E-দুইপাতা পত্রিকা
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
১২১তম তৃতীয় সংখ্যা ২০২৬
duiipatalokpathpatrika78@gmail.com
===============================
সপ্তদ্বীপা অধিকারীর গুচ্ছকবিতা
১.
পাশবালিশ
অন্ধকার পাশবালিশ বোনে
অসফল বিধিলিপি সহায়ক হোক।
তুমি বিনে এ জীবন
মহাশূন্যের এলোমেলো নক্ষত্রলোক!
২.
গন্ধ
সে ফুল পাঠায়।
স্ক্রিনে চাইলেই আহ! কী যে সেই সুগন্ধ!
সে ভালোবাসা মাখায়।
ওমনি সেই সুগন্ধ মেখে হেসে ওঠে মায়া মায়া রাত।
সে কামনা
বললেই সেই ফুল হাসে যেন বরষার কামিনী।
তার ছুঁয়ে দেওয়া ফুলের হাসি
দরজা ডিঙোয়...
আমি অবাক হয়ে দেখি প্রজাপতির
পায়ে আঠার মতো পরাগ জড়িয়ে!
আর আমার ঘুমহীন বালিশ চিরাগের গন্ধ মাখে।
৩.
মূল্য
তোমাকে হৃদয়ে রেখেছি।
ফলত কাচ হিরে হয়ে উঠেছিল প্রতি মুহূর্তে।
আর নিবেদনের সহজ কথায় সমস্ত অলঙ্কার
জল হয়ে বদলেছে আকার। বদলেছে আয়তন।
বদলেছে চরিত্র। কী অবলীলায় ভালোবাসার
জল মৃগনাভি হয়ে গেছে। অমূল্য জীবন তখন
শুধুমাত্র পায়ের ধুলো ধুয়েছে।
তখনো ভালোবাসার আয়না ধরে মুখে ধন্য হয়েছি নিজে।
অবধারিত আঘাতটা তখনি এলো।
তুমি তখন তোমার লবঙ্গলতিকাকে পুজোর ছলে
আসলে আমাকে ভেঙে ফেলেছিলে।
ভালোবাসা ভেঙে গেলে এতো যে হিরে আর জহরত
বেরোয়, জানা তো ছিল না আগে!
আজ কোনো ক্ষমার সামর্থ্য নেই
মৃগনাভি মনকে কেনার!
==================================
আলোচনা : সপ্তদ্বীপা অধিকারীর
কবিতা “পাশবালিশ”
সপ্তদ্বীপা অধিকারীর
কবিতা “পাশবালিশ” প্রাচ্য কবিতার ঐতিহ্যের সঙ্গে এক অন্তর্গত সংলাপ রচনা করেছে। কবিতাটি
আকারে সংক্ষিপ্ত হলেও ভাবনায় গভীর, এবং এর ভাষা, চিত্রকল্প ও অনুভব প্রাচ্য কবিতার
ধ্যানমূলক ও আত্মমগ্ন প্রবণতার সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে যুক্ত।
প্রাচ্য কবিতার একটি
গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—অল্প শব্দে গভীর অস্তিত্ববোধ প্রকাশ। এই কবিতায় “পাশবালিশ”
একটি নিত্যদিনের, ঘরোয়া বস্তু হলেও তা প্রতীক হয়ে উঠেছে শূন্যতা, একাকিত্ব ও মানসিক
আশ্রয়ের। যেমন প্রাচ্য কবিতায় চা-পেয়ালা, চাঁদ, বা নিঃশব্দ রাতের মতো সামান্য উপাদান
থেকে গভীর দার্শনিক ভাব উঠে আসে, তেমনি পাশবালিশ এখানে অনুপস্থিত প্রিয়জনের বিকল্প
হয়ে দাঁড়ায়।
“অন্ধকার পাশবালিশ বোনে
/ অসফল বিধিলিপি সহায়ক হোক”—এই পঙ্ক্তিতে নিয়তি ও ব্যক্তিগত ব্যর্থতার অনুভব ধরা
পড়ে। প্রাচ্য দর্শনের মতোই এখানে বিধি বা ভাগ্যকে অস্বীকার না করে তার সঙ্গে সহাবস্থানের
এক নীরব আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। জীবনকে একটি অসম্পূর্ণ, কখনো ব্যর্থ লিখন হিসেবে দেখা—এটিও
প্রাচ্য ভাবনায় পরিচিত এক দৃষ্টিভঙ্গি।
সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রকল্পটি
আসে শেষ অংশে—“তুমি বিনে এ জীবন / মহাশূন্যের এলোমেলো নক্ষত্রলোক!”। এখানে ব্যক্তিগত
বেদনা মহাজাগতিক শূন্যতার সঙ্গে মিশে যায়। প্রাচ্য কবিতায় মানুষের অন্তর্জগত ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের
মধ্যে এই সাযুজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম বা প্রিয়জনের অনুপস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত
ক্ষতি নয়, বরং সৃষ্টির অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়।
সব মিলিয়ে, “পাশবালিশ”
প্রাচ্য কবিতার ধ্যানী, নীরব ও প্রতীকনির্ভর ঐতিহ্যের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আধুনিক একাকিত্ব
ও সম্পর্কহীনতার বেদনাকে সংবেদনশীল ভাষায় প্রকাশ করেছে। কবিতাটি পাঠককে উচ্চকণ্ঠে
নয়, নীরবতায় ভাবতে শেখায়—যা প্রাচ্য কবিতার অন্যতম মূল শক্তি।
==========================
0 মন্তব্যসমূহ