E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২১তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

 E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২১তম দ্বিতীয় সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com 

----------------------



অভীককুমার দে’র গুচ্ছকবিতা

১.

ভাঙন প্রণালী

 শব্দেও শব্দ ফুরায়, একদিন

জেগে ওঠে অন্তঃস্থ পাথর,

 

হয়তো একফোঁটা রোদ

ঠিকরে বেরোয় দীর্ঘশ্বাসের মতো,

স্বরে, ইশারায়, অথবা সম্পর্কে

অলক্ষ্যে কতদূর...

 

খোঁপা খুলে শূন্য এসে দাঁড়ালে

অন্ধকার গায়েও জ্বলতে থাকে বিস্মৃত পরাগ;

 

সমূহ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে হতে

নিজেকে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।

 

ছিন্নভিন্ন দিনলিপির ফাঁকে

মুখের আলোয় হয়তো কিছুদিন

কিছুদূর যাওয়া যাবে, তারপর

ক্রমশ ভাঙন প্রণালী।

 ২.

আলো আছে ভোরের কাছে

রাত গাঢ় হলে

শুনতে পাই ভেতরের চিৎকার

পথ হারিয়ে অনাবশ্যক দূর

বাঁচিয়ে রেখেছে অর্ধেক,

 

সব পথেরই নিজস্ব দুঃখ আছে

হাঁটতে হাঁটতে দেখেছি, সারিবদ্ধ গাছ

আক্ষেপ নিয়ে দাঁড়িয়ে একজীবন

পথের পাশে,পথের জন্য,

পথ দেখিয়ে বলে-

 

আলো আছে ভোরের কাছে

রোদ পাবে দিন ভালো হলে;

 

জানি, জীবনের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই

ফসল শূন্য মাঠের মতো

পড়ে থাকা, সময়ের দিকে চেয়ে

কত আর খালি হওয়া যায়, তার চে'

 

অসম্পূর্ণ থাকার নিগূঢ় স্বাধীনতা চাই।

 ৩.

লালননগর

সোনালি দরজা খোলা পেলেই যন্ত্রণা

বুঝতে হয়, জীবনের আছে লালননগর

নিঃশ্বাসের ধুকধুক

প্রাণপণে গুছিয়ে রাখে আলো,

 

আলো ফুরোবার আগেই এতসব

হাসি কান্নায় নীলিকার নিকানো উঠোন

ফুর্তিতে ভরপুর ভরসার ডাঙা, তথাপি

কেউ কি বলতে পারে উত্তোরণের আগে?

 

শূন্য দেখা চোখ নীল সমুদ্র ঘুরে

পরিকল্পনাহীন ছাপোষা মাঠ

প্রাচুর্যের জল উথলে ওঠে সময়-সময়;

 

শশব্যস্ত শরীর কত আর প্রখর

রোদ ফুরোলেই ভাঙনের শব্দ

শুনেও পালাবে কোথায়

অন্ধকারে, নিশ্চিন্ত হেঁটে যাবে স্বস্তিকা ?

 

৪.

বোধের পর্দা সরে গেলেই

 

এই ছায়া-জন্ম আর চিন্তার

আদি অঙ্কুর থেকেই কোথাও ঘুমিয়ে আছে

মৃত শব্দের প্রেত,

 

অস্তিত্বের নালায় রক্তের মতো বয়ে যাওয়া ধারায় মানুষ !

ডুবে যাবার ভয়, মাটি-মাটি খোঁজ;

 

বোধের পর্দা সরে গেলেই শোনা যাবে-

নীরবতার কথা, ভেতরে যার সুরের গর্জন

প্রশ্নের সরণি ধরেই এগিয়ে আসছে...

 

অন্ধত্বের আশ্রয় ভেঙে

জেগে উঠবে ভাষা।

------------0-------------------------

অভীককুমার দে’র “বোধের পর্দা সরে গেলেই” কবিতাটি আধুনিক পাশ্চাত্য কবিতার অনুসঙ্গে আলোচিত।

   অভীককুমার দে’র “বোধের পর্দা সরে গেলেই” কবিতাটি আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিক ও সাহিত্যিক ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে সংলগ্ন। বিশেষত অস্তিত্ববাদ (Existentialism), ফেনোমেনোলজি (Phenomenology) এবং উত্তর-আধুনিক ভাষাচিন্তার প্রতিধ্বনি এতে স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।

    কবিতার শুরুতেই “ছায়া-জন্ম”, “চিন্তার আদি অঙ্কুর” ও “মৃত শব্দের প্রেত”—এই প্রতীকগুলি পাশ্চাত্য দর্শনে ভাষা ও চেতনার সংকটকে স্মরণ করায়। ফ্রিডরিখ নীটশে যেমন বলেছিলেন, ভাষা সত্যকে সম্পূর্ণ ধরতে অক্ষম, তেমনি কবিতায় শব্দ এখানে ‘মৃত’, অথচ তাদের ‘প্রেত’ সক্রিয়—অর্থাৎ অর্থহীনতার মধ্যেই অর্থের অনুসন্ধান। এই দ্বন্দ্ব জাক দেরিদার deconstruction ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, যেখানে ভাষা কখনোই চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছাতে পারে না।

    “অস্তিত্বের নালায় রক্তের মতো বয়ে যাওয়া ধারায় মানুষ”—এই পঙ্‌ক্তি সরাসরি অস্তিত্ববাদী সংকটকে উন্মোচন করে। জঁ-পল সার্ত্র ও আলবেয়ার কামুর দর্শনে মানুষ একটি অর্থহীন জগতে নিক্ষিপ্ত (thrown existence), যেখানে অস্তিত্ব নিজেই যন্ত্রণার উৎস। কবিতার “ডুবে যাবার ভয়” ও “মাটি-মাটি খোঁজ” মানব অস্তিত্বের নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থের সন্ধানকে নির্দেশ করে, যা কামুর The Myth of Sisyphus-এর ‘অ্যাবসার্ড’ ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

    “বোধের পর্দা সরে গেলেই” শিরোনাম ও পুনরুক্তি ফেনোমেনোলজির মূল ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে—হুসার্লের মতে, সত্য উপলব্ধির জন্য চেতনার উপর জমে থাকা পূর্বধারণার পর্দা সরাতে হয়। কবিতায় নীরবতার ভেতরে “সুরের গর্জন” শোনা যায়, যা মার্টিন হাইডেগারের ‘Silence as a mode of Being’-এর ভাবনাকে স্মরণ করায়। নীরবতা এখানে শূন্যতা নয়, বরং গভীর অর্থবাহী এক অস্তিত্বগত অবস্থা।

    শেষে “অন্ধত্বের আশ্রয় ভেঙে / জেগে উঠবে ভাষা”—এই পঙ্‌ক্তিতে পাশ্চাত্য উত্তর-আধুনিকতার একটি আশাবাদী রূপ ধরা পড়ে। দীর্ঘ নীরবতা ও সংকটের পর ভাষার পুনর্জন্ম সম্ভব—এটি শুধু ভাষার নয়, মানুষের আত্মসচেতনতার পুনরুত্থান।

   সার্বিকভাবে, এই কবিতা পাশ্চাত্য দর্শনের অস্তিত্ববাদী হতাশা ও উত্তর-আধুনিক ভাষাসংকটকে আত্মস্থ করে এক গভীর বোধমুখী কাব্যভাষা নির্মাণ করেছে।

--------------------

শিলচর| আসাম










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ