E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২১তম চতুর্থ সংখ্যা ২০২৬

 

E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২১তম চতুর্থ সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com 

=============================

জয়শ্রী সরকারের তিনটি কবিতা  

( ১ )

সম্পর্ক

 

প্রেম চিরদিনই নক্ষত্র,

অপ্রেম সেই আলোয় আলোকিত হলেও গ্রহই থেকে যায়

ধার করা আলোর ঝর্ণায় যতই স্নাত হোক না কেন

বিবর্ণ বিষাদ লেগে থাকে গায়ে।

 

সেদিন সাদা মলাটের ঘেরা টোপে তোমার কবিতার বাগানের                               

সর্বশেষ সৃজিত ফুলটা উপহার দিয়ে গেলে,

তখনও বুঝিনি প্রতিটা পাপড়িতে  এত প্রেম,  এত বঞ্চনা;

এত মমতা, এত বিতৃষ্ণা;

এত কর্তব্য, এত অবহেলা; এত হাতছানি, এত হাহাকার;

কেমন যেন জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে লেপটে আছে !

তবে কী বিবাহিত জীবনের

গাঢ় সম্পর্কের গভীরেও

সরীসৃপের মতো হেঁটে চলে

আরও একটা নিবিড় প্রগাঢ় সম্পর্ক

অ-কবির ভাষায় যাকে বলা যায় ------

বণিকের !

( ২ )

জীবন-নদী

 

ও মাঝিভাই, বলতে পারো কোথায় তুমি যাবে?

নদীর ঘাটে একলা বসে কী সুখ এখন পাবে!

 

আমি না হয় ঢেউয়ের সাথে উদাস মনে ভাবি

এই প্রকৃতির সকল লীলার কার কাছেতে চাবি!

 

ওই যে মাঝি দাঁড়টা টেনে নৌকা বাইছে জলে

সারাটাদিন দুই কূলেতে এপার-ওপার চলে!

 

জীবনটা ঠিক নদীর মতো ঢেউয়ের পরে ঢেউ

দুঃখ-সুখে লেপটে থাকে বাঁধতে পারে কেউ?

 

ও মাঝি, আজ গান ধরো না ভাটিয়ালির সুরে

উদাস-আকুল মনটি আমার যাবেই অচিনপুরে!

 

মননদীতে উথাল-পাথাল ঢেউয়ের নিত্য চলা

ধরতে পারি কতই বা আর যায় না কিছুই বলা!

 

জীবন এত ছোট কেন? প্রশ্ন মনে আসে

পদ্মপাতায় জলের মতোই জীবনতরী ভাসে !

( ৩ )

চরৈবেতি

 

নদীকে প্রশ্ন করেছি, তুই এত অবিশ্বাসী কেন?

শিলাইদহের ঘননীল জলের মতো

নদী মুচকি হেসে বলেছে, 'এ দৈন্য মাঝারে কবি

একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি!'

 

নদীকে আবার প্রশ্ন ছুঁড়েছি--- এত রক্ত ঝরাস কেন?

ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়েছে নদী

শিলাইদহের তটে; নিরুচ্চারে গেয়েছে ----

'তৃষ্ণার শান্তি , সুন্দর কান্তি ......!'

 

অগ্নিগর্ভ হয়ে প্রশ্নে বিদ্ধ করেছি নদীকে ---

কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, কেন এত বিমাতৃসুলভ তুই?

নিস্তরঙ্গ শিলাইদহের মতোই নদী নিরুত্তাপে বলেছে ---

'আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে ....... !'

 

এপারে দাঁড়িয়ে বলেছি, আমায় যে যেতে হবে ওপার,

শিলাইদহে তখনোও আছড়ে পড়েছে ঢেউ।

নত হয়ে নদী বুঝিয়ে দিয়েছে, বহমানতাই তার ধর্ম ; বলেছে,

'ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে?'

 

আমিও নদীপথ ছেড়ে জনারণ্যের মধ্য দিয়ে

হেঁটে চলেছি জীবনদেবতার সন্ধানে

অনন্তের পথে, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ। গভীর মগ্নতায় গেয়েছি,

'আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল ...... !'

===================0==============

জয়শ্রী সরকারের “জীবন-নদী” কবিতাটির আলোচনা

   জয়শ্রী সরকারের “জীবন-নদী” কবিতাটি প্রাচীন ভারতীয় ও বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ প্রতীকী ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নদীকে জীবনরূপে কল্পনা করার প্রবণতা বৈদিক সাহিত্য, উপনিষদ, পুরাণ থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় সাহিত্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এই কবিতায় সেই প্রাচীন ভাবধারাই আধুনিক অনুভবের ভাষায় পুনর্নির্মিত হয়েছে।

   বৈদিক সাহিত্যে নদীকে জীবনের ধারক ও গতির প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। ঋগ্বেদে নদী একদিকে মাতৃস্বরূপা, অন্যদিকে নিয়তির প্রবাহ। কবিতার “জীবনটা ঠিক নদীর মতো ঢেউয়ের পরে ঢেউ”—এই পঙ্‌ক্তি সেই বৈদিক প্রবাহমানতার স্মৃতি বহন করে, যেখানে জীবন কখনো স্থির নয়, সদা পরিবর্তনশীল।

   উপনিষদীয় সাহিত্যে নদী ও নৌকার রূপক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কঠোপনিষদ বা মুণ্ডকোপনিষদে সংসার-নদী পার হওয়ার কথা বলা হয়েছে জ্ঞাননৌকার মাধ্যমে। কবিতার মাঝি সেই প্রাচীন জ্ঞানী পথপ্রদর্শকের প্রতীক, যিনি মানুষকে দুই কূল—সংসার ও মুক্তি—এর মধ্যে যাতায়াত করান। “এপার-ওপার” ভাবনা এখানেই প্রাচীন দর্শনের সঙ্গে যুক্ত।

   মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যেও নদী ও মাঝির প্রতীক বহুল ব্যবহৃত। বৈষ্ণব পদাবলিতে জীবনকে ভবনদী এবং ঈশ্বরকে মাঝি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। কবিতার ভাটিয়ালি সুর, নদীর ঘাট, মাঝির গান—এসব উপাদান লোকসাহিত্য ও মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

   “অচিনপুরে” যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রাচীন সাহিত্যের পরলোক বা পরম গন্তব্যের ধারণারই রূপান্তর। চর্যাপদ ও বৌদ্ধ সহজিয়া সাহিত্যে যেমন অচিন রাজ্য বা শূন্যপুরের কথা বলা হয়েছে, এখানেও তেমন এক অতীন্দ্রিয় গন্তব্যের ইঙ্গিত রয়েছে।

   সবশেষে “পদ্মপাতায় জলের মতোই জীবনতরী ভাসে”—এই উপমা সংস্কৃত সাহিত্যের বহুল ব্যবহৃত অলংকার, যা আসক্তিহীন জীবনের আদর্শকে তুলে ধরে। ফলে বলা যায়, “জীবন-নদী” কবিতাটি প্রাচীন সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে আধুনিক জীবনের অনিত্যতা ও আত্মজিজ্ঞাসাকে গভীরভাবে প্রকাশ করেছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ