E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২০তম পঞ্চম সংখ্যা ২০২৬

 E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২০তম পঞ্চম সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com 

========================

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়  এর তিনটি কবিতা

১.

মাঠেঘাটে খুঁজে ফিরি অন্ধগুরুর অস্ত্র

 

রক্তদ্রোণের সন্ধানে খুঁজলাম যত বনবাদাড়

মাঠ ঘাট আশপাশ, বারবার ভেবেছি এই বুঝি,

ওই বুঝি বসে আছে কোনো লুকোচুরি বালকের মতো

মুখ তুলে, চোরা চোখ টানটান, হঠাৎ ডাকের আশায়

 

তার মানে এই নয়, একলব্য খিদের জাতক হয়েছি,

তার মানে এই নয়, আর্যকৌশল ভুলে অনার্য দানে

যত ত্যাগ কেবলই আমার অমর্যাদাময়

 

ওসব গল্প গিলে পউষের রোদে, মায়াবী আগুনে

সেঁকে নিই ছাতা পড়া খেদ ও আক্ষেপ

স্বজন শোণিতের রাগ, সেই অঙ্গহানি জঙ্গলপ্রবাদের

গায়ে গুল্মকাঁটায় গাঁথা যা কেড়ে নেয় প্রার্থিত ঘুম

আর রসদের খিদে

 

কে যেন বলেছেন রক্তদ্রোণের বুকে জমা তীব্র তির, রেখেছেন স্বার্থপর গুরু

সেই বিষে মেপে নেবো মারণ ক্ষমতা

তারপর শবর বন্ধুর কাছে খুলে দেবো মনপ্রাণ জ্বালা

২.

যন্ত্রপাতি কাজের হলে অন্যকথা

 

কে বলেছে অন্ধচোখে যায় না আলো ?

দিন ও রাতের ছন্দগুলো হারিয়ে গ্যাছে

মুগ্ধবাঁচার আশার ঘরে শূন্য লিখে

হারিয়ে গ্যাছে হিসেব লেখার নকলনবিশ।

 

হাতের আঙুল চোখ হয়েছে নিজে নিজেই

কানের তারে ঢেউ উঠলেই বার্তা লেখে

গন্ধ বেয়ে স্বয়ংক্রিয় ছবির খেলা

দেয় মিলিয়ে মন্দ ভালো টক্কা টরে।

 

ভোরের আলো গন্ধ ছড়ায় আপন কাজে

সবাই দেখে আলোর খেলা ছড়িয়ে পড়ে

হাওয়ায় ওঠা গন্ধ ক-জন খেয়াল রাখে

তারা কিন্তু ঠিক বুঝে যায় ফারাকটাকে।

 

শীতের বিকেল, গভীর রাতে নতুন সুবাস

মিলিয়ে দিয়ে কেউ বলেছে, চিনতে পারো ?

সেই রসেতে রসিকজনার আবিষ্কারে

পুলক লাগে শিড়দাঁড়াতে অমোঘ টানে।

৩.

ধার করা সুখে চার্বাক হলে

 

ভোরের আলোর কাছে প্রতিদিন স্বগত কথন

আসলে তা অধমর্ণ সুখ

সগর্বে লিখে দেওয়া ঘাতকের লিপি নির্ভেজাল

চানবেলায় বেজে ওঠে হাওয়ার বাঁশি আর

রাখালিয়া গান প্রতিদিন

কতবার মুগ্ধতার স্বীকারোক্তি বলেছে, আমি আছি

দুপুরের রোদকে কতবার প্রেমে ও ঘৃণায় সাজালে

পোশাকে মাখিয়ে রাখো, ভালো আর মন্দশ্বাসে

প্রগলভ বাতাসের মতো নিঃসাড়ে ছুঁতে দেয়

যা কিছু গোপন, ভাবনার পাতা

আশপাশে ঢেউ উঠে, শব্দ হয় প্রিয় ও অপ্রিয়

অবাছাই শর্তের দেয়ালে মাথা ঠোকে সুখ

সেনবাবুর দরজা চেনার সুযোগ না পেলে

চার্বাক দর্শন লিখে চোখের সামনে দোলান

পাঠশালার পণ্ডিতমশাই হারাধন কাব্যতীর্থ

অনর্গল শ্লোক বলেও দত্তদাদুর বৈঠকখানায়

মহাজনি পাতা ভরাতে মলিনমুখে ঢুকতেন

ছবিটা জেগে আছে, পারম্পর্য মেনে

তাঁর অনুগামীরা দত্তদাদুর শিষ্যদের খুঁজে ফেরে

অলক্ষিতে চার্বাক মুনি তৃপ্তির শ্বাস ছাড়েন

===============0===========

গোপেশ্বরপল্লি, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া - ৭২২১২২

ই-মেইল : lekhakjayantachatterjee@gmail.com

==================0=======

 জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়  এর কবিতা “ মাঠেঘাটে খুঁজে ফিরি অন্ধগুরুর অস্ত্র”

 =============================

   জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতাটি রাজনৈতিক কবিতা হিসেবে পড়লে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এর শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত প্রাচ্য মিথ, লোকজ ইতিহাস ও উপনিবেশ-উত্তর ক্ষমতার বাস্তবতায়। কবি পাশ্চাত্য কোনো রূপক ধার না করে বরং মহাভারত, আদিবাসী সমাজ ও ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর থেকেই রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করেছেন—এটাই এর প্রধান প্রাচ্য অনুসঙ্গ।

   কবিতার কেন্দ্রীয় মিথ হল একলব্য–দ্রোণ সম্পর্ক। প্রাচ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে একলব্যকে দীর্ঘদিন ‘আদর্শ শিষ্য’ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়েছে—যে বিনা প্রশ্নে নিজের অঙ্গ দান করে। কিন্তু জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এই কাহিনিকে উল্টে দেন। এখানে একলব্য আর নীরব ত্যাগের প্রতীক নয়, বরং বঞ্চিত শ্রেণির প্রতিনিধি। “তার মানে এই নয়, একলব্য খিদের জাতক হয়েছি”—এই উচ্চারণ প্রাচ্য নৈতিকতার সেই অংশকে প্রত্যাখ্যান করে, যেখানে শোষণকে ধর্মীয় ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে।

   ‘অন্ধগুরু’ ও ‘রক্তদ্রোণ’—এই শব্দবন্ধ দুটি প্রাচ্য ক্ষমতা কাঠামোর তীব্র রাজনৈতিক পাঠ। গুরু এখানে জ্ঞানদাতা নন, তিনি প্রতিষ্ঠান—বর্ণব্যবস্থা, রাষ্ট্র, ইতিহাস। তিনি অন্ধ, কারণ প্রান্তিকের যন্ত্রণা তাঁর দৃষ্টির বাইরে। কিন্তু তাঁর অস্ত্র আছে—বিধান, নিয়ম, সংস্কার। ‘রক্তদ্রোণ’ ধারণাটি প্রাচ্য শিক্ষাব্যবস্থার সহিংস উত্তরাধিকারকে নির্দেশ করে, যেখানে জ্ঞান অর্জনের মূল্য রক্ত।

 কবিতায় বারবার আর্য–অনার্য দ্বন্দ্ব উঠে আসে। এটি নিছক সাংস্কৃতিক পার্থক্য নয়, বরং ক্ষমতার রাজনীতি। আর্যকৌশল মানে শাসনের কৌশল, আর অনার্য দান মানে প্রান্তিকের আত্মবিসর্জন। কবি এই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেন এবং বলেন—এই ত্যাগ “অমর্যাদাময়”। এখানে প্রাচ্য সমাজের দীর্ঘকালীন আত্মবলিদানের মহিমাকরণ ভেঙে দেওয়া হয়।

   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচ্য অনুসঙ্গ হলো ‘শবর বন্ধু’। শবর প্রাচ্য সাহিত্যে আদিবাসী, বনবাসী, সভ্যতার প্রান্তে থাকা মানুষ। কবি শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছে মনপ্রাণের জ্বালা উজাড় করেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট—প্রান্তিকের সঙ্গে সংহতিই মুক্তির পথ।

   সব মিলিয়ে, এই কবিতা প্রাচ্য মিথকে ব্যবহার করে প্রাচ্য ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এটি পাশ্চাত্য বিপ্লবী ভাষার অনুকরণ নয়; বরং নিজের সভ্যতার ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্যায়কে চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই অর্থে এটি এক গভীরভাবে প্রাচ্য রাজনৈতিক কবিতা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ