E-দুইপাতা পত্রিকা
১১৫তম চতুর্থ সংখ্যা, ২০২৬
সম্পাদক: নীলোৎপল জানা
G-mail: lokpathduiipatapatrika78@gmail.com
শ্রীমহাদেব
একটি ক্ষণ অধরা অথবা ভাসমান মুখ
প্রদীপের আলো কুড়েঘর
মা কাছে বসে আছে
শীত হামা দিয়ে আসে বাঘের মতো
২.ভোর
ভোরের শিশির মৃত ঘাসে নতজানু
বিভক্ত বনক দীর্ঘ অপেক্ষায়
চাঁদ সওদাগরের নোঙর লোনা জলে
ভেসে যায় অবহেলায়
৩.ঘড়ি
সময়কে ধরবো বলে প্রত্যাশায় থাকি
সকালের ঘুম লেপ্টে যাওয়া পাতা
আলোঘর হাওয়াবাড়ি
দালি কবে রান্না করে ভেগে গেছে
৪.আত্মা
নষ্ট কঙ্কাল যত মাটি চাপা
তার উপর গাছ , পাতার নাচ
মাছে জলে খেলা করে
স্বভাব পাশ ফিরলে সবই ফিকে
৫.গান
বেদেনী অথবা বেদুইন সঙ্গী হয়
সাপুড়ের মায়া খোলস বীন
পায়ের মখমল, মাদল
জল ভরা কলস
টুং টাং ।
---------------0000-----------000------------
মহাদেবের পাঁচটি কবিতার আলোচনা।
মহাদেবের
পাঁচটি কবিতা সময়, প্রকৃতি, স্মৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। এর
ভঙ্গি ও চিত্রকল্প বিদেশি আধুনিক কবিতার ধারার সঙ্গে স্পষ্ট সংলাপে আছে। বিশেষ করে
টি. এস. এলিয়ট, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং পল সেলানের কবিতার অনুসঙ্গ এখানে
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম কবিতা “সন্ধ্যা”-তে আমরা
দেখি ভাসমান মুখ, প্রদীপের আলো, কুঁড়েঘর, মায়ের কাছে বসে থাকা এবং শীতের বাঘের মতো
হানা। এই দৃশ্য নির্মাণ এলিয়টের Preludes বা The Waste Land-এর
সন্ধ্যার ছবির কথা মনে করায়, যেখানে সন্ধ্যা কেবল দিনের শেষ নয়, এক ধরনের মানসিক
ক্লান্তি ও অস্তিত্বগত অনিশ্চয়তার প্রতীক। শীত এখানে প্রকৃতির ঘটনা নয়, বরং এক
হিংস্র অনুভূতি, যা মানুষের জীবনে নীরবে আক্রমণ করে।
দ্বিতীয় কবিতা “ভোর” অংশে শিশির,
মৃত ঘাস, বিভক্ত বন এবং চাঁদ সওদাগরের নোঙর লোনা জলে ভেসে যাওয়ার ছবি রয়েছে। এই
চিত্রকল্প লোরকার কবিতার সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে প্রকৃতি প্রায়ই মৃত ও
জীবিতের মাঝামাঝি এক অবস্থানে থাকে। চাঁদ এখানে রোমান্টিক নয়, বরং উদাসীন এক
সওদাগর। বিদেশি প্রতীকবাদী কবিতার মতোই, ভোর এখানে নতুন শুরুর আশ্বাস দেয় না, বরং
দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি বহন করে।
তৃতীয় কবিতা “ঘড়ি” অংশে সময়কে
ধরার ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষা উঠে আসে। সময় যেন হাতছাড়া, ঘরগুলো আলোঘর বা হাওয়াবাড়ির মতো
অনিশ্চিত। এই ভাবনা পল সেলানের কবিতার কথা মনে করায়, যেখানে সময় আর বাস্তবতার
মধ্যে স্থায়ী ফাটল থাকে। দৈনন্দিন জীবনের চিহ্ন, যেমন রান্না করা ডাল, হঠাৎই উধাও
হয়ে যায়। এতে এক ধরনের অস্তিত্বগত শূন্যতা তৈরি হয়।
চতুর্থ কবিতা “আত্মা” অংশে মৃত্যু
ও পুনর্জন্মের চক্র দেখা যায়। নষ্ট কঙ্কালের ওপর গাছ জন্মায়, মাছ জলে খেলে। এই
রূপান্তর এলিয়টের Ash Wednesday বা সেলানের পরবর্তী কবিতার মতো,
যেখানে ধ্বংসের মধ্যেই নতুন জীবনের ইঙ্গিত থাকে। তবে এখানে কোনো আশাবাদী সিদ্ধান্ত
নেই। স্বভাব পাশ ফিরলেই সব ফিকে হয়ে যায়, অর্থাৎ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই অর্থ
হারিয়ে ফেলে।
শেষ অংশ “গান”-এ বেদেনী, বেদুইন,
সাপুড়ে, বীণ, মাদল, জলভরা কলসের শব্দময়তা আছে। এটি ইউরোপীয় আধুনিক কবিতায় দেখা
লোকজ ও আদিম সংগীতচেতনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। লোরকা যেমন আন্দালুসিয়ার
লোকসংস্কৃতিকে আধুনিক কবিতায় এনেছিলেন, এখানেও গান এক ধরনের আদি স্মৃতি ও যাযাবর
অস্তিত্বের প্রতীক।
সব
মিলিয়ে এই কবিতাটি বিদেশি আধুনিক ও প্রতীকবাদী কবিতার ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
বজায় রেখে একটি স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছে। সময়, মৃত্যু, প্রকৃতি ও গান এখানে
কোনো স্থির অর্থ বহন করে না। এগুলো ভাসমান, অধরা, ঠিক যেমন আধুনিক মানুষের জীবন ও
চেতনা।
0 মন্তব্যসমূহ