E-দুইপাতা পত্রিকা ১১৬তম তৃতীয় সংখ্যা, ২০২৬ ।।কবি রাজীব ঘোষ ।। সম্পাদক: নীলোৎপল জানা


E-দুপাতা ত্রিকা

১১৬তম তৃতীয় সংখ্যা, ২০২৬

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com 

==========================================


 রাজীব ঘোষ এর পাঁচটি কবিতা

১.

রাহূর গ্রাস

 

মেঘমোল্লার গেয়ে ওঠে বরাক যুবতী

দুই হাতে তার কচি ধানের দুধ ছলকে পড়ে

আমি একটু একটু করে ভিজে উঠছি হু-হু

এইসব  দৃশ্যাবলির চন্দ্রচূড় গুহাটির ভিতর।

 

এখানে কোন খাদ নেই,ফসলি জমি শুধু

আমার  কৃষক হতে ইচ্ছা করে তন্দ্রা ছিঁড়ে ।

 

পায়রা উড়িয়ে যুবতী গান থামিয়ে হেসে ওঠে

বলে আমার বাম দিক সূর্য আর ডান দিক চন্দ্র

সমস্ত শরীর থেকে খুলে ফেলছি মেঘমিতালী

তুমি রাহূ হয়ে গিলে নাও আমার স্বর্ণলতা ঐশ্বর্য।

২.

চিত্রশালা

 

যে ভাস্কর দিগন্তে হারায়

আলোচ্যসূচি বলিরেখাতে

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুছে শব্দ স্রোত

কত উচ্চস্বরে বাটালি চলে

ঠোঁটের তিল কঁকিয় উঠলে

ধু-ধু পান্তরে আছড়ে পড়ে কম্পাস

নীল রক্ত বর্বর হয়ে ওঠে বশ্যতায়

এ এক নতুন চিত্রশালা

বাতাসের অক্ষরে পুড়ে নোঙ্গর

শিথিল হয় নতুন আবিষ্কারের আকাডেমি

৩.

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে

 

তোমার মেঘ ভরা স্তনে ছিল নীল তিল

এখানেই আমি সৈনিক জীবন কাটিয়েছি

পারদের উঠানামায় ক্ষণিক মুহুর্তবালাই।

 

শালুকের বন ছিল ভীষণ ঘুটঘুটে ঘন

আলোতে বেরিয়ে আসার আশায়

হাঁটু গেড়ে দূরত্ব মাপি সুগন্ধি ফেনার।

 

দীর্ঘশ্বাসগুলো গিলে ফেলে অহং পুরুষের বর্ষণ

চিৎ হয়ে শিশুটি ভিজতে ভিজতে তৃষ্ণায় কাঁদে

নীল তিল ছাতা বিছিয়ে আঁকে ঢেউ ভরা চাঁদ।

৪.

জিহ্বার কোলাজ

 

শূন্যতা থেকে আরও মহাশূন্যের দিকে এগালে

খুলে ফেলো ঋতুগানে মেঘরাঙা ব্রার হুক

মেহেফিল সবুজের সমারোহে তারারা জ্বলে ওঠে

মৃদু ঝড়ো হাওয়ায সেঁকেনেই জিহ্বার কোলাজ

 

কত অন্তমিল তবুও শাড়ি উড়ে হেমন্ত ইশারায়

সাদা বিছানায় ভাঙা চুরি আঁকে বাঁকা ট্রাম পথ

নিঝুম ভালোবাসা এন এইচ ৬০ ধরে গড়িয়ে যায়

বিশ্বাসে অবিশ্বাসে থেকে যাবে  চলার পথে নিরবে

 

এই থেকে যাওয়াতেই ঘুম হয়ে জড়িয়ে

নীরবতা ছিটিয়ে দেবো কোমরের ভাঁজে

ভাঙাচোরা ঘরে তুই না থাকলে বড় শূন্য লাগে

শালবনী মুচকি হাসে নতুন সকাল দেখব বলে

সিম্ফনি ঝড়

 

বৃদ্ধ কানভাস ঝুলে থাকতে থাকতে

একদিন ফেটে পড়ে বালিশের উপর

সারা পাড়াময় তুলো ডেকে চলে

যেমন পরিযায় উড়ে ভি-আকারে ।

 

বুক ভর্তি করে কাঞ্চনকন্যার যৌনগোলাপ

খসে পড়ে পাপড়ি থেকে বৃষ্টিহাটে গীতিকায়

অভিভূত মহারোগ নোনতা চুমুর স্রোত যেমন

খুলে রাখা কামিজে শুয়ে থাকে জিরাফ ।

 

আগুনের বিশৃঙ্খলা থেকে জোরে হাঁটে

দুই পাশে ফেলে রেখে অস্থিরতার অনুবাদ

ভেনেজুয়েলা থেকে পাঠ নেয় বান্ধবী

স্মৃতিতে তখন আবেগের অনুভূতি ।

 

একটি মোহনীয় চন্দ্রঘ্রাণ ঘোষিত করে

আর একটি আলিঙ্গনের অঙ্গভঙ্গি ছুঁয়ে

রাতগভীরে পড়ে আনে তুলো কুসুম

ছড়িয়ে পড়ে কিবোর্ড থেকে সিম্পনি ঝড় ।

 

------------0------------0----------------

রাজীব ঘোষের পাঁচটি কবিতার আলোচনা-

রাজীব ঘোষের এই পাঁচটি কবিতা পাশ্চাত্য আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কবিতার বিভিন্ন প্রবণতার সঙ্গে গভীর সংলাপে আবদ্ধ। চিত্রকল্পের স্বাতন্ত্র্য, অবচেতনমন-নির্ভর ভাষা, ভাঙা আখ্যান ও প্রতীকী যৌনতা—এই সবকিছু মিলিয়ে কবিতাগুলি ইউরোপীয় আধুনিকতা, বিশেষত স্যুররিয়ালিজম, ইমেজিজম এবং এক্সপ্রেশনিজমের অনুসঙ্গে নির্মিত বলে মনে হয়।

প্রথম কবিতা “রাহূর গ্রাস”-এ প্রকৃতি, নারী ও মহাজাগতিক প্রতীকের মেলবন্ধন চোখে পড়ে। এখানে “রাহু”, “সূর্য-চন্দ্র”, “গ্রাস”—এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও পৌরাণিক অনুষঙ্গ পাশ্চাত্য প্রতীকবাদী কবিদের (যেমন ইয়েটস বা রিলকে) স্মরণ করায়, যেখানে ব্যক্তিগত কামনা ও মহাজাগতিক সংকট একাকার হয়ে যায়। কবির কৃষক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা শিল্পসভ্যতার ক্লান্তি থেকে প্রাক-আধুনিক সরলতার দিকে ফেরার ইচ্ছা—যা টি. এস. এলিয়ট-পরবর্তী পাশ্চাত্য কবিতার “অ্যালিয়েনেশন” ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

“চিত্রশালা” কবিতায় ভাষা আরও বিমূর্ত ও ভাঙা। শব্দ, রক্ত, কম্পাস, বাটালি—এসব চিত্র একত্রে এসে অর্থের চেয়ে অনুভবকে গুরুত্ব দেয়। এটি স্পষ্টতই স্যুররিয়ালিস্ট কবিতা-ভাবনার কাছাকাছি, যেখানে যুক্তির বদলে অবচেতন মনই চালিকাশক্তি। আঁদ্রে ব্রেতোঁ বা পল এলুয়ার-এর কবিতায় যেমন চিত্রের পর চিত্র এসে একটি “অভিজ্ঞতার গ্যালারি” তৈরি করে, এখানেও “নতুন চিত্রশালা” সেই কাজটাই করে।

uতৃতীয় কবিতা “চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে”-এ প্রেম, স্মৃতি ও দেহজ অনুভূতি সূক্ষ্ম প্রতীকের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত। পাশ্চাত্য ইমেজিস্ট কবিদের মতো (এজরা পাউন্ড, এইচ. ডি.) এখানে সংক্ষিপ্ত দৃশ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চিত্রের মাধ্যমে গভীর আবেগ ধরা পড়ে। সরাসরি বর্ণনার বদলে “নীল তিল”, “শালুকের বন”, “ঢেউ ভরা চাঁদ”—এই সব ইমেজ কবিতার অনুভূতির ভার বহন করে।

“জিহ্বার কোলাজ” কবিতাটি ভাষা ও দেহের সম্পর্ক নিয়ে খেলেছে। “কোলাজ” ধারণাটিই পাশ্চাত্য আধুনিক শিল্পের (পিকাসো, দাদা আন্দোলন) উত্তরাধিকার। ভাঙা সম্পর্ক, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, রাস্তার নাম—সব মিলিয়ে এটি উত্তর-আধুনিক নগর-অভিজ্ঞতার কবিতা, যেখানে একক কেন্দ্র নেই, আছে বিচ্ছিন্ন টুকরো।

শেষ কবিতা “সিম্ফনি ঝড়”-এ সংগীত, স্মৃতি ও বৈশ্বিক ইশারা (“ভেনেজুয়েলা”) একসঙ্গে আসে। এটি পাশ্চাত্য এক্সপ্রেশনিস্ট কবিতার মতো আবেগের বিস্ফোরণকে গুরুত্ব দেয়। “সিম্ফনি” শব্দটি নিজেই বহুস্বরতার ইঙ্গিত—বিভিন্ন অনুভূতি, দৃশ্য ও চিন্তার সম্মিলিত ঝড়।

সব মিলিয়ে, রাজীব ঘোষের কবিতাগুলি পাশ্চাত্য কবিতার অনুকরণ নয়, বরং সৃজনশীল আত্মীকরণ। ইউরোপীয় আধুনিকতার ভাষা ও কৌশল তিনি স্থানীয় প্রকৃতি, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও বাংলার সংবেদনশীলতার সঙ্গে মিশিয়ে একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। এই সংলাপই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি।

======================================================

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ