E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২০তম প্রথম সংখ্যা ২০২৬

E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২০তম প্রথম সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com

=================================================

 

প্রশান্তশেখর ভৌমিক এর গুচ্ছকবিতা

অরূপ

 

তখন মধ্যরাতের সিম্ফনি... আশেপাশে কেউ নেই

আমার আমিকে নগ্ন দেখেছি দশাসই দর্পণে।

সারাটা দিনের রুজিরোজগেরে পাপের পশরাগুলো

দয়ামায়াহীন দানবের রূপ ধরে নিকেশ করেছে

কৃপাপ্রার্থীর কাকুতি-মিনতি চোখের জলের ধারা।

কিছু কানাকড়ি দিতে পারতাম হেঁপো ভিখিরির হাতে,

নিদেনপক্ষে অন্ধবুড়ি মায়ের দুটো হাত ধরে

পথের ওপারে নিয়ে যেতে তো পারতাম।

দামী চুরুটের ধোঁয়া হাওয়ায় ছড়িয়ে রাজপথ ধরে

একা চলে গেছি যদিও ছিল না জরুরি কাজের তাড়া।

 

এখন মধ্যরাতের তর্জমা, আমি বেয়াব্রু দশাসই দর্পণে।

হঠাৎ মনে হয় আমার পিছনে মুখ টিপে হাসছে কেউ!

পিছু ফিরে দেখি আমারই অন্তর্গত আমি লজ্জায় ঘৃণায়

দু'হাতে ছাইমাখা কালো মুখ ঢেকেও ঢাকতে পারছে না।

 

শ্রুতি

 

সেইসব দিনগুলি ঢলে পড়ছে গত দিনের দিকে

সেইসব কথাফুল শুকিয়ে খসখসে হা-মুখ

স্মৃতি-কাতরতায় লিখে রাখি বাঙ্ময় আহত সকাল।

সেই গ্রাম, অমলিন ধুলো, স্তনশুভ্র মেঘ, দুধ-শাদা ভোরের উঠোন

মন্ত্রমুগ্ধের মতো হা-হা করে ওঠে দশ দিগন্ত।

ওড়ে জোড়ের পাখিরা— দিনরাত্রি কাবার করা যুবক-যুবতীরা

কথার টোটো বাজাচ্ছে ডবডবা, হায় হায় প্রমিত কথার বান্ধবনগরে

আজ শীতে জবুথবু। শোনা গান অশ্রুত হয়ে যাচ্ছে রোজ

তবুও তোমার গানে গলা মেলায় সলজ্জ আদর।

 

ডাকাডাকি

 

এত ডাকি এত সাধাসাধি অস্তিত্বের সংকট

সাড়া নেই নিরুত্তর শুধু চরাচরে আকীর্ণ মর্কট।

 

এত স্নেহ এত নীল প্রজন্ম প্রচ্ছদ পাখির উপমা

শুনশান রাস্তা হাঁটে করজোড়ে চেয়ে নেয় ক্ষমা।

 

তবু তার এত রাখ-ঢাক অন্যতর বিলাস বৈভব

চোখের গন্ধ দিয়ে চেনা বেঁধে রাখি অক্ষরের স্তব।

 

রোজ রোজ ভাঙা-গড়া, খেলায় চলে অন্তর প্রদাহ

যাও তবে অন্য পথে, যাও অন্য স্রোত উতল প্রবাহ।

 

অকাতর বৃষ্টি ভেজা রাত মায়া-মোহ ত্রিকাল সঙ্গম

ভেঙে ফেলি, চুরমার শাদা পাতা, উন্মাদের স্থাবর-জঙ্গম।

 

চেনা

 

পথের পাশের অতিথি বিলক্ষণ চেনে আমায়

আমিও বুঝি তাদের ভাষা

এতকাল হেঁটেছি পাশাপাশি

শুধু শব্দ দিয়ে জব্দ করেছ আমায়।

বিনিময় নয়, ভিখারির প্রত্যাশী হয়ে

শুধু চোখের ঝাপট খেয়েছি বারংবার

ইশারার আদি-অন্ত শিখতে শিখতে

আটপৌরে শাড়ি হাঁটুতে নিমজ্জিত।

তবুও শেখা হল না চোখের ভাষা

ভিড়ের ভেতরে থেকেও

চেয়ে থাকি তোমার ইশারায়।

============================0==============

প্রাচ্য কবিতার অনুসঙ্গে  প্রশান্তশেখর ভৌমিকের ১টি কবিতা আলোচনা---

   প্রশান্তশেখর ভৌমিকের ১টি কবিতা ‘অরূপ’ মূলত আত্মসমালোচনা, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও অন্তর্গত মানবসত্তার বিচারের এক গভীর কাব্যিক দলিল। প্রাচ্য কবিতার ধ্যানধারণার সঙ্গে এর সংযোগ স্পষ্ট—বিশেষত আত্মঅনুসন্ধান, কর্মফল ও বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়ানোর দার্শনিক প্রবণতায়।

   কবিতার শুরুতেই “মধ্যরাতের সিম্ফনি” এক প্রতীকী সময়চিহ্ন—যেখানে বাহ্য জগত নিস্তব্ধ, আর অন্তর্জগৎ প্রবলভাবে সচল। “দশাসই দর্পণ”-এ নিজের ‘আমি’-কে নগ্ন দেখার অভিজ্ঞতা আসলে আত্মপরিচয়ের নির্মম উন্মোচন। এখানে দর্পণ প্রাচ্য দর্শনের আত্মদর্শনের প্রতীক; যা শুধু মুখ নয়, কর্ম ও অপরাধকেও প্রতিফলিত করে। কবি দিনের “রুজিরোজগেরে পাপের পশরা”র কথা বলে জীবনের যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতার দিকে ইঙ্গিত করেন—যেখানে মানবিক সহানুভূতি উপেক্ষিত হয়।

   ভিখিরি ও অন্ধবুড়ি মায়ের প্রসঙ্গ করুণা ও দায়িত্ববোধের ব্যর্থতাকে সামনে আনে। কবির আক্ষেপ—চাইলেই তিনি সাহায্য করতে পারতেন, কিন্তু করেননি—এটি প্রাচ্য নৈতিকতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: কর্ম না করারও কি পাপ হয়? দামী চুরুটের ধোঁয়া ও রাজপথ ধরে একা চলে যাওয়া ভোগবাদী উদাসীনতার প্রতীক।

    কবিতার দ্বিতীয় অংশে আত্মদ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। “আমারই অন্তর্গত আমি” প্রাচ্য দর্শনের আত্মবিভাজনের ধারণাকে স্মরণ করায়—বাহ্য ‘আমি’ ও অন্তর্গত বিবেকসত্তার সংঘর্ষ। ছাইমাখা কালো মুখ লজ্জা, ঘৃণা ও পাপবোধের চিহ্ন। এখানে কোনো বাইরের শাস্তি নেই; শাস্তি আসে আত্মবিচার থেকে—যা প্রাচ্য কবিতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

    সার্বিকভাবে, ‘অরূপ’ আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক অনুশোচনার মাধ্যমে আধুনিক জীবনের মানবিক সংকটকে প্রাচ্য দার্শনিক আবহে গভীরভাবে উন্মোচিত করে।

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ