E-দুইপাতা পত্রিকা সম্পাদক: নীলোৎপল জানা ১২১তম পঞ্চম সংখ্যা ২০২৬

 

E-দুপাতা পত্রিকা

সম্পাদক: নীলোৎপল জানা

১২১তম পঞ্চম সংখ্যা ২০২৬

duiipatalokpathpatrika78@gmail.com 

অদিতি সেনগুপ্তের গুচ্ছকবিতা

 

সহদেবের প্রতি

 

হে কনিষ্ঠ পাণ্ডব, তোমার দূরদৃষ্টি নাকি সম্পূর্ণ আর্যাবর্তে খ্যাত!

মাতা কুন্তীর মুখে শুনেছি, অশনি সংকেত তুমি পড়ে ফেলো ঘটবার আগেই...

অথচ সেই তুমিও আটকাতে পারলে না আমার চরম লাঞ্ছনা!

 

বাজি হারা দাস হয়ে মাথা নত করে

সাক্ষী হয়েই রয়ে গেলে ওই মহাকাব্যের পাতায়!

 

বিজয়া, দিগম্বী, ভানুমতী, মালা, সুকর্মনা, রাধা, নিরঞ্জনা, তুলহাজাশী, শিত্রসুধা...

এদের মধ্যে কাউকে পণ রাখলেও কী

এক‌ইভাবে নীরব ভূমিকায় দেখত তোমাকে এই  ইতিহাস?

 

যুধিষ্ঠিরের প্রতি

 

সমাজের চোখে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব তুমি,

তাই অধিকার পেয়েছিলে আমার অনাঘ্রাতা কাঞ্চনজঙ্ঘার...

কিন্তু সে সম্ভোগে ছিলোনা কোন‌ও আত্মিক টান!

প্রতি যাপনের পর বরপ্রাপ্তা আমি হয়ত হয়ে উঠি অক্ষতযোনি,

কিন্তু জোড়া লাগার চিহ্ন থেকে যায় মনন জুড়ে!

 

অযোনিসম্ভবা দ্রৌপদী হোক বা কোনও সাধারণ কৃষ্ণা,

ওই একচিলতে অক্ষত চামড়ার টুকরোই আসলে তার চরিত্রের শংসাপত্র...

 

কিন্তু হে ধর্মরাজ, অধর্মের দ্যুতসভায় দেবিকাকে বাজি রাখার কথা

তোমার একবারও মনে হয়নি...

মন বলেছিল, পঞ্চভোগ্যার সম্মান খুব সহজেই খোলা বাজারে টেনে আনা যায়!

 

ভীমের প্রতি

 

যদিও তোমার জীবনে আমি দ্বিতীয় নারী, তবুও ভালোবেসেছো উজাড় করে!

বলন্ধরাও এসেছে তোমার জীবনে রাজনৈতিক সমীকরণের ফলস্বরূপ...

কিন্তু তবুও তোমার একনিষ্ঠ প্রেম আমি অনুভব করেছি মধ্যম পাণ্ডব।

দ্যুত সভায় আমার প্রতি অন্যায়ে ফুঁসে উঠেছ সেই তুমিই...

পুড়িয়ে দিতে চেয়েছো তোমার জ্যেষ্ঠের পাশা খেলা দুই হাত!

আমার অপমানের জবাবে কৌরব নাশের রক্তাক্ত পণ নিয়েছো শুধু তুমি!

দূর্লভ সুর-সৌগন্ধিক পদ্ম আনতে ছুটে গিয়েছো আমার একটি কথায়!

কিচক বধ করে মান রক্ষা করেছো অজ্ঞাতবাসে...

আমার খোলা চুল থেকে অপমান ধুয়ে দিয়েছো দুঃশাসনের রক্ত দিয়ে!

 

তবুও তোমাকে দিতে পারিনি আমার একনিষ্ঠ প্রেম!

 

অর্জুনের প্রতি

 

ব্রহ্মচর্য থেকেই শ্রেষ্ঠত্বের যে বীজ তোমার মধ্যে রোপিত হয়েছিলো,

তারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে লক্ষ্যভেদ করেছিলে

আমার স্বয়ংবরে তুমি ধনঞ্জয়।

ভালোবাসা? নাহ্ তেমন কিছু ছিলোনা সেখানে!

 

সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কে নেহাতই একখণ্ড রুটির মত ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে

আর যাই হোক ভালোবাসা প্রকাশ পায় না!

 

জানো পার্থ, চার পাণ্ডব শুধুই আমার শরীর ছুঁয়েছে, মন ছুঁতে পারেনি কেউ!

 

যে ছোঁয়ার আশায় বিয়ের দুটো বছর চাতক অপেক্ষায় কাতর ছিলাম,

সে সময় এলো কিন্তু তুমি এলে না!

সত্য পালনের দোহাইয়ে চলে গেলে ১২ বছরের পার!

উলূপী, চিত্রাঙ্গদাকে কৌমার্য সঁপে ফিরে যে এলো,

সে সুভদ্রা-পতি রাজকুমার অর্জুন, আমার প্রেম নয়!

 

নকুলের প্রতি

 

মহাকাব্যের সুদর্শনতম পুরুষ তুমি মাদ্রেয়।

কিন্তু এতো তোমার একমাত্র স্মরণীয় বৈশিষ্ট্য নয়!

যুদ্ধকৌশলেও যথাযথ ছিলে তুমি।

আসলে মহীরুহের আড়ালে যেমন ঢাকা পড়ে যায় ছোট গাছ

তেমনই তোমারও শৌর্যগাথা হারিয়ে গেছে তিন মহারথী

জ্যেষ্ঠর প্রকাণ্ড ছায়ার আড়ালে!

 

আমাকেও নেহাতই ভাগের অংশীদার হিসেবেই লাভ করেছিলে তুমি।

রেনুমতী আর সুকৃতির মত সহজ দাম্পত্য কখনও গড়ে ওঠেনি আমাদের!

 

দ্যুত সভায় যখন ঘটে গেছিলো সেই ঐতিহাসিক অপরাধ

তখনও বিশেষ হয়ে উঠতে পারোনি তুমি নকুল!

 

নারী যে শুধু রূপমুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ে না চতুর্থ পাণ্ডব!

--------------0----------------------

অদিতি সেনগুপ্তের ‘অর্জুনের প্রতি’ কবিতাটির আলোচনা।

    অদিতি সেনগুপ্তের কবিতাটি প্রাচ্য সাহিত্য–বিশেষত মহাভারতের কাহিনি–নির্ভর হলেও এটি নিছক পুরাণ পুনর্কথন নয়; বরং দ্রৌপদীর কণ্ঠে এক তীব্র নারীবাদী আত্মস্বীকারোক্তি। এখানে অর্জুনকে উদ্দেশ করে বলা কথাগুলো আসলে পুরুষতান্ত্রিক নৈতিকতা, ধর্মের নামে নারীর বঞ্চনা এবং তথাকথিত বীরত্বের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিবাদ। 

   কবিতার শুরুতেই অর্জুনের ‘ব্রহ্মচর্য’ ও ‘লক্ষ্যভেদ’-এর উল্লেখ করে কবি দেখান, কীভাবে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতিত্বকে সমাজ সর্বদা মহিমান্বিত করে। দ্রৌপদীর স্বয়ংবর জয়ও এখানে প্রেমের ফল নয়, বরং পুরুষের দক্ষতার প্রদর্শনমাত্র। “ভালোবাসা? নাহ্ তেমন কিছু ছিলোনা সেখানে!”—এই সরাসরি উচ্চারণে দ্রৌপদী পুরাণের রোমান্টিক আবরণ ছিঁড়ে দেন। 

   কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশটি হলো দ্রৌপদীর বৈবাহিক জীবনের বর্ণনা। পাঁচ স্বামীর সঙ্গে বিবাহকে তিনি “একখণ্ড রুটি” ভাগ করে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন—যা চরম অবমাননা ও বস্তুকরণের প্রতীক। এখানে শরীর ও মনের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট: “চার পাণ্ডব শুধুই আমার শরীর ছুঁয়েছে, মন ছুঁতে পারেনি কেউ।” এই পঙ্‌ক্তি দ্রৌপদীর নিঃসঙ্গতা ও অতৃপ্তির গভীর মনস্তাত্ত্বিক চিত্র আঁকে।

   অর্জুনের তপস্যা ও প্রতিজ্ঞাপালন কবিতায় প্রেমহীন কর্তব্য হিসেবে উপস্থিত। সত্য রক্ষার অজুহাতে বারো বছরের নির্বাসন, উলূপী ও চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে সম্পর্ক—এসবের মধ্য দিয়ে অর্জুনের চরিত্রে এক দ্বৈত নৈতিকতা ধরা পড়ে। শেষ পর্যন্ত কবি স্পষ্ট করে দেন—উলূপী ও চিত্রাঙ্গদাকে ছুঁয়ে, সুভদ্রার স্বামী হয়ে ফেরা অর্জুন দ্রৌপদীর প্রেমের যোগ্য নন।

     সব মিলিয়ে, এই কবিতা দ্রৌপদীকে নিছক পুরাণ-নারী নয়, এক সচেতন, প্রশ্নকারী ও প্রতিবাদী আধুনিক নারীতে রূপান্তরিত করে। অদিতি সেনগুপ্ত প্রাচ্য সাহিত্যের পরিচিত চরিত্রকে ব্যবহার করে প্রেম, ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রের ভেতরের ফাঁপা সত্য উন্মোচন করেছেন অত্যন্ত শক্তিশালী কাব্যভাষায়।

==========================

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ