E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২০তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

 E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২০তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com

===============================



কবিতা সামন্তের গুচ্ছকবিতা

১.

পৃথিবীর ভীষণ জ্বর

 

"কোলাহল ভরা পৃথিবীর

ভীষণ জ্বর...

 

অন্ধকারে ধেয়ে আসে তীব্র ঝড়,

যত ঘুম জড়িয়ে আসে ক্লান্তির বেশে।

 

মনে হয় চুপ করে

বসে পড়ি তারাদের দেশে"।

২.

যন্ত্রণা

 

সাবমেরিনের মতো লুকিয়ে

রয়েছে আত্মঘাতী।

 

একসমুদ্র জল

উপচে পড়ছে উপকূলে

সে-জল যে অপেয়

একথা কারোর অজানা নয়।

 

তবুও সবাই ছুটে যায়...

তবুও কেন একাকিত্বের গান শোনায়!

 

শুধু বালিচর বোঝে বুকের যন্ত্রণা।

৩.

শ্বাপদ

 

গনগনে আগুনের আঁচ ছোঁয়াছে

রোগের আবেশ।

 

আমাদের সীমিত

উঠোন জুড়ে পেস্টিসাইড।

 

কুয়াশার ভেতর অচেনা শ্বাপদ

কার ভেতর শ্বাস ফেলছে!

 

তুমি, আমি,আমরা

কাকে চিহ্নিত করব এবার!

৪.

জেগে ওঠো

 

শোক করার অবকাশ পেলনা মাঠ...

ফসল তুলতে ব‍্যস্ত কৃষক।

 

অনাচার করে গেল কেবলই!

 

ঋতুচক্রের চক্রান্ত চলছে।

 

বেণু হাতে ঠিক কখন যেন

চক্রধারী হয়ে উঠেছিল সুবোধ কৃষ্ণ!

 

জেগে ওঠো তন্বী...

জেগে ওঠো মাঠ...

জেগে ওঠো মৃত্তকা।

 

উপকূল জুড়ে ফেনাদের বুঁদবুঁদ

৫.

ভণ্ড

 

শত শত মন্দির

গড়ে ওঠছে দিকে দিকে।

 

অভাব কেবল

নিষ্ঠাবান বৈষ্ণবের সেবায়িতের।

 

দান দক্ষিণার ব‍্যবসা রমরমা বাজার।

দেব সম্পত্তি ভাগাভাগিতে

মাথা ফাটিয়ে মরে ভণ্ড পূজারী।

 

দিন দিন বৈমুখ হয়ে পড়ছে দেবতারা।

শূন্য মন্দিরে দেবতা নিরুদ্দেশ।

=============================================

    কবিতা সামন্তের “পৃথিবীর ভীষণ জ্বর” কবিতাটির আলোচনা।

   কবিতা সামন্তের “পৃথিবীর ভীষণ জ্বর” কবিতাটি পাশ্চাত্য আধুনিক কবিতার ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে সংলগ্ন। কবিতাটিতে যে নগরজীবনের কোলাহল, মানসিক ক্লান্তি, অস্তিত্বগত অবসাদ ও অন্তর্মুখী পালানোর আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে—তা পাশ্চাত্য আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কবিতার পরিচিত সুর।

   প্রথমেই লক্ষণীয়, “কোলাহল ভরা পৃথিবীর / ভীষণ জ্বর”—এই চিত্রকল্পটি। এখানে পৃথিবীকে একটি অসুস্থ শরীর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা টি. এস. এলিয়টের The Waste Land-এর অসুস্থ সভ্যতার ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। আধুনিক পাশ্চাত্য কবিতায় সভ্যতা প্রায়ই ক্লান্ত, বিপর্যস্ত ও অর্থহীন রূপে উপস্থিত হয়—এই কবিতাতেও সেই মানসিক আবহ বিদ্যমান।

   “অন্ধকারে ধেয়ে আসে তীব্র ঝড়” পঙ্‌ক্তিটি পাশ্চাত্য কবিতার প্রতীকী ভাষার কথা স্মরণ করায়। এখানে ঝড় কেবল প্রকৃতির নয়, মানসিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রতীক—যেমন ডিলান থমাস বা ইয়েটসের কবিতায় ঝড় পরিবর্তন ও ভাঙনের সংকেত বহন করে। আবার ঘুম ও ক্লান্তি-র উল্লেখ ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বপ্রভাবিত পাশ্চাত্য সাহিত্যের ছায়া বহন করে, যেখানে অবচেতন মন ও মানসিক অবসাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

   সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পঙ্‌ক্তি—“মনে হয় চুপ করে / বসে পড়ি তারাদের দেশে”। এই পলায়ন-বাসনা পাশ্চাত্য রোমান্টিক ও আধুনিক কবিতার একটি কেন্দ্রীয় প্রবণতা। কিটসের নৈঃশব্দ্যপ্রেম কিংবা এলিয়টের নির্বাণ-অন্বেষণের মতোই এখানে বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে, এক বিমূর্ত শান্তির জগতে আশ্রয় নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়।

   সার্বিকভাবে, কবিতাটি চিত্রকল্প, প্রতীক, অস্তিত্ববাদী বোধ ও নিঃসঙ্গতার মাধ্যমে পাশ্চাত্য আধুনিক কবিতার ভাবধারাকে আত্মস্থ করে একটি সংবেদনশীল, অন্তর্মুখী কবিতার রূপ লাভ করেছে।








একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ