E-দুইপাতা পত্রিকা
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
১২০তম তৃতীয় সংখ্যা ২০২৬
duiipatalokpathpatrika78@gmail.com
বিদ্যুৎ মিশ্রের গুচ্ছকবিতা
১.
নদী জানে
সেই আদিম যুগ ধরে আবহমান বয়ে আসা নদী
সে জানে কত কান্না লেখা হয় পাথরের ভাঁজে।
আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পরে যখন
আবার একটা ইতিহাস লেখা হবে
সেইদিনেও মানুষ রাস্তায় ভিড় করে
কবিতা লিখবে
তারমাঝে সুনীল আকাশের দিকে চেয়ে
একটা ক্ষ্যাপাটে গোছের লোক
সাদা কাগজে আঁকিবুঁকি কেটে
ভাসিয়ে দেবে নদীর জলে।
নদী জানে সব কিছু নীরবে সয়ে যেতে
নদী জানে মৃত সম্পর্কের কোন শেকড় থাকে না।
২.
উপোষী সংযম
রাত ভোর বৃষ্টি, ওপারে নদীর গর্জন
তোমাকে দেবো কিছু মনখারাপের গল্প।
প্রবল ঝড় ঝঞ্ঝা আর আমার পরিত্যক্ত স্বপ্নগুলি ।
দুরন্ত ঢেউ খেলানো সমুদ্রের পানি, একঝাঁক চড়ুই -
আর পড়ন্ত বিকেলের রোদ।
তোমাকে দেবো চরম কয়েকটি কবিতার পংক্তি
আমার বারবার হেরে যাওয়া
আমার মৃত্যুর আগে তোমার শেষ অবহেলা
ভোরের শিশির স্নাত বর্ণাঢ্য হনন অনাবশ্যক সান্তনা
তোমাকে দেবো আমার উত্তাল করা রাত।
একবুক চাঁদ নিয়ে আমার উপোষী সংযম।
৩.
ব্যাকুলতা
নীরবে যেটুকু দিয়ে গেছো তুমি
সেটাই বা কম কিসে,কেন জানাবো
কী ক্ষতি হল? আমার এই মারণ বিষে।
লালন করেছি যে ক্ষয় রোগ
কী নিদারুণ পরিণাম; চুকিয়ে দেব মান
সব লেন-দেন, মিটিয়ে দেবো দাম।
তবু থেকে যাবো কবিতার ছন্দে
নয়তো অবহেলায়,ভালোবেসে
আজও মানুষ কতখানি দাম পায়?
সব হারিয়ে কালের নিয়মে
স্বপ্ন পুড়ে হয় ছাই। ঠিক শুনেছ
কিছু মানুষের আপন বলে কেউ নাই।
বসন্ত আসে শীত চলে যায় গ্রীষ্ম-বর্ষা
সবাই আপন মনে।ঢেউ তুলে যায়
সাগর যেমন আজও ঝাউয়ের বনে।
শুধু থেকে যায় আপোস বিহীন
কথার উপর কথা, আমি তুমি আর
ভোরের আলো অহেতুক ব্যাকুলতা।
-------------------------------
নিচে বিদ্যুৎ মিশ্রের “উপোষী সংযম” কবিতাটি আলোচনা করা হল—
বিদ্যুৎ মিশ্রের “উপোষী সংযম” কবিতাটি আধুনিক বাংলা কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যেখানে পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদ ও অস্তিত্ববাদী চেতনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। কবিতাটির মূল সুর ব্যক্তিগত বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও অন্তর্গত শূন্যতা—যা টি.এস. এলিয়ট, এজরা পাউন্ড কিংবা সিলভিয়া প্লাথের কবিতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
পাশ্চাত্য আধুনিক কবিতার মতোই এখানে প্রকৃতি আর মানবমনের সম্পর্ক সরল নয়; বরং প্রতীকী ও ভাঙাচোরা। “রাত ভোর বৃষ্টি”, “নদীর গর্জন”, “দুরন্ত ঢেউ খেলানো সমুদ্রের পানি”—এই সব চিত্র প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি কবির অস্থির মানসিক অবস্থার বহিঃপ্রকাশ। এলিয়টের The Waste Land-এর মতোই প্রকৃতি এখানে মানসিক বিপর্যয়ের প্রতিধ্বনি।
কবিতাটিতে প্রেম একটি পূর্ণতা নয়, বরং অনুপস্থিতি। “আমার মৃত্যুর আগে তোমার শেষ অবহেলা” পংক্তিটি পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদী দর্শনের মতো জীবনের অর্থহীনতা ও সম্পর্কের ভঙ্গুরতাকে নির্দেশ করে। মানুষের একাকিত্ব, বারবার হেরে যাওয়ার বোধ, এবং অর্থহীন সান্তনার প্রত্যাখ্যান—সব মিলিয়ে এটি এক গভীর existential crisis-এর কবিতা।
“উপোষী সংযম” শিরোনামটিও পাশ্চাত্য আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এখানে উপোষ মানে কেবল খাদ্যবর্জন নয়, অনুভূতি ও সুখ থেকে স্বেচ্ছা বিরত থাকা—যা ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব ও আধুনিক মানুষের আত্মসংযমী যন্ত্রণার ইঙ্গিত বহন করে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ মিশ্রের এই কবিতাটি পাশ্চাত্য আধুনিক কবিতার ভাব, প্রতীক ও অস্তিত্ববাদী দর্শনকে আত্মস্থ করে বাংলা কবিতায় এক গভীর, সংবেদনশীল ও বেদনাময় অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেছে।
0 মন্তব্যসমূহ