E-দুইপাতা পত্রিকা
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
১১৮তম ২য় সংখ্যা ২০২৬
duiipatalokpathpatrika78@gmail.com

অসীম ভুঁইয়ার গুচ্ছকবিতা
বিরহ
দুটো কান্না জুড়ে দিলে
একটি পরিখা নির্মিত হয়
যার অতলে ডুবে থাকে বিচ্ছেদের সুর
যে মানচিত্র বৃত্তাকারে ভাষা পায়
তার কাছে শুদ্ধ থাকে
মাথুর-বিরহ
একদিন পরিখার জল শীতল হতে থাকে
পড়ে থাকে নীরবতা
আর ওই নীরবতা অনূদিত হয়ে
ভেসে ওঠে-
একটি শৈল পাহাড়।
২.
অক্ষর-লিপি
শূন্যতা এক বিতশ্রী রাত
দুটো অভিমানের বিচ্ছেদ-রেখা
অথবা-
ভগ্ন-সেতু।
সেতুর এক পাড়ে চিতার আগুন দগদগে
অন্য পাড়ে মোচড় দেওয়া ধোঁয়া...
যেন অলিখিত মৃত্যু-গাথা
একদিন নদীটি বয়ে যাবে
আত্মগত
বুকে তার সূর্যাস্তের নীল রং
ঢলে পড়বে
শ্মশান সংগীত হয়ে
পড়ে থাকবে ক্ষয়িত চাঁদের মতো
স্মৃতিরেখা
আর-
দগ্ধতায় ভরা নীরব কালো অক্ষর-লিপি।
৩.
পাথর
যতটা সময় নিঃস্ব হলে তোমাকে গড়তে
পারি
ভাস্কর্যে -
কলঙ্কের সৌন্দর্য তার চেয়ে ঢের
বেশি অতলান্ত
নিভে যাওয়া নক্ষত্রের ওপারে যে
ভুলগুলি
উন্মুখ হয়ে আছে
তারা কেউ-ই অভিশপ্ত নয়।
তবু-
এক যন্ত্রণা আর ভালোবাসার পরিমাপে
প্রতিটি মুহূর্ত দুস্থ হতে থাকে
তোমার প্রথাগত আশ্বাস আর সহজলভ্য
বিশ্বাসের
মাঝে-
যে সেতুটি ক্ষয় পেতে থাকে
তাকে দংশনের গল্প শোনানো বৃথা
সে তো সমস্ত পারাবারের ভূমিকল্পে
কবেই পাথর হয়ে আছে।
===========================
অসীম ভুঁইয়ার ১টি কবিতার আলোচনা
অসীম ভুঁইয়ার কবিতা ‘বিরহ’ আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও এর ভাবগভীরতা, চিত্রকল্প ও দার্শনিক বিস্তার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কবিতাটিকে পাশ্চাত্য কবিতার অনুসঙ্গ ও চিত্রকল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করলে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক ইউরোপীয় কবিতার সঙ্গে এর বহু সাযুজ্য ধরা পড়ে।
প্রথমেই চোখে পড়ে কবিতাটির রূপক ও বিমূর্ত চিত্রকল্প। “দুটো কান্না জুড়ে দিলে / একটি পরিখা নির্মিত হয়”—এই পঙ্ক্তি পাশ্চাত্য আধুনিক কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়: আবেগকে দৃশ্যমান স্থাপত্যে রূপান্তর। টি. এস. এলিয়টের objective correlative ধারণার মতোই এখানে বিরহ বা বেদনার সরাসরি বর্ণনা নয়, বরং “পরিখা” নামক একটি প্রতীকী নির্মাণের মাধ্যমে অনুভূতিকে মূর্ত করা হয়েছে। পাশ্চাত্য কবিতায় যেমন যুদ্ধ, পরিখা, ধ্বংসস্তূপ মানব-অভিজ্ঞতার সংকেত হয়ে ওঠে, তেমনি এখানে পরিখা বিচ্ছেদের গভীরতা ও অতিক্রমণ-অযোগ্য দূরত্বের প্রতীক।
“যার অতলে ডুবে থাকে বিচ্ছেদের সুর”—এই পঙ্ক্তিতে শব্দের সংগীতধর্মিতা পাশ্চাত্য প্রতীকবাদী কবিদের (যেমন বোদলেয়ার বা মালার্মে) প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। সুর এখানে শ্রাব্য নয়, মানসিক; এটি অন্তর্গত যন্ত্রণার অনুরণন। প্রতীকবাদী কবিতার মতোই অর্থ সরাসরি নয়, অনুভবযোগ্য।
দ্বিতীয় স্তবকে “মানচিত্র” ও “বৃত্তাকারে ভাষা পাওয়া” প্রসঙ্গটি পাশ্চাত্য দার্শনিক কবিতার স্মৃতি জাগায়। আধুনিক কবিতায় মানচিত্র প্রায়ই স্মৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের রূপক। বৃত্তাকারতা সময়ের চক্রাকার ধারণার সঙ্গে যুক্ত, যা টেড হিউজ বা ইয়েটসের কবিতায়ও দেখা যায়। এখানে “মাথুর-বিরহ” শব্দবন্ধটি ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে এলেও তার উপস্থাপন পাশ্চাত্য আধুনিকতার মতো—লোকবিশ্বাস নয়, বরং এক বিমূর্ত মানসিক ভূগোল।
তৃতীয় অংশে “পরিখার জল শীতল হতে থাকে / পড়ে থাকে নীরবতা”—এই নীরবতা বিশেষভাবে পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদী কবিতার অনুসঙ্গ বহন করে। স্যামুয়েল বেকেট বা পল সেলানের লেখায় যেমন নীরবতা অর্থহীনতা, অবসাদ ও শূন্যতার প্রতীক, তেমনি এখানেও বিরহের চূড়ান্ত পর্যায়ে শব্দ হারিয়ে যায়। আবেগ জমাট বেঁধে ‘শীতল’ হয়ে ওঠে।
শেষাংশে “নীরবতা অনুদিত হয়ে / ভেসে ওঠে—একটি শৈল পাহাড়”—এই রূপকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাশ্চাত্য কবিতায় পাহাড় বা শৈল প্রায়ই স্থায়িত্ব, ভার ও অনড়তার প্রতীক। রিলকে বা ফ্রস্টের কবিতায় প্রকৃতি মানব-অভিজ্ঞতার কঠিন সত্য বহন করে। এখানে নীরবতা অনুবাদিত হয়ে পাহাড়ে রূপ নেয়—অর্থাৎ অনুভূতি ভাষা হারিয়ে প্রকৃতির এক অনড় প্রতীকে পরিণত হয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, অসীম ভুঁইয়ার ‘বিরহ’ কবিতাটি ভারতীয় আবেগভূমি থেকে জন্ম নিলেও এর নির্মাণ, প্রতীক, নীরবতার ব্যবহার ও বিমূর্ততা পাশ্চাত্য আধুনিক ও প্রতীকবাদী কবিতার সঙ্গে গভীর সংলাপে যুক্ত। এই সংলাপই কবিতাটিকে সমকালীন ও আন্তঃসাংস্কৃতিক তাৎপর্য দান করেছে।
---------------------------------------------------
আলোচক: সম্পাদক
0 মন্তব্যসমূহ