও লাতিন আমেরিকান–আফ্রিকান নারীবাদী কবিতার ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এই আলোচনায় কবিতাদ্বয়কে বিশ্বসাহিত্যের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য কবির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করে দেখা হবে।

 

“সরু দড়ির উপর জীবন” ও সিলভিয়া প্লাথ

“সরু দড়ির উপর জীবন” কবিতাটির কেন্দ্রে রয়েছে এক নারীর অস্তিত্বসংগ্রাম—যেখানে সে প্রতিনিয়ত দর্শকের দৃষ্টির শিকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন কবি সিলভিয়া প্লাথ–এর কবিতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, বিশেষ করে “Lady Lazarus” বা “The Applicant”–এ নারীর দেহকে সমাজ যেভাবে প্রদর্শন ও ভোগের বস্তু করে তোলে, তার সঙ্গে। এই কবিতায়—

                                               “হাসলেই রুটি জোটে”

পঙ্‌ক্তিটি প্লাথের মতোই নির্মম বাস্তবতাকে সরাসরি তুলে ধরে। নারী এখানে প্রতিবাদ করে না, কিন্তু আত্মসমর্পণও করে না। এই নীরব সহনশীলতা ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী কবিদের—বিশেষত পল সেলান বা আলবার কামুর দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে মানুষ অর্থহীনতার মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা করে।

 

“সরু দড়ি” প্রতীক ও নাজিম হিকমত

কবিতার “সরু দড়ি” প্রতীকটি তুর্কি কবি নাজিম হিকমত–এর কবিতায় পাওয়া জীবনসংগ্রামের রূপকের সঙ্গে তুলনীয়। হিকমতের কবিতায় মানুষ ইতিহাস ও রাষ্ট্রশক্তির মাঝে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। এখানেও নারী জানে—এক পা ভুল মানেই পতন, তবু সে হাঁটে। আশা এখানে ক্ষীণ, কিন্তু অনিবার্য।

 

“রঙ্গিলা বাউল” ও মায়া অ্যাঞ্জেলু

“রঙ্গিলা বাউল” কবিতাটি একেবারে ভিন্ন সুরে কথা বলে। এই কবিতার নারী সরাসরি ঘোষণা করে—

                   “আমি শিকার নই”
এই উচ্চারণ মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ কবি মায়া অ্যাঞ্জেলু–র “Still I Rise” কবিতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অ্যাঞ্জেলুর মতোই এখানে নিপীড়িত নারী নিজেকে নতুন ভাষায় সংজ্ঞায়িত করে—ভয়ের নয়, শক্তির ভাষায়।

বৃষ্টি, বজ্র, আলো—এইসব প্রতীক বিশ্বসাহিত্যে মুক্তি ও পুনর্জন্মের চিহ্ন। মায়া অ্যাঞ্জেলু যেমন বলেন—“You may kill me with your hatefulness, but still, like air, I’ll rise”, তেমনি “রঙ্গিলা বাউল”-এর নারী বলে—পৃথিবী জ্বললে সে হবে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা।

 

পাবলো নেরুদা ও শরীর-রাজনীতি

চিলির কবি পাবলো নেরুদা–র কবিতায় শরীর কেবল প্রেমের নয়, রাজনৈতিক অস্তিত্বেরও প্রতীক। “রঙ্গিলা বাউল”-এ শরীর আর ভোগের বস্তু নয়—এটি প্রতিবাদের ভাষা। “গলার রক্তে লিখবো নতুন ভাষা”—এই চিত্রকল্প নেরুদার বিপ্লবী কবিতার আবেগ ও উচ্চারণের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

      * তুলনামূলক সারাংশ

দিক

'সরু দড়ির উপর জীবন'

    'রঙ্গিলা বাউল'

বিশ্বসাহিত্যিক সাযুজ্য

সিলভিয়া প্লাথ, নাজিম হিকমত

   মায়া অ্যাঞ্জেলু, পাবলো       নেরুদা

দৃষ্টিভঙ্গি

অস্তিত্ববাদী, পর্যবেক্ষণমূলক

   নারীবাদী, প্রতিবাদী

নারীচরিত্র

নীরব সহিষ্ণু

   ঘোষণামুখর যোদ্ধা

আশার রূপ

টিকে থাকা

   মুক্তি ও পরিবর্তন

 

    বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বলা যায়, “সরু দড়ির উপর জীবন” মানব অস্তিত্বের নীরব ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরে, আর “রঙ্গিলা বাউল” সেই ট্র্যাজেডির জবাবে উঠে আসা বিদ্রোহী কণ্ঠ। সিলভিয়া প্লাথ থেকে মায়া অ্যাঞ্জেলু পর্যন্ত যে কাব্যধারা বিশ্বসাহিত্যে গড়ে উঠেছে, এই দুই কবিতা সেই ধারারই দুই বিপরীত কিন্তু পরিপূরক স্বর—একটি ক্ষতের গভীরতা দেখায়, অন্যটি আরোগ্যের সাহস জোগায়।

 ========================

পেজটি ফলো করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ