E-দুইপাতা পত্রিকা
১১১তম চতুর্থ সংখ্যা, ২০২৫
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
বরুণকুমার চক্রবর্তীর কবিতা
চঞ্চল
সমুদ্র যখন উতল বাতাসে চঞ্চল
ঢেউ আর ঢেউ, কিছুই দৃশ্যমান নয় অতলে
খড়কুটোর মতো পাক খাই।
স্থির হলে ঝষির মতো অখণ্ড জল
জলের মধ্যে দেখা মেলে কান্তিময় আকাশ
আর খোদাই করা বালির নম্র যাপন ।
তুমি চঞ্চল ঢেউ এখন
দেখতে পাচ্ছো না
জলমগ্ন বর্ণিল আকাশ।
আমি অন্তরদগ্ধ ভাস্কর।
এক নদী সুখ
পৃথিবীর অন্যতম সুখী একজন আমি, হিংসা শব্দটির সাথে সখ্যতা হল না
প্রতারণার তুলিতে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় সফল না হয়ে
আঁচল ভিজাল যে কান্নায়, তার খোঁজ নিতে পারিনি নিরাপদ সময়ে।
পাওয়া না পাওয়ার খতিয়ান থাক, বুকের মধ্যে বয়ে চলা নদীতে সাঁতার
কাটি
শুধু দিতে হয়, পৃথিবীর অন্যতম সুখী একজন আমি।
আহ্বান
ডেকেছে, হয়তো শুনতে পাইনি
হয়তো ডাকবে, না শুনলেও মিসড কল দেখতে পাব।
একটাই নির্দেশ, ' এবার এসো
অনেক তো হলো '
রতিকান্তের কলারবোনের নীচে
ডান অলিন্দে
যত্নে পেসমেকার সন্নিবেশ
খড়ম খুলে মার্বেলের ঠাণ্ডা মেঝেতে আমি প্রস্তুত
সপ্তপর্ণীর তীব্র সুবাস শীত ডেকে আনে
নীরবতা খোঁজে প্রমিত উচ্চারণ।
=============================
বরুণকুমার চক্রবর্তীর তিনটি কবিতা—“চঞ্চল”,
“এক নদী সুখ”, এবং “আহ্বান”—নিয়ে আলোচনা উপস্থাপন করা হল:
বরুণকুমার চক্রবর্তী তাঁর কবিতায় মানুষের অন্তর্জগত,
আবেগের দোলাচল এবং অস্তিত্বের শান্ত–অশান্ত গতি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেন। “চঞ্চল”
কবিতায় তিনি সমুদ্রের উত্তাল রূপকে ব্যবহার করেছেন মানুষের অস্থির মনস্তত্ত্বের
রূপক হিসেবে। ঢেউয়ের পর ঢেউ যখন চোখের সামনে সবকিছু আড়াল করে দেয়, তখন কবি
ইঙ্গিত করেন এমন এক মানসিক অবস্থার দিকে, যেখানে উপলব্ধি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
কিন্তু সমুদ্র স্থির হলে জলের আয়নায় যে আকাশ ও বালির খোদাই ফুটে ওঠে, তা
প্রস্তাব করে—শান্তি ফিরে এলে জীবনের সত্যিকারের দৃশ্যপটই ধরা দেয়। শেষ লাইনে “আমি
অন্তরদগ্ধ ভাস্কর”—এই স্বীকারোক্তি কবির নিজের সৃষ্টিশীল যন্ত্রণা ও উপলব্ধির
গভীরতাকে সামনে আনে।
দ্বিতীয় কবিতা “এক নদী সুখ” এক ধরনের
দার্শনিক উচ্ছ্বাস বহন করে। কবি নিজেকে পৃথিবীর “অন্যতম সুখী” বলে ঘোষণা করলেও সেই
সুখের ভিতর লুকিয়ে আছে মানবিক সীমাবদ্ধতা, ব্যর্থতা, এমনকি অনুশোচনার ছায়া। তিনি
স্বীকার করেন তিনি হয়তো কারও কান্নার খোঁজ নিতে পারেননি, কিন্তু তবুও বুকের ভেতর
বয়ে চলা এক “নদীতে” সাঁতার কেটে চলেন। এই নদী আসলে দানশীলতার, সহজ-সরল মানবিক
আনন্দের; যেখানে পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাব ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কবিতাটি জীবনের
পরিপূর্ণতার এক নিরাভরণ দর্শন তুলে ধরে।
তৃতীয় কবিতা “আহ্বান” মৃত্যু বা
জীবনান্তরের ডাকে সাড়া দেওয়ার এক অন্তর্মুখী প্রস্তুতির কথা বলে। ডাক আসছে—শোনা
হোক বা না হোক—এটি নিশ্চিত এবং অপরিহার্য। রতিকান্তের বুকে পেসমেকারের উল্লেখ
শারীরিক ভঙ্গুরতার বাস্তব দিকটিকে ছুঁয়ে যায়। খড়ম খুলে মার্বেলের ঠাণ্ডা মেঝেতে
দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি জীবনের শেষ যাত্রার প্রস্তুতিকে প্রতীকীভাবে ধরে। আর
“সপ্তপর্ণীর তীব্র সুবাস” শীত কিংবা নীরবতার সঙ্গে মিশে মৃত্যু-সম্ভাব্য শান্তিকে
সামনে আনে।
এই তিনটি কবিতা মিলিয়ে মানবমনের অস্থিরতা, সুখের
অন্তর্নিহিত নদী এবং জীবনের চূড়ান্ত আহ্বান—এই তিন স্তরে মানুষের অস্তিত্বকে
গভীরভাবে অনুসন্ধান করে।
===================
ঘাটাল ।।
0 মন্তব্যসমূহ