E-দুইপাতা পত্রিকা
১১৬তম চতুর্থ সংখ্যা, ২০২৬
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
---------------------------------------------------

লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের ৫টি কবিতা
১.
সান্দ্র পাণ্ডুলিপি
কম্পাংক হারিয়ে যাওয়াকে কেউ ক্ষয়
বলে না – নিবিড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকা আজন্মের ভিমরুলটি অনাদিকালের জিজ্ঞাসা নিয়ে তামাম
নিরাশ্রয়ের নিচে বসে আছে – তবু কেমন করে অপেক্ষারা মেঘের আড়াল দিয়ে এখনই চলে যেতে চায়;
লাল চন্দনের পাতায় ফুটকি ফুটকি পাখিদের স্বরে তারই টুংটাং চেতনা
আমি লিখতে চাই না আত্মহত্যা – কিংবা
আকাশ পেরিয়ে তিলখেত গন্ধের ধারে নয়ানজুলি শুকানোর বেবাক দুপুর, সমস্ত রাস্তার কর্কটরোগের
সাথে রিনরিন বেজে ওঠে উদগ্র কোকিলের নেশা
এই দৃশ্যে কাটাকুটি আঁকা পাণ্ডুলিপিটি
সান্দ্র হাত বিছিয়ে রাখে
২.
রোদের অদৃশ্য ইজেল
পুকুরপাড়ে জলতল থেকে উঠে আসে অ্যাজমাটিক
বুকের উসখুস, ঢিল ছুঁড়লেও ঢেউগুলো শান্ত হতে
চায় – ছুঁতে চায় মাধবীলতার পাতা – রোদের অদৃশ্য
ইজেলে অজস্র ঋতু প্রার্থনাগৃহ সাজাতে চায় আবহাওয়ায়; কিন্তু সে মধ্যাহ্নে নিজের ছায়ায়
দ্যাখে আহ্নিক গতি – শিরীষ গাছ থেকে ঝরতে থাকে পূর্বজদের রাশিতত্ত্ব
কাছে এসো তুমি জাগ্রত, প্রতিটি
ঝলসে ওঠা স্নায়ুর কলরব নিয়ে আর একটা জার্নি শুরু করুক ইলিউশান হীন প্রশান্তি
ওপারের রিনরিন থেকে অপরূপ ভাসতে
থাকে ভরনিরপেক্ষ সাঁতার
৩.
মেঘঢাকা মাধব
নেহাতই ভুল বানানের উপর একটা বাথরুম
গড়ে ওঠে, নির্ঝর শব্দগুলোর সাথে দেখি সূর্য ডুবে যাচ্ছে দাসেরচক মাঠ পেরিয়ে, তারপর
নগ্নতা ধুয়ে চলে চাতকের আয়তন – আলো আর নিজেকে দেখায় না, পাতায় পাতায় রঙিন ক্লোরোফিল
ও সবুজ ক্লোরোপ্লাস্টে ইচ্ছে বেড়ে যায় দুদণ্ড নিশ্বাস প্রশ্বাসের; ভাসতে ভাসতে পালক
থেকে জল ঝাড়তে থাকে পানকৌড়ি, কারন মৃত্যু ও অমরত্বের কোটিদ্বয়ের সম্পর্ক এড়ানোর উপায়
খোঁজে জিরো স্যাডো মুভম্যান্ট
চিরদিনের ব্যর্থ যে উপমা তার ভিতর
প্রবেশ করে আমি শুধু বুঝতে পারি একটা নিদারুণ গ্রীষ্মকাল – গুমোটঝড়ে আর মেঘঢাকা অন্ধকারে
মাধব সে – দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ায়
এবার সকলে ভিজে যাও জলভাঙার পিপাসা
নিয়ে
৪.
সরীসৃপের নোটেশন
অথচ কী ভীষণ বৃষ্টি হত্যায় আমাদের নদী ভিজে যায়, চতুর্দিকে শংকরগাছ আর সরীসৃপের
নোটেশন ভাবতে ভাবতে কুয়াশায় ঢেকে যায় ধানক্ষেতের সম্পর্ক – ডাহুকের কাছে নীল কম্পন
রেখে পৃথিবীর ছায়া উড়ে দশদিকে, মীনপাখি শেয়ার করে অসমাপিকায়; কোনো রেফারেন্স ছাড়াই
প্রাণপণে খোঁজাখুঁজি করে স্নায়ু নামের ডায়াগ্রাম : স্তব ও স্রুতির পাখিস্বরে নেহাতই
মর্মর অপরিশোধিত ঋণ
হে সপথ ভাঙা ঢেউ, তোমাকে বলা হয়নি
সমর্পণ ইচ্ছের টাইম ট্রাভেলে কোনো শব্দ নেই – চোখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে গোধূলির মুখ
–ভায়োলিন বাজাতে বাজাতে দৃশ্যরা দৌড়োয় অনুপ্রাসের দিকে
দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে আলপথ মিশে
যাচ্ছে গ্যালাক্সির ঘূর্ণনে
৫.
শূন্য ও সুখের ব্যস্তানুপাত
অথচ শরবিদ্ধ পিতামহের কাছে যাবার
সমান্তরাল কোন পথ নেই, দূর থেকে সেই আয়নার ভিতর ইতস্তত জলের কর্পূর কণা – মায়া কেঁদে
উঠে শূন্য ও সুখের ব্যস্তানুপাত সম্পর্কে; কোনো ক্রেডিট ব্যালেন্স নেই ললিতরাগে, নিরবধি
আমাদের জন্মান্তরে রাত্রি যাপনের সকল ইতিহাস নিয়ে কেউ ডাকে লিরিক্যালি ; একা
এবার সূর্য প্রবেশ করছে মিথুনে
– আমার আকাশ জুড়ে অ্যাসিডিক মেঘের উড়াউড়ি – আর্য ধাঁধার বিকলাঙ্গ স্নায়ুতে আলোবিন্দু
কেঁপে যায়
আমি কি জানি কোথায় পাখিদের দেশ – রোদ বিয়োগের পর আঠারো দিবস আগে থেকেই আত্মহত্যার
দিকে তাকিয়ে জারুল ফুটছে
-----------------------------------------
লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের “সান্দ্র পাণ্ডুলিপি” ও “রোদের অদৃশ্য ইজেল”—এই দুই কবিতার আলোচন।
লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের “সান্দ্র পাণ্ডুলিপি” ও “রোদের অদৃশ্য ইজেল”—এই দুই কবিতাই আধুনিক বাংলা কবিতার আবেগঘন ও ঘনত্বপূর্ণ ধারার অন্তর্গত, যেখানে অভিজ্ঞতা সরল বর্ণনার বদলে চিত্রকল্প, মনস্তাত্ত্বিক ভাঙন ও ইন্দ্রিয়জ জটিলতার মাধ্যমে প্রকাশিত। কবিতাদ্বয়ের কাব্যভাষা এখানে পাশ্চাত্য আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার (Modernism ও Postmodernism) সঙ্গে স্পষ্ট সাদৃশ্য তৈরি করে।
প্রথম কবিতা “সান্দ্র পাণ্ডুলিপি” মূলত এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সংকটের দলিল। এখানে “কম্পাংক হারিয়ে যাওয়া”, “ভিমরুলটি”, “অনাদিকালের জিজ্ঞাসা”—এইসব চিত্রকল্প আমাদের টেনে নিয়ে যায় টি. এস. এলিয়টের The Waste Land কিংবা পল সেলানের কবিতার দিকে, যেখানে সময়, ইতিহাস ও ব্যক্তিসত্তা একসঙ্গে ভেঙে পড়ে। কবি আত্মহত্যা লিখতে না চাওয়ার উচ্চারণে যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেন, তা আলবেয়ার কামুর “দ্য মিথ অফ সিসিফাস”-এর আত্মহনন বনাম অর্থহীনতার দর্শনের সঙ্গে তুলনীয়। এখানে আত্মহত্যা শারীরিক নয়, বরং ভাষা ও চেতনার আত্মহননের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ।
কবিতার ভাষা সান্দ্র—অর্থাৎ ঘন, প্রায় অস্পষ্ট। এই ঘনত্ব পাশ্চাত্যের Symbolist কবিদের (মালার্মে, বোদলেয়ার) স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে পাঠককে সক্রিয়ভাবে অর্থ নির্মাণ করতে হয়। “লাল চন্দনের পাতা”, “ফুটকি ফুটকি পাখি”, “উদগ্র কোকিলের নেশা”—এসব ইমেজ একদিকে প্রকৃতির, অন্যদিকে মানসিক অস্থিরতার প্রতিরূপ। ফলে কবিতাটি কেবল দৃশ্য নয়, এক ধরনের মানসিক ল্যান্ডস্কেপ।
দ্বিতীয় কবিতা “রোদের অদৃশ্য ইজেল” তুলনামূলকভাবে আরও ধ্যানমগ্ন ও দার্শনিক। এখানে রোদ একটি দৃশ্যমান বস্তু নয়, বরং শিল্পসৃষ্টির মাধ্যম—একটি অদৃশ্য ইজেল। এই ধারণা পাশ্চাত্য Impressionism ও Abstract Expressionism-এর সঙ্গে মেলে, বিশেষত মার্ক রথকো বা ক্লদ মোনের শিল্পভাবনার মতো, যেখানে আলো ও অনুভূতি বাস্তবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। “অজস্র ঋতু প্রার্থনাগৃহ সাজাতে চায় আবহাওয়ায়”—এই পঙ্ক্তি প্রকৃতিকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার স্তরে তুলে আনে।
এখানেও আধুনিক মানুষের ক্লান্ত স্নায়ু, “অ্যাজমাটিক বুকের উসখুস”, এবং ছায়ার মধ্যে নিজের গতি দেখার মুহূর্ত—এসব আমাদের মার্টিন হাইডেগারের Being and Time-এর অস্তিত্বচেতনার কথা মনে করিয়ে দেয়। কবি “ইলিউশান হীন প্রশান্তি”-র আহ্বান জানিয়ে এক ধরনের পোস্ট-ইলিউশনড, পোস্ট-রোমান্টিক শান্তির সন্ধান করেন, যা পাশ্চাত্য উত্তর-আধুনিক কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
সব মিলিয়ে, এই দুই কবিতা আবেগঘন হলেও আবেগ এখানে ব্যক্তিগত আবেগের সরল প্রকাশ নয়; বরং তা ভাঙা চেতনা, প্রতীকী ভাষা ও দর্শন-সঞ্জাত সংকটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের কবিতা পাশ্চাত্য আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে সংলাপে থেকেও স্বতন্ত্র—কারণ তাঁর চিত্রকল্প ও আবহ নির্মাণে দেশজ প্রকৃতি ও ভাষার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত।
=================================
0 মন্তব্যসমূহ