E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২১তম প্রথম সংখ্যা ২০২৬

E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২১তম প্রথম সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com 

==========================

অনিন্দিতা সেনের গুচ্ছকবিতা

পুণ্যশ্লোক

 ঈশ্বরী কাঁদে অরন্যের মাঝে একা,

কখনো বুঝি চেয়েছিলে তাকে

নিবিড় করে বুকের আঁচে

আলিঙ্গনের নিবিড় খেলায়

বকুল বিছানো পথটুকু যে ঢাকা!

সুর কেটে যায় হঠাৎ কেমন

ছায়াবিহীন শিউলিতলা

পোড়ো বাড়ির অলিন্দ খানি

পরিত্যক্ত ফাঁকা।

আশাবরির অচঞ্চল ধুনে সন্ধ্যা রাগের

ইমন...মারোয়ার খুশিতে নামে

বসন্তের মুখারি,

আলোর গায়ে মেঘ সরে যায়

শাপলা শালুক রঙধনু ভোর

বর্নচ্ছটায় রঙের আকাশ

অযাচিত রূপরেখা!

ভোরের নদীর পবিত্র স্নানে

ঈশ্বরী... পুণ্যশ্লোক...

অনাবাদি মায়াবৃতা!

২.

গন্ডি

 তোমার আর আমার ভালবাসা

প্রত্যহ জন্মায়

জন্মান্তরের কথা বলে!

নির্বান্ধব পুরীর মত শোকবিহীন

সে ভালবাসা দেউড়ি তে বাঁধা থাকে!

যতই আলগা হোক সে বাঁধন

বেঁধেছিলে তো একদিন

ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি এস

সম্পর্ক যেন এবার থেকে গন্ডি ছাড়া হয়!

 ৩.

গল্প কথা

এখনো কোকিল ডাকে...বর্ষা আসি আসি শহরে

ঘোর অবেলায়!

কিছু অনুভূতি... বড় গোপনে হানে

বসন্ত হৃদয়!

ঘন সবুজ পাতার... আড়ালে আবডালে

আজ মায়াবী সন্ধ্যে

ছাদের রেলিং ঘেঁষা...বিদায়ী সূর্য

ইমনের আলাপে

ধীরে... বড় ধীরে এসে মেশে

চিবুকের রক্তিমায়!

একটা ছোট্ট দেশে... হয়ত বা

মেঘ ভাঙল

আছড়ে পড়ল...শুখা প্রান্তরের

বুক চিরে

বোকা বোকা কষ্টগুলো...আজগুবি

গল্প হয়ে যায়!

-----------------------0-------------------------

অনিন্দিতা সেনের “গণ্ডি” কবিতার আলোচনা।

   অনিন্দিতা সেনের কবিতা “গণ্ডি” আধুনিক প্রেমভাবনার এক অন্তর্মুখী ও দার্শনিক রূপ তুলে ধরে, যা পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে আরও গভীর তাৎপর্য প্রকাশ পায়। কবিতাটির কেন্দ্রে রয়েছে প্রেমের পুনর্জন্ম, সীমাবদ্ধতা এবং সেই সীমা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা—যা পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদ ও আধুনিক প্রেমতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

   পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র প্রেমকে দেখেছেন একধরনের দ্বন্দ্ব হিসেবে, যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সম্পর্কের বন্ধন একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। কবিতার “দেউড়িতে বাঁধা” ভালোবাসা এই দ্বন্দ্বেরই প্রতীক। ভালোবাসা এখানে শোকবিহীন, নির্বান্ধব—অর্থাৎ আবেগমুক্ত ও নিস্তরঙ্গ, যা সার্ত্রের bad faith বা আত্মপ্রবঞ্চনার ধারণার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। সম্পর্ক টিকে থাকলেও তা প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ, সত্যিকারের মুক্তি সেখানে অনুপস্থিত।

   এছাড়া কবিতায় “প্রত্যহ জন্মায়” ও “জন্মান্তরের কথা বলে” পংক্তিগুলি পাশ্চাত্য রোমান্টিক ঐতিহ্য ও কার্ল ইউং-এর পুনর্জন্ম ও collective unconscious ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভালোবাসা এখানে কেবল একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং এক চিরন্তন মানবিক অভিজ্ঞতা, যা সময় ও জন্মের গণ্ডি অতিক্রম করে। তবু সেই ভালোবাসা সামাজিক ও নৈতিক সীমারেখায় বন্দি—যাকে কবি ‘গণ্ডি’ শব্দের মাধ্যমে চিহ্নিত করেছেন।

   মিশেল ফুকোর ক্ষমতা ও সম্পর্ক বিষয়ক তত্ত্বের আলোতেও কবিতাটি পাঠযোগ্য। সম্পর্কের গণ্ডি আসলে সামাজিক নিয়ম, ধর্মীয় শপথ ও নৈতিক বিধিনিষেধের ফল। কবিতার শেষ পংক্তিতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা—“সম্পর্ক যেন এবার থেকে গণ্ডি ছাড়া হয়”—এই ক্ষমতাকাঠামো থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেই নির্দেশ করে। এটি পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার দাবি ও সম্পর্ককে পুনর্নির্মাণের প্রয়াসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

  সার্বিকভাবে, “গণ্ডি” কবিতাটি পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদ, আধুনিক প্রেমতত্ত্ব ও ক্ষমতা-চেতনার আলোকে এক গভীর মানবিক সংকটকে প্রকাশ করে—যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু মুক্তি নেই; সম্পর্ক আছে, কিন্তু সীমাহীনতা নেই। কবির প্রার্থনা তাই কেবল প্রেমিকের নয়, আধুনিক মানুষেরও প্রার্থনা—সব গণ্ডির বাইরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসতে চাওয়ার আকুতি।

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ